বুধবার, ১০ জুন ২০২৬, ১২:১৮ পূর্বাহ্ন
সেদিন বিকেলে শহরের আকাশ ছিল একেবারে ঝকঝকে। রোদ যেন নতুন ধোয়া কাপড়ের মতো নির্মল। কিন্তু চায়ের দোকানের বেঞ্চে বসে থাকা বৃদ্ধ হাশেম মিয়ার মুখে অদ্ভুত এক কৌতূহল।
খবরের কাগজ ভাঁজ করে তিনি বললেন—
—”বিদ্যুৎ বিল আবার বাড়লো!”
কথাটি বলেই তিনি চারদিকে তাকালেন।
তারপর রাস্তার দিকে।
তারপর মোড়ের দিকে।
তারপর আরও দূরে।
চায়ের দোকানদার জিজ্ঞেস করল,
—”চাচা, কী খুঁজছেন?”
হাশেম মিয়া অবাক হয়ে বললেন,
—”আনন্দ মিছিল।”
দোকানে উপস্থিত সবাই একসঙ্গে হেসে উঠল।
কিন্তু হাশেম মিয়া ছিলেন গম্ভীর।
তিনি বললেন,
—”আরে ভাই, কোনো বড় সিদ্ধান্ত হলে তো সমর্থকেরা আনন্দ প্রকাশ করে। কেউ মিষ্টি বিলায়, কেউ মিছিল করে, কেউ ব্যানার টানায়। বিদ্যুৎ বিল বাড়ার মতো এত বড় খবর হলো, আর কোথাও কোনো আনন্দ মিছিল নেই কেন?”
সবাই চুপ।
চায়ের কাপ থেকে শুধু ধোঁয়া উঠছে।
পরদিন তিনি আবার খোঁজ নিলেন।
খবর পৌঁছে গেছে সর্বত্র।
ফেসবুকে পৌঁছেছে।
হোয়াটসঅ্যাপে পৌঁছেছে।
চায়ের টেবিলে পৌঁছেছে।
রিকশাচালক করিমের কানেও পৌঁছেছে।
এমনকি বাজারের মাছ বিক্রেতা রহিমও খবরটি জানে।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, কোথাও “অভিনন্দন বিদ্যুৎ বিল” লেখা কোনো ব্যানার নেই।
কোথাও মিষ্টির প্যাকেট নেই।
কোথাও উল্লাসের ঢাকও বাজছে না।
বিষয়টি হাশেম মিয়াকে গভীর চিন্তায় ফেলে দিল।
সেদিন রাতে তিনি একটি অদ্ভুত স্বপ্ন দেখলেন।
শহরের প্রধান সড়ক দিয়ে একটি বিশাল আনন্দ মিছিল বের হয়েছে।
সামনে বিশাল ব্যানার—
“অভিনন্দন! আমাদের বিল আরও উন্নত হয়েছে।”
পেছনে স্লোগান—
“বিল বাড়ুক, স্বপ্ন জাগুক!”
“মিটারের হাসি, জাতির খুশি!”
“আজকের বিল, আগামীর প্রোফাইল!”
কেউ ফুল ছিটাচ্ছে।
কেউ মিষ্টি বিলাচ্ছে।
কেউ আবার আনন্দে সেলফি তুলছে।
একজন বলছে,
—”এই মাসে বিল দেখে আমার হৃদয় আরও বড় হয়েছে!”
আরেকজন বলছে,
—”জাতীয় উন্নয়নের ভার কাঁধে নিতে হলে বিলেরও তো ওজন বাড়তে হবে!”
হাশেম মিয়া স্বপ্নের মধ্যেই হাততালি দিলেন।
কিন্তু ঘুম ভাঙতেই দেখলেন—
না।
রাস্তা ফাঁকা।
মিছিল নেই।
স্লোগান নেই।
মিষ্টিও নেই।
আছে শুধু দীর্ঘশ্বাসের মতো নীরবতা।
তিনি তখন বুঝলেন, এই নীরবতার মধ্যেই আসল গল্প লুকিয়ে আছে।
কারণ মানুষ যখন খুব খুশি হয়, তখন কিছু না কিছু প্রকাশ করে।
কেউ ফুল দেয়।
কেউ মিষ্টি দেয়।
কেউ অন্তত হাসিমুখে ছবি তোলে।
কিন্তু বিদ্যুৎ বিল বৃদ্ধির এই মহিমান্বিত মুহূর্তে হাসিগুলোও যেন ছুটি নিয়ে কোথাও চলে গেছে।
তখন তাঁর মনে হলো, রাজনীতিরও হয়তো একটি নীরব ভাষা আছে।
যে ভাষায় করতালি শোনা যায় না, কিন্তু পকেটের ভেতর হিসাবের কাগজ নড়ে ওঠে।
যে ভাষায় অভিনন্দন লেখা হয় না, কিন্তু মাসের বাজেট একটু কেঁপে ওঠে।
হয়তো সবাই খুব ভদ্র।
খুশি হলেও প্রকাশ করতে চান না।
হয়তো তাঁরা মনে করেন, বিদ্যুৎ বিলের মতো মহৎ উপলক্ষ নীরবে উদ্যাপন করাই শোভন।
হয়তো রাতের আঁধারে মিটার বক্সের দিকে তাকিয়ে তাঁরা মুচকি হাসেন, কিন্তু দিনের আলোয় সেই হাসি গোপন রাখেন।
এটাও তো এক ধরনের সংযম!
তবে সাধারণ মানুষ একটু বিপদেই পড়ে।
কারণ তারা বুঝতে পারে না—
এই নীরবতা কি সন্তুষ্টির?
নাকি চিন্তার?
নাকি এমন এক গভীর দর্শনের, যার অর্থ বুঝতে বিদ্যুৎ প্রকৌশলের চেয়েও বড় গবেষণা প্রয়োজন?
কয়েকদিন পর আবার চায়ের দোকানে বসে হাশেম মিয়া শেষ চুমুকটি দিলেন।
তারপর ধীরে ধীরে বললেন—
“আমার একটা ছোট্ট দাবি আছে।”
সবাই তাঁর দিকে তাকাল।
—”কী দাবি, চাচা?”
হাশেম মিয়া মৃদু হেসে বললেন—
“যদি সবাই সত্যিই খুশি হন, তাহলে অন্তত একটা আনন্দ মিছিল বের হোক।”
—”কেন?”
—”কারণ প্রতিবাদ দেখেছি, সমর্থন দেখেছি, বিজয় মিছিলও দেখেছি। কিন্তু এমন একটি ঐতিহাসিক উপলক্ষ যদি আসে, আর তার জন্য একটা আনন্দ মিছিলও না হয়, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বুঝবে কীভাবে আমরা কতটা খুশি ছিলাম?”
চায়ের দোকানে হাসির রোল উঠল।
কেউ কাউকে দোষ দিল না।
কেউ কাউকে গালি দিল না।
কেউ তর্কেও জড়াল না।
কেবল বাতাসে ভেসে রইল একটি মিষ্টি প্রশ্ন—
যদি সবাই খুশি হয়,
তাহলে আনন্দ মিছিলটা গেল কোথায়?