মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:২৩ পূর্বাহ্ন

শিরোনাম
মাগুরায় শ্রীপুর উপজেলায় জাতীয় কন্যাশিশু দিবস পালি বিজ্ঞানের জয়যাত্রা: মিরপুরে প্যারাডাইজ ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে বিজ্ঞান মেলা ২০২৬ অনুষ্ঠিত মাগুরায় চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং টার্মিনাল ইজারা চুক্তি বাতিলের দাবিতে বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত মাগুরার শ্রীপুরে নবাগত ইউএনও’র সাথে প্রেস ক্লাবের সাংবাদিকদের মতবিনিময় অনুষ্ঠিত জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের প্রধান আইন বিষয়ক উপদেষ্টা হলেন মাগুরার অ্যাড. কাজী আব্দুর রশিদ Five Historic Challenges Facing Tarique Rahman* *— Professor M. A. Barnik তারেক রহমানের পাঁচটি ঐতিহাসিক চ্যালেঞ্জ* *— অধ্যাপক এম এ বার্ণিক* মাগুরায় শিশু একাডেমির আয়োজনে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন   মাগুরায় আর্দশ শিক্ষক ফেডারেশনের আয়োজনে বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালিত মাগুরায় ৮ হাজার ইয়াবা ও নারীসহ ৩ মাদক কারবারি আচক! টাকা ও বাইক জব্দ!

কোনো সান্ত্বনা নয়, শিশুসুরক্ষার কার্যকর পদক্ষেপ দৃশ্যমান হোক* *—অধ্যাপক এম এ বার্ণিক

সংবাদদাতা / ২০৬ বার ভিউ
সময়ঃ মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:২৩ পূর্বাহ্ন

বাংলাদেশের আকাশে আজকাল এক অদ্ভুত শব্দ ভেসে বেড়ায়। এটি কোনো ঝড়ের শব্দ নয়, কোনো বজ্রপাতের গর্জনও নয়। এটি অসহায় মা-বাবার কান্না, নির্যাতিত শিশুর নীরব আর্তনাদ, চিকিৎসাহীনতায় মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়া শিশুদের অপূর্ণ জীবনের দীর্ঘশ্বাস।

কয়েক দিন পরপরই খবরের কাগজের পাতা রক্তাক্ত হয়ে ওঠে। কোথাও শিশুধর্ষণ, কোথাও বলাৎকার, কোথাও নির্মম হত্যাকাণ্ড। আবার কোথাও হাসপাতালের বারান্দায়, অক্সিজেনের অভাবে, ওষুধের অভাবে কিংবা চিকিৎসকের নাগালের বাইরে থেকে একের পর এক শিশুর জীবন নিভে যায়। সংবাদ প্রকাশিত হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম উত্তাল হয়, প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। তারপর যথারীতি রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে গভীর শোক, সমবেদনা, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের জন্য আর্থিক সহায়তার ঘোষণা।

আমাদের রাষ্ট্র যেন ক্রমশ এক অদ্ভুত দক্ষতা অর্জন করেছে—দুর্ঘটনা ঠেকানোর চেয়ে দুর্ঘটনার পর সান্ত্বনা দিতে বেশি পারদর্শী হয়ে উঠেছে।

মনে হয়, শিশুর নিরাপত্তার জন্য যে দুর্গ নির্মিত হওয়ার কথা ছিল, সেখানে সান্ত্বনার ব্যানার টাঙানো হয়েছে। যে দরজায় পাহারাদার থাকার কথা ছিল, সেখানে সমবেদনার ফুলদানি রাখা হয়েছে।

একজন পিতা তার নির্যাতিত সন্তানের ছবি বুকে চেপে আদালতের সিঁড়িতে বসে আছেন। একজন মা হাসপাতালের করিডোরে সন্তানের নিথর শরীর জড়িয়ে নির্বাক হয়ে আছেন। তাঁদের কাছে সান্ত্বনার ভাষা অনেকটা মরুভূমিতে বৃষ্টির ছবির মতো—দেখতে সুন্দর, কিন্তু তৃষ্ণা মেটায় না।

আমাদের সমাজে আজ এমন এক সময় এসেছে, যখন শিশুদের নিয়ে সবচেয়ে বেশি বক্তৃতা হয়, অথচ তাদের নিরাপত্তা নিয়ে সবচেয়ে কম দৃশ্যমান পরিবর্তন দেখা যায়। সভা-সেমিনারে বলা হয়, “শিশুরাই জাতির ভবিষ্যৎ।” কিন্তু সেই ভবিষ্যৎ যখন ধর্ষকের হাতে লাঞ্ছিত হয়, হত্যাকারীর হাতে প্রাণ হারায় কিংবা হাসপাতালের অব্যবস্থাপনায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে, তখন সেই বাক্যটি যেন নিষ্ঠুর রসিকতায় পরিণত হয়।

