মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১০:৩৬ অপরাহ্ন
যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে মিশিগান অঙ্গরাজ্যের সিনেট নির্বাচন বিশেষ আন্তর্জাতিক মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছেন ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী আবদুল আল-সাইদ (Abdul El-Sayed)। তিনি নির্বাচিত হলে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম মার্কিন সিনেটর হওয়ার গৌরব অর্জন করবেন।
**রাজনৈতিক উত্থান ও পরিচয়**
মিশিগানে জন্মগ্রহণকারী মিসরীয় বংশোদ্ভূত আবদুল আল-সাইদ পেশায় চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ। ইউনিভার্সিটি অব মিশিগান, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। ডেট্রয়েট নগরীর স্বাস্থ্য বিভাগের পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০১৮ সালে মিশিগানের গভর্নর নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তিনি প্রগতিশীল রাজনীতির পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন। ২০২৬ সালে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রাথমিক নির্বাচনে হ্যালি স্টিভেন্সকে পরাজিত করে সিনেট নির্বাচনের মনোনয়ন লাভ করেন।
**কেন তিনি আলোচিত?**
আল-সাইদের রাজনৈতিক কর্মসূচির কেন্দ্রে রয়েছে সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা, জীবনযাত্রার ব্যয় হ্রাস, শ্রমিক অধিকার, অর্থনৈতিক বৈষম্য কমানো এবং সামাজিক নিরাপত্তা সম্প্রসারণ। তাঁর প্রগতিশীল রাজনৈতিক অবস্থান তরুণ, শ্রমজীবী ও আরব-আমেরিকান ভোটারদের একটি অংশের সমর্থন অর্জন করেছে।
বিশেষ করে গাজায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের সমালোচনা এবং ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের পক্ষে তাঁর অবস্থান তাঁকে আন্তর্জাতিক আলোচনায় নিয়ে এসেছে। তিনি ইসরায়েলকে মার্কিন সামরিক সহায়তা প্রদানের প্রচলিত নীতিরও সমালোচক। এ কারণে ইসরায়েলপন্থী গোষ্ঠী ও ডেমোক্রেটিক পার্টির মধ্যপন্থী অংশের সঙ্গে তাঁর মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে।
**ধর্মীয় পরিচয় ও রাজনৈতিক বিতর্ক**
তাঁর মুসলিম পরিচয়কে কেন্দ্র করে নির্বাচনী প্রচারণায় বিভিন্ন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রতিপক্ষের কেউ কেউ তাঁকে ইসলামপন্থী উগ্রবাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করেছেন। তবে মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেছেন; এসব অভিযোগকে প্রমাণিত সত্য হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে মুসলিম প্রতিনিধি থাকলেও এখন পর্যন্ত কোনো মুসলিম সিনেটর নির্বাচিত হননি। ফলে আল-সাইদের বিজয় মুসলিম আমেরিকানদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের ইতিহাসে নতুন অধ্যায় সৃষ্টি করতে পারে।
**মিশিগান নির্বাচন কেন গুরুত্বপূর্ণ?**
রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সের সঙ্গে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুধু দুটি দলের নির্বাচনী লড়াই নয়; এটি আমেরিকার রাজনৈতিক মেরুকরণ, অভিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব এবং মধ্যপ্রাচ্য নীতির ভবিষ্যৎ নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।
মিশিগানের আরব-আমেরিকান, মুসলিম, কৃষ্ণাঙ্গ, শ্রমজীবী ও তরুণ ভোটারদের সমর্থন নির্বাচনের ফল নির্ধারণে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে। তাঁর বিজয় হলে প্রথম মুসলিম সিনেটর হিসেবে ঐতিহাসিক অর্জনের পাশাপাশি ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রগতিশীল ধারাও শক্তিশালী হতে পারে।
**উপসংহার**
আমার বিবেচনায়, আবদুল আল-সাইদের নির্বাচনী লড়াই কেবল একজন মুসলিম রাজনীতিকের সিনেটর হওয়ার আকাঙ্ক্ষা নয়; এটি আমেরিকার গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও বহুত্ববাদী সমাজব্যবস্থারও পরীক্ষা।
একজন নাগরিকের রাজনৈতিক যোগ্যতা তাঁর ধর্ম, বর্ণ কিংবা বংশপরিচয় দিয়ে নয়, বরং মেধা, সততা, রাজনৈতিক দর্শন ও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা দিয়ে মূল্যায়িত হওয়া উচিত।
আল-সাইদ নির্বাচিত হোন কিংবা না হোন, তাঁর রাজনৈতিক উত্থান আমেরিকার রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে—গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসনে সীমাবদ্ধ নয়; বরং সংখ্যালঘুর অধিকার ও সমান রাজনৈতিক সুযোগ নিশ্চিত করার মধ্যেই তার সার্থকতা।
*(অধ্যাপক এম এ বার্ণিক একজন সুপরিচিত
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সূক্ষ্ম ভূরাজনৈতিক পর্যবেক্ষক)*