শুক্রবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৬, ০১:৪৮ অপরাহ্ন

শিরোনাম
মাগুরার শ্রীপুরে বিদ্যুতায়িত হয়ে এক যুবকের মৃত্যু, আহত আরো -২জন চাটমোহরে তেল-জেলিতে তৈরি হচ্ছিল নকল দুধ, ভ্রাম্যমাণ আদালতে কারাদণ্ড ও জরিমানা The Mecca Defence Pact: India’s Concerns, the Positions of Major Powers, and Bangladesh’s Potential Gains and Losses* *–Professor M. A. Barnik মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি: ভারতের উদ্বেগ, পরাশক্তিদের অবস্থান এবং বাংলাদেশের সম্ভাব্য লাভ-ক্ষতি* *—অধ্যাপক এম এ বার্ণিক* কেন্দ্রীয় যুবদলের সিনিয়র সহ-সভাপতি পলের রোগমুক্তিতে এস. আলম ইসরাৎ এর উদ্যোগে দোয়া আন্দালিব রহমান পার্থকে তথ্যমন্ত্রী করায় চট্টগ্রাম প্রেসক্লাব নেতৃবৃন্দকে মিষ্টিমুখ করালো বিজেপি ভাষা সৈনিক অজিত গুহ মহাবিদ্যালয়ে পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা:) উদযাপন মাগুরায় ৭ ভুয়া সিআইডি সদস্য আটক, নারী অপহরণের চেষ্টা ব্যর্থ! Bangladesh: Emerging as a Key Strategic Nexus in the Defence Relations of India, China and the Middle East- Professor M. A. Barnik* বাংলাদেশ : ভারত-চীন-মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিরক্ষা সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থলে পরিণত হচ্ছে* *–অধ্যাপক এম এ বার্ণিক*

“যাকাতের মর্মবানী”

সংবাদদাতা / ৩১২ বার ভিউ
সময়ঃ শুক্রবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৬, ০১:৪৮ অপরাহ্ন

লেখক- শহীদুজ্জামান কাকন,
সুইডিশ সরকারের অর্থনীতিবিদ

যাকাত আরবী শব্দ। দুররুল মুখ্তার কিতাবে আছে, যাকাতের আভিধানিক অর্থ পবিত্রতা ও বৃদ্ধি। তাছাড়া যাকাতের আরো অর্থ রয়েছে; যেমন, বরকত ও প্রশংসা। এই সবগুলো অর্থই ইসলামী শরীয়তে যাকাতের পারিভাষিক অর্থে বিদ্যমান। কেননা, যাকাতের মাধ্যমে যাকাতদাতা গোনাহ থেকে ও কৃপণতার দোষ থেকে পবিত্র হয় এবং তার সম্পদ বর্জ্য অংশ থেকে পরিশুদ্ধ হয়। সূরা তাওবার ১০৩নং আয়াতে রাসুলে আকরাম (সাঃ)-কে সম্বোধন করে আল্লাহ বলেন: “আপনি ধনীদের সম্পদ থেকে সাদাকা সংগ্রহ করে তাদেরকে পবিত্র করুন এবং গরীবদের সম্পদ বৃদ্ধি করুন।” যাকাতের ফলস্বরূপ দুনিয়াতে দরিদ্রের এবং আখিরাতে ধনীর সম্পদ বৃদ্ধি পায়। আল- কুরআনের সূরা সাবার ৩৯নং আয়াতে আছে, “তোমরা যা কিছু দান কর তিনি তার বিনিময় দেন।” সূরা মুযযাম্মিলের ২০ নং আয়াতে আছে, “তোমরা নামায কায়েম কর, যাকাত দাও এবং আল্লাহকে উত্তম ঋণ দাও। তোমরা নিজেদের জন্য যা কিছু আগে পাঠাবে তা আল্লাহর কাছে উত্তম আকারে ও পুরস্কার স্বরূপ বর্ধিত ভাবে পাবে।” যাকাতের মাধ্যমে সম্পদে বরকত হাসিল হয়। মুসনাদে আহমদে আছে, সাদকা দিলে কখনও সম্পদ হ্রাস পায় না। যাকাতদাতা প্রশংসিত হয়ে থাকেন। তার সম্পর্কে লোকে ভালো আলোচনা করে। সূরা আ‘লার ১৪নং আয়াতে আছে, “যে পবিত্রতা অর্জন করে, সে সাফল্য লাভ করে।”

কুরআন ও হাদীস থেকে জানা যায়, যাকাতের ফলে ধন-সম্পদে সমৃদ্ধি ও বরকত হয়। অধিকন্তু যাকাত প্রদানের মাধ্যমে মানুষ আত্মশুদ্ধি লাভ করে। কুরআন ও হাদীসের পরিভাষায় সম্পদের যে অংশ আল্লাহর পথে ব্যয় করা মুসলিমদের উপর অবশ্য কর্তব্য (ফরয) করা হয়েছে তা-ই যাকাত। ইসলামি আইনশাস্ত্রে এই অর্থেই যাকাত শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। তফসীরকারগণ যাকাতরূপে প্রদত্ত সম্পদ এবং যাকাত প্রদানের কাজ উভয়টিকেই ‘যাকাত’রূপে আখ্যায়িত করেছেন।

