রবিবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ০১:৪৩ পূর্বাহ্ন
— অধ্যাপক এম এ বার্ণিক
১. প্রারম্ভ— ইতিহাসের দায় ও নৈতিক কর্তব্য :
২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব ছিল একটি যুগান্তকারী মোড়। নিপীড়নের বিরুদ্ধে জনগণের এক অভূতপূর্ব অভ্যুত্থান সেই মুহূর্তে রাষ্ট্রক্ষমতায় এনেছিল একজন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদকে—ড. মুহম্মদ ইউনূসকে। তাঁর আগমনকে জাতি দেখেছিল আশার প্রতীক হিসেবে; একজন নিরপেক্ষ, দুর্নীতিবিরোধী এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ব্যক্তিত্ব হিসেবে তাঁর উপস্থিতি অনেকেই মনে করেছিলেন সত্যিকারের পরিবর্তনের সূচনা।
কিন্তু আজ, সেই বিপ্লব-পরবর্তী এক বছর পার হতেই জাতির প্রশ্ন—এই সরকার কী দিয়েছ? আর কী দিতে ব্যর্থ হয়েছে?
২. রক্তের ঋণ ও দায়শূন্যতা :
বিপ্লবের সময় নিহত অন্যূন দুই হাজার তরুণ, মাদ্রাসাছাত্র, ও রাজনৈতিক কর্মীর রক্তে যে পরিবর্তনের পথ তৈরি হয়েছিল, সেই পথ আজ ইতিহাসের পাতায় নির্বাক। এখন পর্যন্ত শহিদদের তালিকা চূড়ান্ত হয়নি, আহতদের চিকিৎসা ও পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের ব্যবস্থা হয়নি।
আর যে DB, RAB ও পুলিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ড, গুম ও নির্যাতনের অভিযোগ ছিল—তারা এখনো বহাল তবিয়তে কাজ করছে।
> “যাদের রক্তে পথ তৈরি, তাদের আজ রাষ্ট্রীয় নীরবতা উপহার!”
৩. বিচারহীনতার সংস্কৃতি— রাজনৈতিক বৈষম্য ও বিশ্বাসভঙ্গ :
বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের বিরুদ্ধে থাকা সব মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে—একটি রাজনৈতিক সমঝোতার অংশ হিসেবে। তাদেরকে আদালতে হাজিরই হতে হয়নি। অথচ একই সময়কার অন্যান্য দল ও কর্মীদের বিরুদ্ধে একই অভিযোগে মামলা বহাল রয়েছে। এই দ্বিমুখী বিচার ব্যবস্থা জনমনে প্রশ্ন জাগায়—এই কি সেই ‘নৈতিকতা’ যার নামে বিপ্লব হয়েছিল?
৪. নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ— লন্ডন বৈঠক ও যৌথ বিবৃতি :
২০২৫ সালের মার্চে লন্ডনে তারেক রহমানের সঙ্গে ড. ইউনূসের বৈঠক ও যৌথ বিবৃতি পুরো দেশকে নাড়িয়ে দেয়।
The Guardian লিখে—
> “A transitional leader is not supposed to sign political statements with the leader of a controversial past.”
(Guardian World, 26 March 2025)
এটি ছিল জাতির চোখে নিরপেক্ষতার মুখোশ খোলার মুহূর্ত।
৫. পুরনো শক্তির পুনরুত্থান—পরিবারতন্ত্র ও দলীয় আধিপত্য :
ড. ইউনূস বারবার বলেছেন, তিনি পরিবারতন্ত্রের বিরুদ্ধে। অথচ আজও প্রশাসনের বহু স্তরে দেখা যায়—আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সাবেক নেতারা পরামর্শক, ঘনিষ্ঠ, কিংবা সরাসরি সমন্বয়কারী হিসেবে নিয়োজিত।
পুরনো ছাত্রসংগঠনের নেতারা এখন নতুন রূপে ফিরে এসেছে প্রশাসনে—তারা যেন ‘নতুন জামার পুরনো শাসক’।
৬. বিচারবহির্ভূত বাহিনী বহাল— RAB এখনো সক্রিয় :
২০০৪ সালে গঠিত RAB-এর বিরুদ্ধে রয়েছে গুম, হত্যা, এবং নির্যাতনের বহু অভিযোগ। জাতিসংঘ ও Amnesty International বহুবার এই বাহিনীর বিরুদ্ধে সরব হয়েছে। কিন্তু ইউনূস সরকার এই বাহিনী বিলুপ্ত করেনি, বরং নতুন নামে অপারেশন চালিয়ে যাচ্ছে।
৭. অর্থনীতি ও দুর্নীতি—-অঙ্গীকার ছিল, অর্জন নেই :
ড. ইউনূস সরকার প্রথম বছরে চেষ্টা করেছে বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণ, SME খাতে ঋণ প্রণোদনা, এবং কিছু অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প বাতিল করতে। কিন্তু বাস্তবতা বলছে—
জিডিপি নেমে এসেছে ৩.২%-এ,
ডলারের অভাবে খাদ্য ও ওষুধ আমদানিতে সমস্যা,
পাচার হওয়া ৯.৭ বিলিয়ন ডলার ফিরিয়ে আনার কোনো পদক্ষেপ কার্যকর হয়নি।
৮. বৈদেশিক কূটনীতি—ভারসাম্য না দ্বিধা :
ড. ইউনূসের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা সত্ত্বেও, বৈদেশিক নীতিতে দেখা গেছে দ্বৈততা।
ভারত সীমান্ত হত্যা ও ট্রানজিট ইস্যুতে নিষ্ক্রিয়,
চীন বিনিয়োগ বাড়ালেও পশ্চিমা অসন্তোষ বাড়ছে,
যুক্তরাজ্য নির্বাচন ও মানবাধিকার প্রশ্নে কড়া,
জাপান রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা না পেলে বিনিয়োগ বাড়াতে চায় না,
কাতার শ্রমবাজারে আশ্বাস দিলেও বাস্তব অগ্রগতি নেই,
পাকিস্তান-এর সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের চেষ্টা কিছুদূর এগিয়ে আবার থেমে গেছে।
৯. নির্বাচন—-সময় ঠিক, প্রস্তুতি শূন্য :
ড. ইউনূস বলেছেন, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে নির্বাচন হবে। কিন্তু:
সংবিধান খসড়া এখনো চূড়ান্ত হয়নি,
নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন হয়নি,
ভোটার তালিকা হালনাগাদ হয়নি।
নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করলেই নির্বাচন হয় না—এই বাস্তবতা এখন ক্রমশ দৃশ্যমান।
১০. সম্ভাবনা ও সংশয়ের সন্ধিক্ষণে :
এক বছরের মাথায় বলা যায়, এই সরকার এখনো বিপ্লবের প্রেরণা আর বাস্তব শাসনের চাপের মাঝখানে আটকে আছে। যাঁরা বিপ্লব ঘটিয়েছেন, তাঁদের কণ্ঠ নিস্তব্ধ; আর যাঁরা দেশের দুর্নীতির স্থপতি ছিলেন, তাঁরা নতুন পরিচয়ে ফিরে এসেছেন।
ড. ইউনূসের ব্যক্তিগত সততা, মানবিক উচ্চারণ ও বিশ্বমঞ্চে মর্যাদা প্রশ্নাতীত। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে তিনি কি পারছেন নিজের অবস্থান রক্ষা করতে?
জনগণের প্রশ্ন তাই একটাই:
> “এই এক বছরে কি আমরা সত্যিকারের পরিবর্তন পেয়েছি, না পুরনো দুঃশাসনেরই ‘নৈতিক সংস্করণ’?”