মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১০:৩৬ অপরাহ্ন
১। প্রেক্ষাপট: তারেক রহমানের জাপান সফর
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ২৬–২৯ অক্টোবর ২০২৬-এর জাপান সফরে বাংলাদেশ ও জাপান Bay of Bengal Industrial Growth Belt (BIG-B) উদ্যোগকে BIG-B for Shared Prosperity নামে নতুন সহযোগিতা কাঠামোয় উন্নীত করতে সম্মত হয়।
তবে এ উদ্যোগকে ঘিরে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক সংযোগের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ফলে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার পাশাপাশি এর আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক গুরুত্বও বেড়েছে।
২। জাপানি সংবাদমাধ্যমে ভারতের গুরুত্ব
জাপানের Nikkei সংবাদমাধ্যমে বাংলাদেশে আগামী পাঁচ বছরে প্রায় এক ট্রিলিয়ন ইয়েন জাপানি বিনিয়োগের পরিকল্পনার কথা উঠে এসেছে।
অন্যদিকে, জাপানের Indo-Pacific কৌশলে ভারত একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগ সম্প্রসারণ এবং বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক সংযোগ গড়ে তোলার বিষয়টি জাপানের বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ।
জাপানের JICA Ogata Research Institute-এর গবেষণাতেও বাংলাদেশ, ভারত ও জাপানের ত্রিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সহযোগিতার সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়েছে।
৩। BIG-B: বাংলাদেশের সম্ভাবনা ও ভারতের স্বার্থ
২০১৪ সালে শুরু হওয়া BIG-B-এর মূল লক্ষ্য বাংলাদেশের শিল্পায়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন, জ্বালানি নিরাপত্তা ও বাণিজ্য সম্প্রসারণ। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর এ উদ্যোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তবে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান কাজে লাগিয়ে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে বঙ্গোপসাগরের যোগাযোগ বৃদ্ধির সম্ভাবনাও রয়েছে। এতে ভারত বাণিজ্যিক সুবিধা পেতে পারে। প্রশ্ন হলো, এর বিপরীতে বাংলাদেশ কতটা অর্থনৈতিক সুবিধা, বিনিয়োগ ও রাজস্ব নিশ্চিত করতে পারবে।
৪। ২৭ অক্টোবরের যৌথ ঘোষণা ও ভারতের অবস্থান
জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত যৌথ ঘোষণায় যোগাযোগ, দুর্যোগ মোকাবিলা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতাকে সহযোগিতার প্রধান ক্ষেত্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
আগামী পাঁচ বছরে প্রায় এক ট্রিলিয়ন ইয়েন বিনিয়োগ এবং প্রায় দুই লাখ কর্মসংস্থানের সম্ভাবনার কথাও বলা হয়েছে।
তবে যৌথ ঘোষণায় ভারতকে BIG-B-এর আনুষ্ঠানিক অংশীদার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার কোনো সুস্পষ্ট উল্লেখ নেই।
৫। বাংলাদেশের অবস্থান ও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্ন
৩০ অক্টোবর পররাষ্ট্রবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির জানান, BIG-B নিয়ে আলোচনা বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল; তৃতীয় কোনো দেশকে অন্তর্ভুক্ত করার আলোচনা হয়নি।
বাংলাদেশের উচিত যেকোনো আঞ্চলিক সহযোগিতায় কয়েকটি বিষয় নিশ্চিত করা:
– মাতারবাড়ীসহ নিজস্ব বন্দরের ব্যবহারে বাংলাদেশের অগ্রাধিকার।
– ট্রানজিট ও পরিবহন ব্যবহারের বিপরীতে ন্যায্য মাশুল।
– বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও শিল্পায়নের বাস্তব সুফল।
– অবকাঠামো ও সামুদ্রিক নিরাপত্তায় বাংলাদেশের সার্বভৌম কর্তৃত্ব।
– চুক্তির শর্তে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি।
৬। ভূরাজনৈতিক মূল্যায়ন ও উপসংহার
জাপানের কাছে বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদার। অন্যদিকে, ভারতের কাছে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান উত্তর-পূর্বাঞ্চলের যোগাযোগ ও বাণিজ্য সম্প্রসারণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
অতএব, ভারত-জাপান কৌশলগত সমীকরণে বাংলাদেশকে নিজের জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক প্রাপ্তি ও সার্বভৌমত্বকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। জাপানের সঙ্গে সহযোগিতা এবং ভারতের সঙ্গে প্রয়োজনভিত্তিক যোগাযোগ বজায় রেখেও চীনসহ অন্যান্য উন্নয়ন অংশীদারের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক রক্ষা করা জরুরি।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান অন্য দেশের কৌশলগত সুবিধা সৃষ্টি করতে পারে; তবে সেই সুবিধার বিনিময়ে বাংলাদেশের ন্যায্য অর্থনৈতিক প্রাপ্তি ও জাতীয় স্বার্থ নিশ্চিত করাই হতে হবে রাষ্ট্রীয় কূটনীতির প্রধান লক্ষ্য। *[লেখক অধ্যাপক এম এ বার্ণিক একজন উচ্চমার্গের প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ও আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক কৌশল সম্পর্কে সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষক।]*