রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৫৪ অপরাহ্ন

শিরোনাম
দৈনিক নয়া দিগন্তের ২৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে বাংলাদেশ সুশীল ফোরামের ফুলেল শুভেচ্ছা বাংলাভাষায় ছবি থেকে লেখা শনাক্ত করার প্রযুক্তি (OCR) ব্যবহার সমস্যা—-অধ্যাপক এম এ বার্ণিক Challenges in Using Optical Character Recognition (OCR) for the Bengali Language—-Professor M. A. Barnik জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তন করে ‘এআই বাংলা বিশ্ববিদ্যালয় (AIBU)’ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব* *— অধ্যাপক এম এ বার্ণিক মাগুরায় যুবদল নেতা সাকের হত্যার বিচারের দাবিতে মানববন্ধন,বিক্ষোভ মিছিল ও সড়ক অবরোধ! এআই-এর যুগে বাংলাভাষার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ* *—-অধ্যাপক এম এ বার্ণিক মাগুরায় জুলাই শহীদ আসিফ ইকবাল ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে ফুটবল টুর্নামেন্টের ফাইনাল ম্যাচ ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠিত পথিকদের বিশুদ্ধ পানির জন্য কালির বাজারে নলকূপ উদ্বোধন করেন জামায়াতে ইসলামী  মাগুরার শ্রীপুরে দূর্গাপুজায় মদপানে অসুস্থ হয়ে দুই যুবকের মৃত্যু! মাগুরায় সাকের হত্যার বিচারের দাবিতে জেলা মটর শ্রমিক ইউনিয়নের সংবাদ সম্মেলন

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তন করে ‘এআই বাংলা বিশ্ববিদ্যালয় (AIBU)’ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব* *— অধ্যাপক এম এ বার্ণিক

সংবাদদাতা / ৩ বার ভিউ
সময়ঃ রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৫৪ অপরাহ্ন

১. প্রস্তাবনার মূল দর্শন*

বাংলা ভাষা বাঙালির আত্মপরিচয়, আত্মমর্যাদা ও ঐতিহাসিক অস্তিত্বের ভিত্তি। ১৯৫২ সালের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন প্রমাণ করেছে, ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়; ভাষা একটি জাতির অধিকার, চেতনা ও আত্মপ্রতিষ্ঠার প্রতীক। সেই ঐতিহাসিক উত্তরাধিকারকে একবিংশ শতাব্দীর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিপ্লবের সঙ্গে যুক্ত করার সময় এসেছে।

এই বাস্তবতায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তন করে **‘এআই বাংলা বিশ্ববিদ্যালয় (Artificial Intelligence Bangla University—AIBU)’** নামকরণের প্রস্তাব উত্থাপন করছি।

এটি নিছক নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব নয়; এটি বাংলা ভাষাকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে বিশ্বজ্ঞান, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের অগ্রভাগে প্রতিষ্ঠিত করার একটি যুগোপযোগী জাতীয় উদ্যোগ। যে ভাষার মর্যাদা রক্ষায় বাঙালি রক্ত দিয়েছে, সেই ভাষাকে আধুনিক প্রযুক্তির শক্তিতে বিশ্বসভ্যতার জ্ঞানভান্ডারে আরও সমৃদ্ধ ও কার্যকর করে তোলাই হবে এই প্রতিষ্ঠানের অন্যতম লক্ষ্য।

*২. বিশ্ববিদ্যালয় হবে জ্ঞানের, কোনো সাম্প্রদায়িক আধিপত্যের নয়*

বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল পরিচয় তার জ্ঞানচর্চা, বিজ্ঞানমনস্কতা, মানবিকতা ও মুক্তবুদ্ধির চর্চায়। কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায়, রাজনৈতিক মতাদর্শ কিংবা সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্র বিশ্ববিদ্যালয় হতে পারে না।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে গরু জবাই ও গরুর মাংস খাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি এ ক্ষেত্রে গভীরভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। এ ধরনের বিধিনিষেধের মাধ্যমে যদি শিক্ষার্থীদের খাদ্যাভ্যাস ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের ওপর একক ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি চাপিয়ে দেওয়া হয়, তবে তা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্ভুক্তিমূলক চেতনা ও ব্যক্তিস্বাধীনতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এ ধরনের সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা ও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি স্পষ্ট হওয়া অপরিহার্য।

বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক আদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিশ্ববিদ্যালয়কে ধর্মীয় বৈচিত্র্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, বৈষম্যহীন এবং জ্ঞানকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। কোনো ধরনের সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসের পরিবর্তে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, মানবিকতা ও জাতীয় অগ্রগতিকে প্রাধান্য দিতে হবে।

**বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা নির্ধারিত হবে তার গবেষণাগারের উৎকর্ষে, শিক্ষার মানে, উদ্ভাবনী শক্তিতে এবং মানবকল্যাণে অবদানে—কোনো সাম্প্রদায়িক পরিচয়ের প্রাধান্যে নয়।**

*৩. কেন এআই বাংলা বিশ্ববিদ্যালয়*

বিশ্বসভ্যতা এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগান্তকারী রূপান্তরের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। এআই শিক্ষা, চিকিৎসা, কৃষি, শিল্প, অর্থনীতি, প্রতিরক্ষা, প্রশাসন ও গবেষণার প্রচলিত কাঠামোকে নতুনভাবে নির্মাণ করছে। আগামী দিনের রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা, অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা এবং প্রযুক্তিগত স্বাধীনতার সঙ্গে এই পরিবর্তন সরাসরি সম্পর্কিত।

এ অবস্থায় বাংলা ভাষাভিত্তিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষণার জন্য একটি বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

**এআই বাংলা বিশ্ববিদ্যালয় হবে বাংলা ভাষা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সমন্বয়ে একটি আধুনিক জ্ঞানসভ্যতা নির্মাণের কেন্দ্র।**

এখানে বাংলা ভাষার জন্য উন্নত এআই মডেল, স্বয়ংক্রিয় অনুবাদ প্রযুক্তি, বাংলা কণ্ঠস্বর শনাক্তকরণ, ভাষাভিত্তিক তথ্যপ্রযুক্তি, রোবোটিকস, ডেটা সায়েন্স, সাইবার নিরাপত্তা এবং দেশীয় প্রযুক্তি উদ্ভাবনে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। এর মাধ্যমে বাংলা ভাষার বিপুল সাহিত্যিক, ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পদকে ডিজিটাল জগতে আরও কার্যকরভাবে সংরক্ষণ ও ব্যবহার করা সম্ভব হবে।

*৪. প্রস্তাবিত বিশ্ববিদ্যালয়ের কৌশলগত লক্ষ্য*

এআই বাংলা বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি আন্তর্জাতিক মানের প্রযুক্তিনির্ভর উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত করার জন্য নিম্নলিখিত লক্ষ্যগুলোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে—

*(১) বাংলা ভাষাভিত্তিক এআই গবেষণা:* বাংলা ভাষার উপযোগী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ভাষা মডেল, অনুবাদব্যবস্থা ও কথোপকথন প্রযুক্তির উন্নয়ন।

*(২)বিশ্বমানের প্রযুক্তি শিক্ষা*: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কম্পিউটার বিজ্ঞান, রোবোটিকস, ডেটা সায়েন্স ও সাইবার নিরাপত্তায় দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি।

*(৩) প্রযুক্তিগত স্বনির্ভরতা:* বিদেশি প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় গবেষণা, উদ্ভাবন ও প্রযুক্তি উৎপাদনের সক্ষমতা বৃদ্ধি।

*(৪) বাংলা জ্ঞানভান্ডারের ডিজিটাল রূপান্তর:* ভাষা আন্দোলনের দলিল, বাংলা সাহিত্য, ইতিহাস ও লোকজ জ্ঞানকে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে সংরক্ষণ ও গবেষণার সুযোগ সৃষ্টি।

*(৫). আন্তর্জাতিক গবেষণায় অংশগ্রহণ:* বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলক গবেষণা ও প্রযুক্তি উদ্ভাবনের সক্ষমতা অর্জন।

*(৬) মানবকল্যাণমুখী প্রযুক্তি:* এআইয়ের নৈতিক ব্যবহার, তথ্যের গোপনীয়তা, বৈষম্য প্রতিরোধ এবং মানবিক মূল্যবোধের সুরক্ষা নিশ্চিত করা।

এই লক্ষ্যগুলো বাস্তবায়িত হলে বিশ্ববিদ্যালয়টি কেবল বাংলাদেশের শিক্ষাক্ষেত্রেই নয়, বাংলা ভাষাভিত্তিক প্রযুক্তির আন্তর্জাতিক বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।