রসিকতার কথা উঠলে বলতে হয়, আমাদের প্রশাসনিক সংস্কৃতিতে এক অদ্ভুত প্রথা চালু হয়েছে। কোনো মর্মান্তিক ঘটনা ঘটলেই তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি রিপোর্ট দেয়, রিপোর্ট ফাইলের ভেতর ঘুমায়, ফাইল আলমারিতে বিশ্রাম নেয়, আর মানুষ নতুন ঘটনার অপেক্ষায় থাকে। মনে হয়, অপরাধের বিচার নয়, তদন্তের সংখ্যাই যেন সাফল্যের মাপকাঠি।

শিশু নির্যাতনের ঘটনায় আমরা প্রায়ই শুনি—“দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” এই বাক্যটি এতবার বলা হয়েছে যে, এখন এটি অনেকটা পুরোনো নাটকের মুখস্থ সংলাপের মতো শোনায়। কিন্তু সাধারণ মানুষ জানতে চায়, কঠোর ব্যবস্থার ফলাফল কোথায়? অপরাধীদের দ্রুত বিচার কোথায়? শিশুদের নিরাপদ পরিবেশ কোথায়?

একটি সভ্য রাষ্ট্রের পরিচয় তার উঁচু সেতু, ঝকঝকে ভবন বা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার দিয়ে নির্ধারিত হয় না। নির্ধারিত হয় সবচেয়ে দুর্বল নাগরিক কতটা নিরাপদ, তার দ্বারা। আর শিশুদের চেয়ে দুর্বল ও সুরক্ষাপ্রার্থী নাগরিক আর কে আছে?

আজ বাংলাদেশের বহু পরিবার তাদের সন্তানকে স্কুলে পাঠিয়ে উদ্বেগে থাকে, খেলতে পাঠিয়ে শঙ্কায় থাকে, হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে আতঙ্কে থাকে। এই পরিস্থিতি কোনো সুস্থ সমাজের লক্ষণ হতে পারে না।

তবে অন্ধকার যত গভীরই হোক, আলোর প্রয়োজনীয়তা ততই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

এখন সময় এসেছে প্রতিক্রিয়ার রাজনীতি থেকে প্রতিরোধের রাষ্ট্রব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার।

শিশুধর্ষণ, নির্যাতন ও হত্যার মামলাগুলোর দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। বিচার বিলম্বিত হলে অপরাধীরা সাহস পায়, সমাজ ভয় পায়। প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় কার্যকর শিশু সুরক্ষা ইউনিট গড়ে তুলতে হবে, যেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, মনোবিজ্ঞানী, সমাজকর্মী ও চিকিৎসকের সমন্বিত সেবা থাকবে।

হাসপাতালগুলোতে শিশু চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধ, যন্ত্রপাতি ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নিশ্চিত করতে হবে। কোনো শিশুর মৃত্যু যেন আর অব্যবস্থাপনার কারণে না ঘটে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিশু নিরাপত্তা ও আত্মরক্ষামূলক সচেতনতা শিক্ষা চালু করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে পরিবার ও সমাজকে আরও দায়িত্বশীল ও সচেতন করে তুলতে হবে।

সবচেয়ে বড় কথা, প্রতিটি শিশুর প্রতি রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা দৃশ্যমান হতে হবে। শুধু সংবাদ সম্মেলনে নয়, বাস্তব পদক্ষেপে; শুধু সমবেদনার ভাষণে নয়, নিরাপত্তার ব্যবস্থায়; শুধু অনুদানের খামে নয়, আইনের কার্যকারিতায়।

কারণ একটি শিশুর মৃত্যু কেবল একটি পরিবারের শোক নয়, একটি জাতির ব্যর্থতা। একটি শিশুর নির্যাতন কেবল একটি অপরাধ নয়, সভ্যতার বিরুদ্ধে আঘাত। আর একটি শিশুর কান্না কেবল ব্যক্তিগত বেদনা নয়, রাষ্ট্রের বিবেকের পরীক্ষা।

তাই আজ দেশের মানুষ সান্ত্বনার নতুন ভাষা শুনতে চায় না। তারা দেখতে চায় নিরাপদ স্কুল, নিরাপদ রাস্তা, নিরাপদ হাসপাতাল, নিরাপদ সমাজ। তারা দেখতে চায় অপরাধীর দ্রুত বিচার এবং শিশুর নিশ্চিত সুরক্ষা।

কারণ যে শিশুর জীবন আর ফিরবে না, তার পরিবারের কাছে কোনো অনুদান যথেষ্ট নয়; যে হাসি চিরদিনের জন্য নিভে গেছে, তাকে কোনো শোকবার্তা ফিরিয়ে আনতে পারে না।

আজ তাই সময়ের সবচেয়ে জোরালো দাবি—

কোনো সান্ত্বনা নয়, শিশুসুরক্ষার কার্যকর পদক্ষেপ দৃশ্যমান হোক।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


[prayer_time pt="on" sc="on"]