মঙ্গলবার, ০৯ জুন ২০২৬, ১২:৪৭ পূর্বাহ্ন
১. *কেনো এই আস্থার সংকট*:
বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা। সাধারণ মানুষের আমানত, শিল্প ও বাণিজ্যের অর্থায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং জাতীয় উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হিসেবে ব্যাংকিং খাতের ভূমিকা অপরিসীম। কিন্তু দীর্ঘদিনের অনিয়ম, ঋণখেলাপি সংস্কৃতি, অর্থ পাচার, দুর্বল সুশাসন এবং জবাবদিহির অভাবে আজ এই খাত একটি আস্থা সংকটের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে।
ব্যাংকিং খাতের সবচেয়ে বড় সম্পদ অর্থ নয়, আস্থা। আমানতকারীরা বিশ্বাস করেন বলেই তারা তাদের কষ্টার্জিত অর্থ ব্যাংকে জমা রাখেন। বিনিয়োগকারীরা বিশ্বাস করেন বলেই ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে শিল্প ও ব্যবসা সম্প্রসারণ করেন। কিন্তু যখন দেখা যায়, প্রভাবশালী ব্যক্তি, বড় ব্যবসায়ী কিংবা রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে থাকা কেউ কেউ ব্যাংক ঋণ পরিশোধ না করেও প্রভাব-প্রতিপত্তির বলয়ে নিরাপদ অবস্থানে রয়েছেন, তখন সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে—আইন কি সবার জন্য সমান?
এই প্রশ্নের উত্তর যতদিন দৃশ্যমানভাবে প্রতিষ্ঠিত না হবে, ততদিন ব্যাংকিং খাতে প্রকৃত আস্থা ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে।
২. *আমানতকারীদের উদ্বেগের কারণ* :
বর্তমানে দেশের ব্যাংকগুলো বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণের বোঝা বহন করছে। এসব ঋণের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বৃহৎ ঋণগ্রহীতাদের হাতে কেন্দ্রীভূত। এর ফলে ব্যাংকের মূলধন দুর্বল হচ্ছে, নতুন উদ্যোক্তাদের ঋণপ্রাপ্তি কঠিন হয়ে পড়ছে এবং আমানতকারীদের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী কিছু ব্যক্তি বা তাদের নিয়ন্ত্রিত ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও বিভিন্ন সময়ে ঋণখেলাপি হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এমন বাস্তবতা জনগণের কাছে রাষ্ট্রীয় নৈতিকতার প্রশ্নও উত্থাপন করে।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীরা শুধু রাজনৈতিক নেতৃত্ব দেন না; তারা রাষ্ট্রীয় নীতি, আইন এবং জবাবদিহির প্রতীকও। ফলে তাদের আর্থিক দায়বদ্ধতার মান সাধারণ নাগরিকের তুলনায় আরও উচ্চ হওয়া উচিত। জনগণের অর্থ নিয়ে গঠিত ব্যাংক ব্যবস্থার প্রতি তাদের দায়িত্বও বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
৩. *সরকারের কাছে চ্যালেঞ্জ*:
অস্থির ব্যাংকিং পরিস্থিতির ক্ষেত্রে সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—রাজনৈতিক বিবেচনার ঊর্ধ্বে উঠে আর্থিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা। ব্যাংকের পাওনা আদায়ে কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা পদমর্যাদার ভিত্তিতে ভিন্ন মানদণ্ড প্রয়োগ করা হলে আস্থা সংকট আরও গভীর হবে।
৪. *জনপ্রতিনিধি ঋণখেলাপিদের ক্ষেত্রে যে পদক্ষেপগুলো বিবেচনা করা জরুরি*
*প্রথমত*, সংসদ সদস্য, মন্ত্রী এবং অন্যান্য সাংবিধানিক পদধারীদের ঋণ পরিস্থিতি নিরীক্ষণের জন্য একটি স্বাধীন আর্থিক জবাবদিহি কাঠামো গড়ে তোলা যেতে পারে। তাদের ঋণ, কর এবং আর্থিক দায়বদ্ধতা সম্পর্কে নির্দিষ্ট সময় অন্তর যাচাই-বাছাই করা প্রয়োজন।
