বৃহস্পতিবার, ২৭ অগাস্ট ২০২৬, ১১:৪৭ পূর্বাহ্ন
১. পটভূমি:*
প্রথমে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি: ২০২৬ সালের ৭ আগস্ট সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে মূল নীতি হলো—এক সদস্যের ওপর সশস্ত্র আক্রমণকে তিন সদস্যের ওপর আক্রমণ হিসেবে বিবেচনা করা। তবে এটি এখনো ন্যাটোর মতো পূর্ণাঙ্গ সামরিক কাঠামো নয়; যৌথ কমান্ড, বাহিনী বা প্রতিক্রিয়ার বিস্তারিত কাঠামো স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয়নি।
*২. ভারত কেন উদ্বিগ্ন*
ভারতের উদ্বেগের মূল কারণ বাংলাদেশের ধর্মীয় পরিচয় নয়, ভূ-কৌশলগত অবস্থান এবং পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সামরিক জোটে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা।
বাংলাদেশ এই চুক্তিতে যোগ দিলে ভারতের পূর্ব সীমান্তে পাকিস্তান-ঘনিষ্ঠ একটি সামরিক কাঠামোর রাজনৈতিক উপস্থিতি তৈরি হবে।
পাকিস্তান, তুরস্ক ও সৌদি আরবের মধ্যে প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ও সামরিক সহযোগিতা ভারতের জন্য নতুন হিসাব তৈরি করছে।
চুক্তির যৌথ প্রতিরক্ষার ধারা কতদূর বিস্তৃত—এবং ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের ক্ষেত্রে তা কার্যকর হবে কি না—সেটি এখনো অস্পষ্ট। ভারতীয় বিশ্লেষকদের একটি বড় উদ্বেগও এটাই।
তবে বাংলাদেশে চুক্তি নিয়ে আলোচনা হলেও চূড়ান্ত সদস্যপদের সিদ্ধান্ত হয়েছে—এমন নির্ভরযোগ্য তথ্য নেই।
*৩. ভারতের বিরোধিতা চুক্তি ঠেকাতে পারবে কিনা*
সরাসরি পারবে না। বাংলাদেশ একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র; চুক্তিতে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত তার নিজের। ভারত ভেটো দিতে পারবে না।
তবে ভারত পরোক্ষ প্রভাব বিস্তার করতে পারে:
(১)কূটনৈতিক চাপ ও সম্পর্ক পুনর্বিন্যাস;
(২) সীমান্ত ও নিরাপত্তা সহযোগিতায় পরিবর্তন;
(৩) বাংলাদেশকে বিকল্প অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতার প্রস্তাব;
(৪) ওয়াশিংটন, উপসাগরীয় রাষ্ট্র ও অন্যান্য অংশীদারের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ।
তবে ভারতের চাপ অতিরিক্ত হলে উল্টো ফলও হতে পারে—বাংলাদেশ তার কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন আরও জোরালোভাবে প্রতিষ্ঠা করতে পারে। সুতরাং ভারতের বাস্তব প্রভাব থাকবে, কিন্তু বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা ভারতের নেই।
*৪. অন্যান্য পরাশক্তির অবস্থান*
*(১) যুক্তরাষ্ট্র:* এখন পর্যন্ত প্রকাশ্য তীব্র বিরোধিতার চিত্র নেই। কারণ এই জোটকে ইরান-সংক্রান্ত আঞ্চলিক প্রতিরোধের একটি অতিরিক্ত কাঠামো হিসেবেও দেখা হচ্ছে। তবে ওয়াশিংটন চাইবে, এই জোট যেন তার আঞ্চলিক স্বার্থের সম্পূর্ণ বাইরে চলে না যায়।
*(২) চীন:* চীন প্রকাশ্যে বিরোধিতার অবস্থান নেয়নি। পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ অংশীদার হওয়ায় চীন জোটটির বিকাশ পর্যবেক্ষণ করবে। তবে বাংলাদেশকে সরাসরি ভারতবিরোধী সামরিক অক্ষে ঠেলে দেওয়ার বদলে বেইজিং সম্ভবত প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত সহযোগিতার সুযোগ দেখবে।
*(৩) রাশিয়া:* রাশিয়া সতর্ক থাকবে। কারণ চুক্তির মধ্যে তুরস্ক—ন্যাটোর সদস্য—আছে। আবার ভারত রাশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার। ফলে রাশিয়া প্রকাশ্যে সংঘাতমূলক অবস্থান না নিয়ে সম্পর্ক রক্ষার চেষ্টা করতে পারে।
*৫. ইরানের অবস্থান: সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনশীল*
ইরান প্রথমদিকে এই চুক্তি নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছে। ইরানি কর্মকর্তারা এটিকে নিরাপত্তার নিশ্চিত গ্যারান্টি হিসেবে মানতে চাননি এবং আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যে নিজেদের ওপর নির্ভরশীল নিরাপত্তা ব্যবস্থার কথা বলেছেন। অন্যদিকে তুরস্ক বলেছে, চুক্তিটি কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে নয়।
এখানে একটি বড় অনিশ্চয়তা রয়েছে: সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে ইরানকে চুক্তিতে যোগদানের আমন্ত্রণের কথাও বলা হয়েছে, কিন্তু এটি এখনো চূড়ান্ত সদস্যপদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত নয়। ইরান যোগ দিলে পুরো সমীকরণ বদলে যেতে পারে—কারণ তখন সম্ভাব্য সুন্নি-কেন্দ্রিক প্রতিরক্ষা কাঠামো আরও ব্যাপক আঞ্চলিক নিরাপত্তা প্ল্যাটফর্মে রূপ নিতে পারে।