হানাফী গবেষকদের মতে, নিসাব পরিমাণ সম্পদ এক চান্দ্র বৎসর কারো স্বত্বাধিকারে থাকলে সেই সম্পদের যে অংশে কোন বিশেষ শ্রেণীর মানুষের হক সৃষ্টি হয় সেই অংশ হস্তান্তর করার নাম যাকাত। শাফিয়ী গবেষকদের মতে, সম্পদ বা গবাদি পশু থেকে যে নির্দিষ্ট পরিমাণ অংশ দান করা হয় তা-ই যাকাত। মালিকী গবেষকদের মতে, কোন বিশেষ প্রকারের সম্পদ নিসাব পরিমাণ হলে তা থেকে হকদারদের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণে পৃথক করে দেয়ার নাম যাকাত। আর হাম্বলী গবেষকদের মতে, কোন বিশেষ পরিমাণ সম্পদে কোন বিশেষ শ্রেণীর লোকের কোন বিশেষ সময়ে অধিকার প্রতিষ্ঠা হওয়ার নাম যাকাত।
যাকাতের আর্থ-সামাজিক গুরুত্ব
যাকাতের সামাজিক গুরুত্ব নিম্নরূপ:
১. ধনী দরিদ্রের বৈষম্য দূর করে:
যাকাত ধনী দরিদ্রের মাঝে বৈষম্য দূর করে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ সৃষ্টি করে। যাকাত দরিদ্রের প্রতি ধনীর করুণা নয়, বরং ধনীর সম্পদে দরিদ্রের অধিকার। যেমন- আল্লাহর বাণী:
এবং তাদের ধন সম্পদে প্রাথ ও বঞ্চিতের হক আছে।
২. সামাজিক নিরাপত্তা বিধান:
সামাজিক নিরাপত্তা বিধানের ক্ষেত্রে যাকাতের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। সমাজের যে সকল লোক অর্থ উপার্জনে অক্ষম এবং সামাজিক নিরাপত্তাহীনতায় বাস করে, যাকাত ব্যবস্থা তা দূরীকরণে অনন্য ভূমিকা রাখে।
৩. অভাব-অনটন বিমোচন: অভাব-অনটন বিমোচনে যাকাত ব্যবস্থা অতীব গুরুত্বপূর্ণ। সমাজের ধনী শ্রেণী যদি সঠিকভাবে যাকাত প্রদান করে তাহলে সমাজে কোনো অভাবী মানুষের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাবে না।
৪. সামাজিক অনাচার নির্মূল:
অর্থের অভাবে মানুষ সামাজিক অনাচার তথা চুরি, ডাকাতি, খুন,
রাহাজানি, ছিনতাই ও সন্ত্রাস ইত্যাদি অপরাধে লিপ্ত হয়ে পড়ে। ভেঙে পড়ে সামাজিক অবকাঠামো। যাকাত ব্যবস্থা এসব সামাজিক অনাচার নির্মূলে অনন্য ভূমিকা পালন করে।
৫. ভ্রাতৃত্ববোধ জাগরণ: যাকাত মানুষের মধ্যে বিশেষ করে ধনী-
দরিদ্রের মাঝে এক গভীরতম ভ্রাতৃত্ববোধ সৃষ্টি করে।
৬. সহানুভূতি সৃষ্টি: যাকাত ব্যবস্থার মাধ্যমে ধনীদের অন্তরে দরিদ্রদের প্রতি চরম সহানুভূতি সৃষ্টি হয়। ধনীরা দরিদ্রের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে এগিয়ে আসে।
৭. জনহিতকর কার্যাবলি: যাকাতের অর্থ সংগ্রহ করে সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে সমাজের অসংখ্য জনহিতকর কার্যাবলি সম্পাদন করা যায়।
৮. ভিক্ষাবৃত্তিক উচ্ছেদ:
ভিক্ষাবৃত্তি একটি সামাজিক ব্যাধি। যাকাতের অর্থ দিয়ে দরিদ্র কল্যাণ ও দরিদ্রের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে ভিক্ষাবৃত্তি নির্মূল করা যায়।
যাকাতের অর্থনৈতিক গুরুত্ব
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে যাকাতের গুরুত্ব অপরিসীম। যা নিম্নে তুলে ধরা হল:
১. ইসলামি অর্থনীতির মূল ভিত্তি:
যাকাত ইসলামি অর্থনীতির মূল ভিত্তি। পুঁজিবাদী অর্থ ব্যবস্থার মূলভিত্তি। যেমন – সুদ,
সমাজতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থার মূল ভিত্তি যেমন জাতীয়করণে তেমনি ইসলামি অর্থ ব্যবস্থার মূল ভিত্তি হলো যাকাত।
২. রাষ্ট্রীয় আয়ের প্রধান উৎস:
ইসলামি রাষ্ট্রের আয়ের প্রধান উৎস যাকাত। ইসলামি রাষ্ট্রের সিংহভাগ অর্থই যাকাত থেকে সংগৃহীত হয়ে থাকে।
৩. জাতীয় আয় বৃদ্ধি: যাকাত ইসলামি রাষ্ট্রের জাতীয় আয়কে বৃদ্ধি করে। রাষ্ট্রের অন্যান্য আয়ের সাথে যাকাতের অর্থ একত্রিত হয়ে জাতীয় আয় বহুলাংশে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়।
৪. অর্থনৈতিক ভিত্তিকে সুদৃঢ় করে:
কোনো রাষ্ট্রকে উন্নতি ও অগ্রগতির মূলে রয়েছে সুদৃঢ় অর্থনৈতিক ভিত্তি। যাকাত ইসলামি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ভিত্তিকে সুদৃঢ় করে।
৫. অর্থনৈতিক ভারসাম্য সৃষ্টি:
রাষ্ট্রে ধনী-দরিদ্রের মাঝে যে বিশাল ব্যবধান রয়েছে। যাকাত ব্যবস্থা যথাযথ বাস্তবায়নের মাধ্যমে তা নিরসন করে ইসলাম একটি ভারসাম্যপূর্ণ অর্থ ব্যবস্থা গড়ে তোলে।
৬. অর্থনৈতিক বন্ধ্যাত্ব দূরীকরণ:
যাকাত অর্থনৈতিক বন্ধ্যাত্ব দূরীকরণের মহৌষধ। কেননা যাকাত ব্যবস্থার কারণে বিত্তশালীদের অর্থ এক স্থানে সঞ্চিত থাকতে পারে না। সম্পদ সমাজের দরিদ্রদের মাঝে আবর্তিত হতে থাকে।
৭. দারিদ্র্য বিমোচন: দারিদ্র্য বিমোচনে যাকাতের ভূমিকা অনস্বীকার্য। সঠিকভাবে যাকাতের অর্থ দরিদ্রদের মাঝে বণ্টন করলে সমাজ থেকে দারিদ্র্য দূর হতে বাধ্য।
৮. ঋণমুক্তি: যাকাতের অর্থ দ্বারা ব্যক্তি সমাজ ও রাষ্ট্রকে ঋণমুক্ত করা যায়।
৯. চাকরির সুযোগ: রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় যাকাত উত্তোলন ও বিতরণের ব্যবস্থা করলে যাকাত বিভাগে অসংখ্য লোকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