*৫. নাম পরিবর্তন হবে ভবিষ্যৎমুখী রূপান্তরের ঘোষণা*

একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম তার লক্ষ্য ও পরিচয়ের প্রতীক। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তন করে এআই বাংলা বিশ্ববিদ্যালয় করার প্রস্তাবের তাৎপর্য হলো—প্রতিষ্ঠানটিকে বাংলা ভাষা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও ভবিষ্যৎ জ্ঞানচর্চার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত করা।

এই নামের মধ্যে রয়েছে বাংলা ভাষার ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার, প্রযুক্তিগত অগ্রগতির আকাঙ্ক্ষা এবং বিশ্বসভ্যতায় বাংলাদেশের অবদান রাখার প্রত্যয়।

নাম পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম, গবেষণা অবকাঠামো, প্রযুক্তি উদ্ভাবন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। এআই গবেষণাগার, বাংলা ভাষার ডিজিটাল করপাস, উন্নত কম্পিউটিং সুবিধা এবং দেশীয় প্রযুক্তি উদ্যোগের জন্য কার্যকর গবেষণা তহবিল গড়ে তুলতে হবে।

**নাম হবে এআই বাংলা বিশ্ববিদ্যালয়; পরিচয় হবে জ্ঞান ও উদ্ভাবনে; আর লক্ষ্য হবে বাংলা ভাষাকে প্রযুক্তির বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠিত করা।**

*৬. বাংলাভাষা ও বাঙ্গালির ঐতিহাসিক সুযোগ*

বাংলাদেশের জনসংখ্যা, বাংলা ভাষাভাষী মানুষের ব্যাপক উপস্থিতি এবং তরুণ প্রজন্মের প্রযুক্তিগত সম্ভাবনা—এই তিনটি শক্তিকে সমন্বিত করতে পারলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিশ্বে দেশটির জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত হতে পারে।

এআই বাংলা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা ভাষার প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা দূর করা, আন্তর্জাতিক মানের গবেষক তৈরি, দেশীয় উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করা এবং ডিজিটাল অর্থনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে একটি কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি হতে পারে।

এটি কেবল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আধুনিকায়ন নয়; এটি ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক মর্যাদা বৃদ্ধির একটি কৌশলগত উদ্যোগ।

*৭. বাংলা ভাষার ঐতিহ্য থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিশ্বজয়*

বাংলা ভাষার ঐতিহাসিক মর্যাদা রক্ষা এবং আধুনিক প্রযুক্তিতে অগ্রসর হওয়া—এ দুটি লক্ষ্যকে একই ধারায় যুক্ত করতে হবে। ভাষা আন্দোলনের উত্তরাধিকারকে কেবল স্মৃতিচারণে সীমাবদ্ধ না রেখে গবেষণা, উদ্ভাবন ও প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের মাধ্যমে বাস্তব রূপ দিতে হবে।

সেই লক্ষ্যেই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তন করে **‘এআই বাংলা বিশ্ববিদ্যালয় (AIBU)’** করার প্রস্তাব একটি সময়োপযোগী, সাহসী ও ভবিষ্যৎমুখী পদক্ষেপ।

আমরা এমন একটি বিশ্ববিদ্যালয় চাই, যেখানে বাংলা ভাষা হবে আধুনিক প্রযুক্তি উদ্ভাবনের শক্তিশালী মাধ্যম; যেখানে জ্ঞানচর্চা সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে থাকবে; যেখানে তরুণ প্রজন্ম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও বিশ্বমানের গবেষণায় নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করবে।

**বাংলা ভাষা শুধু অতীতের গৌরব নয়—এটি ভবিষ্যৎ প্রযুক্তিরও ভাষা হতে পারে। সেই ভবিষ্যৎ নির্মাণের লক্ষ্যে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘এআই বাংলা বিশ্ববিদ্যালয়’ হিসেবে রূপান্তরিত করার প্রস্তাবকে জাতীয় জ্ঞান ও প্রযুক্তি অগ্রযাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা হিসেবে গ্রহণ করা হোক।** *[লেখক অধ্যাপক এম এ বার্ণিক প্রথিতযশা রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন গবেষক এবং প্রথম
ভাষা-আন্দোলন মিউজিয়ামের প্রতিষ্ঠাতা হিসাবে সমধিক পরিচিত]*


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


[prayer_time pt="on" sc="on"]