**৬. বাংলাদেশ যোগ দিলে সম্ভাব্য লাভ*
(১) *কৌশলগত গুরুত্ব বৃদ্ধি*: বাংলাদেশ একটি বৃহত্তর প্রতিরক্ষা ও কূটনৈতিক নেটওয়ার্কে প্রবেশ করতে পারে।
(২) *সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্কের গভীরতা*: বিনিয়োগ, জ্বালানি, কর্মসংস্থান ও প্রবাসী বাংলাদেশিদের স্বার্থে অতিরিক্ত কূটনৈতিক সুবিধা হতে পারে।
(৩)* তুরস্কের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি*: ড্রোন, প্রতিরক্ষা শিল্প, সামরিক প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার সুযোগ বাড়তে পারে।
(৪) *পাকিস্তানের সঙ্গে নতুন নিরাপত্তা সংলাপ*: ঐতিহাসিক সম্পর্কের জটিলতা থাকলেও বহুপক্ষীয় কাঠামোতে নিরাপত্তা সহযোগিতার একটি নতুন ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে।
(৫). *বঙ্গোপসাগর-ভারত মহাসাগর অঞ্চলে গুরুত্ব*: বাংলাদেশের ভূগোল ও সমুদ্রপথ আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা রাজনীতিতে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
*৭. সম্ভাব্য ক্ষতি ও ঝুঁকি*
(১). *ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের চাপ:* এটাই সবচেয়ে বড় ঝুঁকি। বাংলাদেশের স্বাধীন সিদ্ধান্ত হলেও ভারত একে নিজের নিরাপত্তা স্বার্থের দৃষ্টিতে দেখবে।
(২). *জটিল বিদেশনীতি*: বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি অনুসরণ করে আসছে। কোনো আনুষ্ঠানিক সামরিক জোটে যোগ দিলে সেই নীতির ওপর চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
(৩). *অপ্রাসঙ্গিক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা*: ইরান-সৌদি, ইয়েমেন, লোহিত সাগর বা পশ্চিম এশিয়ার কোনো সংঘাতে বাংলাদেশের প্রত্যক্ষ স্বার্থ না থাকলেও প্রতিরক্ষা দায়বদ্ধতার প্রশ্ন উঠতে পারে।
(৪). *পাকিস্তান-ভারত সংঘাতের ০জটিলতা*: সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—পাকিস্তান কোনো সংঘাতে চুক্তির যৌথ প্রতিরক্ষা ধারা সক্রিয় করতে চাইলে বাংলাদেশের অবস্থান কী হবে?
*৮. অর্থনৈতিক ঝুঁকি*: বাংলাদেশকে ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, চীন এবং মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে একযোগে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে হয়। সামরিক মেরুকরণ রপ্তানি, বিনিয়োগ ও কূটনৈতিক ভারসাম্যকে জটিল করতে পারে।
*৯. বাংলাদেশের কি করা উচিত*
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ হবে চুক্তির পূর্ণ সদস্য হওয়ার আগে তিনটি শর্ত নিশ্চিত করা:
*প্রথমত:* কোনো সদস্যের দ্বিপক্ষীয় যুদ্ধ—বিশেষ করে ভারত-পাকিস্তান সংঘাত—বাংলাদেশের জন্য স্বয়ংক্রিয় সামরিক বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি করবে না।
*দ্বিতীয়ত:* বাংলাদেশের অংশগ্রহণ হবে প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ, গোয়েন্দা সহযোগিতা, সাইবার নিরাপত্তা ও মানবিক নিরাপত্তাকেন্দ্রিক।
*তৃতীয়ত:* চুক্তির কোনো ধারা বাংলাদেশের “সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে শত্রুতা নয়” নীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারবে না।
উপসংহার বলা যায় যে,
মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি বাংলাদেশের জন্য যেমন একটি কৌশলগত সুযোগ, তেমনি একটি সম্ভাব্য ভূ-রাজনৈতিক ফাঁদও। অন্ধভাবে যোগ দিলে ভারতসহ প্রতিবেশী শক্তির সঙ্গে সম্পর্কের জটিলতা বাড়তে পারে। আবার পুরোপুরি দূরে থাকলে সৌদি আরব, তুরস্ক ও বৃহত্তর মুসলিম বিশ্বের নতুন নিরাপত্তা কাঠামোয় বাংলাদেশের ভূমিকা সীমিত হতে পারে।
সুতরাং বাংলাদেশের জন্য সর্বোত্তম নীতি হলো—“জোটে সহযোগিতা, কিন্তু যুদ্ধে স্বয়ংক্রিয় বাধ্যবাধকতা নয়।” জাতীয় স্বার্থ ও কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন সুরক্ষিত রেখে, একটি শর্তযুক্ত বা পর্যবেক্ষকধর্মী অংশগ্রহণ পূর্ণ সদস্যপদের চেয়ে আপাতত বেশি নিরাপদ হতে পারে। *[অধ্যাপক এম এ বার্ণিক — প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত নিরাপত্তা বিশ্লেষণে সুপরিচিত নাম]*