শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬, ১২:৫৬ পূর্বাহ্ন
বগুড়ার গাবতলী উপজেলার বগবাড়ি গ্রামের জিয়াবাড়ির একটি রাস্তার ইতিহাস। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানে পৈত্রিক নিবাসে প্রথম সফর। ২০ এপ্রিল ২০২৬, সোমবার। তিনি আসবেন, বরণ করবেন নিজ এলাকাবসী। বাড়ির একটি রাস্তা! সেই রাস্তা আজ আর রাস্তা নয়; যেন এক রূপকথার চরিত্র। একদিন সে ছিল কাদা, পরদিন সে হলো ইটের রাজপথ, আর তার পরদিনই আবার ফিরে গেল নিজের পুরোনো পরিচয়ে। যেন সিনেমার নায়ক শুটিং শেষ করে মেকআপ খুলে ফেলেছে।
দৈনিক প্রথম আলো–এর ১১ জুন ২০২৬ সংখ্যায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর সফর উপলক্ষে এলজিইডি একটি কাঁচা রাস্তায় ইট বিছিয়ে সাময়িকভাবে চলাচলের উপযোগী করেছিল। সফর শেষ হওয়ার পর সেই ইটগুলো আবার তুলে নেওয়া হয়। সেই ইট-সজ্জিত পথ দিয়েই প্রধানমন্ত্রী তাঁর পৈত্রিক ভিটায় পৌঁছেছিলেন।
ঘটনাটি শুনে গ্রামের এক বৃদ্ধ নাকি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছিলেন—
> “আমাদের রাস্তা বউয়ের গয়নার মতো হয়েছে। বিয়ের দিন ভাড়া করে আনা হয়, অনুষ্ঠান শেষে ফেরত দেওয়া হয়!”
বাংলার মাটিতে অনেক কিছুই ভাড়া হয়। ভাড়া বাড়ি, ভাড়া গাড়ি, ভাড়া চেয়ার, ভাড়া মাইক—এসব তো পুরোনো কথা। কিন্তু ভাড়া রাস্তা! এ এক অভিনব উদ্ভাবন। যদি উদ্ভাবনের জন্য কোনো আন্তর্জাতিক পুরস্কার থাকত, তবে হয়তো এই প্রকল্পের কর্মকর্তারা দেশের হয়ে স্বর্ণপদক নিয়ে ফিরতেন।
রাস্তারও বোধহয় অনুভূতি আছে। যদি সেই ইটগুলো কথা বলতে পারত, হয়তো বলত—
“হে পথিক, আমরা স্থায়ী নই। আমরা উন্নয়নের অতিথি শিল্পী। ভিআইপি এলে আসি, ভিআইপি গেলে যাই।”
প্রধানমন্ত্রীর গাড়ির চাকা যখন সেই ইটের উপর দিয়ে যাচ্ছিল, তখন হয়তো রাস্তা নিজেকে রাজধানীর কোনো অভিজাত সড়ক ভেবেছিল। কিন্তু সফর শেষ হতেই তার কপালের টিপ মুছে গেল, শাড়ির রং ফিকে হয়ে গেল, আর একে একে খুলে নেওয়া হলো ইটের অলংকার।
এ যেন সিন্ডারেলার গল্পের উল্টো সংস্করণ। সেখানে কুমড়ো গাড়ি হয়েছিল, আর এখানে রাস্তা হয়েছিল উন্নয়ন। তবে ঘড়ির কাঁটা বারোটা বাজতেই সব আবার আগের অবস্থায় ফিরে গেছে।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, যে রাস্তা দিয়ে দেশের প্রধানমন্ত্রীর নিজ পৈত্রিক বাড়িতে যাওয়া হয়, সেই রাস্তার জন্যও যদি বাস্তব উন্নয়নের বদলে সাময়িক সাজসজ্জার আশ্রয় নিতে হয়, তাহলে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাধারণ মানুষের ভাগ্যে কী ঘটছে—সেই প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই সামনে আসে।
একজন রসিক শিক্ষক মন্তব্য করেছেন—
> “আমরা এতদিন শুনতাম কসমেটিক সার্জারি মানুষের মুখে হয়। এখন বুঝলাম রাস্তারও কসমেটিক সার্জারি হয়!”
প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তা হয়তো ভাবেন, উন্নয়ন মানে ক্যামেরার সামনে দৃশ্য তৈরি করা। কিন্তু উন্নয়ন তো নাটকের মঞ্চ নয়, যেখানে পর্দা নামলেই সবকিছু গুটিয়ে নেওয়া যায়। উন্নয়ন হলো মানুষের দৈনন্দিন জীবনের বাস্তব সুবিধা, যা সফর শেষে উধাও হয়ে যায় না।
গাবতলীর সেই রাস্তা আজ এক নিঃশব্দ সাক্ষী। সে জানে, একদিন তার বুকে ক্ষমতার বহর চলেছিল। লাল-সবুজ পতাকা উড়েছিল। গাড়ির বহর ছুটেছিল। নিরাপত্তার কড়াকড়ি ছিল। অথচ আজ সে আবার ধুলোমাখা, কাদামাখা, অবহেলিত।
রাস্তার ধারে পড়ে থাকা কয়েকটি ইট যেন এখনো ফিসফিস করে বলে—
> “আমরা উন্নয়নের অভিনেতা ছিলাম। আমাদের চরিত্রের মেয়াদ ছিল মাত্র এক সফর।”
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় এটি প্রশাসনিক জবাবদিহিতার প্রশ্ন। কিন্তু সাহিত্যিকের ভাষায় এটি এক ট্র্যাজিক-কমেডি—যেখানে রাস্তা আছে, ইট আছে, উন্নয়নের গল্পও আছে; শুধু স্থায়িত্বটাই নেই।
শেষ পর্যন্ত গাবতলীর সেই রাস্তা আমাদের এক গভীর শিক্ষা দিয়ে যায়—
যে দেশে রাস্তা সফরের জন্য সাজে, মানুষের জন্য নয়; সেখানে উন্নয়নের সবচেয়ে বড় গর্তটি মাটিতে নয়, মানসিকতায়।