*দ্বিতীয়ত*, ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের ক্ষেত্রে দ্রুত ঋণ পুনরুদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। প্রয়োজনে আদালতের মাধ্যমে সম্পদ জব্দ, শেয়ার হস্তান্তর, ব্যবসায়িক মালিকানা পুনর্গঠন বা অন্যান্য আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
*তৃতীয়ত*, ব্যাংক ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ প্রভাবশালী ব্যক্তিদের জন্য বিশেষ সুবিধা বা বারবার পুনঃতফসিলের সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। একই অপরাধের জন্য সবার ক্ষেত্রে একই আইন প্রযোজ্য হতে হবে।
*চতুর্থত*, নির্বাচনী হলফনামায় প্রদত্ত আর্থিক তথ্য এবং ব্যাংকিং তথ্যের মধ্যে সামঞ্জস্য আছে কি না, তা নিয়মিত যাচাইয়ের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
*পঞ্চমত*, ঋণখেলাপি অবস্থায় থাকা ব্যক্তিদের রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ কমিটি, আর্থিক নীতিনির্ধারণী সংস্থা বা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে দায়িত্ব প্রদানের ক্ষেত্রে কঠোর নীতিমালা প্রণয়ন করা যেতে পারে।
*ষষ্ঠত*, বড় ঋণখেলাপি এবং অর্থ পাচার-সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ আর্থিক আদালত বা ট্রাইব্যুনাল গঠন করা প্রয়োজন।
*সপ্তমত*, দেশের বাইরে পাচার হওয়া অর্থ শনাক্ত ও ফিরিয়ে আনতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করতে হবে এবং এ বিষয়ে একটি বিশেষায়িত রাষ্ট্রীয় টাস্কফোর্স গঠন করা যেতে পারে।
৫.*ব্যাংকিং খাতে প্রয়োজনীয় বৃহত্তর সংস্কার*
জনপ্রতিনিধিদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতের সামগ্রিক সংস্কারও জরুরি।
(১) বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধি;
(২) ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদে পেশাদারিত্ব নিশ্চিতকরণ;
(৩) রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ঋণ অনুমোদন ব্যবস্থা;
(৪) ডিজিটাল ও রিয়েল-টাইম তদারকি ব্যবস্থা চালু;
(৫) খেলাপি ঋণের প্রকৃত তথ্য প্রকাশ;
(৬) আমানতকারীদের সুরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ;
(৭) দুর্নীতি ও আর্থিক জালিয়াতির বিরুদ্ধে দ্রুত ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা গ্রহণ।
৬. *সাহসী সংস্কারই একমাত্র সমাধানের উপায়*
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতকে সুস্থ, শক্তিশালী এবং জনগণের আস্থাভাজন প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হলে সংস্কারের পথে সাহসী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। বিশেষ করে জনপ্রতিনিধিদের ক্ষেত্রে আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের নৈতিক ও সাংবিধানিক দায়িত্ব। জনগণ দেখতে চায়—কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়, কেউ ব্যাংকের অর্থ নিয়ে দায়মুক্তি ভোগ করতে পারে না।
আজ দেশের ব্যাংকিং খাতে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন নতুন অর্থ নয়, নতুন আস্থা। আর সেই আস্থা ফিরিয়ে আনার প্রথম শর্ত হলো জবাবদিহি, সুশাসন এবং আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ। জনগণের আমানত রক্ষার স্বার্থে, অর্থনীতির স্থিতিশীলতার স্বার্থে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থে এখনই সাহসী সংস্কারের পথে এগিয়ে যাওয়া উচিত।