শহীদুজ্জামান কাকন,

(শহীদুজ্জামান কাকন)

১০. পুঁজিবাদের অবসান: যাকাত ব্যবস্থা প্রবর্তনের ফলে পুঁজিবাদের অভিশাপ থেকে জাতি মুক্তি পাবে। ইসলামি অর্থ ব্যবস্থার এ মূলনীতিকে সামনে রেখেই আল্লাহর ঘোষণা:
যাতে ধনৈশ্বর্য কেবল তোমাদের বিত্তশালীদের মধ্যেই পুঞ্জিভূত না হয়।
১১. বেকারত্ব দূরীকরণ: বেকার জীবন অভিশপ্ত জীবন। ইসলামের যাকাত ব্যবস্থা সমাজ থেকে বেকারত্ব দূরীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যাকাতের অর্থ দিয়ে বেকার লোকদের কোনো না কোনো কাজের ব্যবস্থা করা যায়।
১২. অর্থনৈতিক প্রতারণা বন্ধ :
যাকাত ব্যবস্থার মাধ্যমে মানুষের মাঝে প্রচলিত অর্থনৈতিক প্রতারণা বন্ধ করা যায়। আধুনিক কর ব্যবস্থায় ফাঁকির প্রবণতা থাকলেও যাকাত ব্যবস্থায় ফাঁকি অকল্পনীয়। কেননা বিত্তশালীরা একান্তই ধর্মীয় অনুভূতি নিয়ে আল্লাহর নির্দেশ পালনের লক্ষ্যে স্বেচ্ছায় যাকাত দিয়ে থাকে।
১৩. কর্মসংস্থানের সৃষ্টি: যাকাতের অর্থ একত্রিত করে শিল্প-কারখানা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে অনেক কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা যায়।
১৪. সমবায় সমিতি গঠন: যাকাতের অর্থ একত্রিত করে দরিদ্র জনসাধারণের মাঝে যদি সমবায় সমিতি গঠন করা যায়, তাহলে এর মাধ্যমে দরিদ্র জনগোষ্ঠী বিভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে আর্থ-সামাজিক উন্নতি সাধন করতে পারে।
১৫. জনকল্যাণমূলক কাজ: যাকাতের অর্থে এতিমখানা, বিদ্যালয় ও দাতব্য চিকিৎসালয় প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি জনকল্যাণমূলক কার্য-সম্পাদন করা যায়।
মহান আল্লাহ আমাদের বুঝার এবং আমল করার তৌফিক দান করুন। আমিন।

 


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


[prayer_time pt="on" sc="on"]