সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ১২:২২ অপরাহ্ন
১. আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিংয়ের সতর্কসংকেত*
যুক্তরাজ্যভিত্তিক Times Higher Education (THE)-এর World University Rankings 2027 অনুযায়ী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ১০০১–১২০০ ব্যান্ডে নেমে এসেছে। অন্যদিকে, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ও এআইইউবি রয়েছে ৮০১–১০০০ ব্যান্ডে। ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একই ব্যান্ডে।
THE-এর মূল্যায়নে শিক্ষার পরিবেশ, গবেষণার পরিবেশ, গবেষণার মান, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্ক এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বিবেচিত হয়। তবে QS-এর ২০২৭ সালের র্যাঙ্কিংয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বের শীর্ষ ৬০০ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে। এই পার্থক্য প্রমাণ করে, র্যাঙ্কিংয়ের ফল মূল্যায়ন করতে হলে সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও তার পদ্ধতি বিবেচনায় নেওয়া অপরিহার্য।
*২. ডাকসুর উদ্যোগ সত্ত্বেও পরিবর্তন সীমিত কেন?*
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত এক বছর মেয়াদি কার্যক্রমের প্রতিবেদনে ৪১টি ক্ষেত্রে এক হাজারের বেশি উদ্যোগ গ্রহণের কথা জানিয়েছে। এসব উদ্যোগের মধ্যে আবাসন, পাঠকক্ষ, পরিবহন, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা এবং গবেষণা ও উচ্চশিক্ষায় বরাদ্দ বাড়ানোর বিষয় রয়েছে। ডাকসুর নেতারা প্রশাসনিক অসহযোগিতা ও বাজেট না পাওয়াকে বাস্তবায়নের প্রতিবন্ধকতা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
তবে উদ্যোগের সংখ্যা বাড়লেই শিক্ষার মান বাড়ে না। ডাকসুর প্রচেষ্টা কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে না পারার পেছনে কয়েকটি কারণ বিবেচনা করা প্রয়োজন।
*প্রথমত*, প্রশাসনিক সমন্বয়ের ঘাটতি: বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন, অর্থায়ন ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সহযোগিতা ছাড়া অনেক উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা কঠিন। ডাকসু ও প্রশাসনের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় না থাকলে শিক্ষার্থীদের সমস্যা সমাধানের পরিকল্পনা আটকে যেতে পারে।
*দ্বিতীয়ত*, অগ্রাধিকারের অসামঞ্জস্য: শিক্ষার্থীদের আবাসন, খাবারের মান, নিরাপত্তা ও নিয়মিত পাঠদান নিশ্চিত করার মতো মৌলিক সমস্যা সমাধান না করে অবকাঠামোগত প্রকল্পে বেশি মনোযোগ দিলে প্রত্যাশিত পরিবর্তন আসে না। ডাকসুর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনেও আবাসন ও খাবারের মানের সমস্যা অব্যাহত থাকার কথা উঠে এসেছে।
*তৃতীয়ত*, অর্থায়ন ও জবাবদিহির প্রশ্ন: ডাকসুর উদ্যোগে অর্থের উৎস, ব্যয়ের হিসাব, প্রশাসনিক অনুমোদন এবং প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ সম্পর্কে স্বচ্ছতা জরুরি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ডাকসুর কিছু অবকাঠামোগত উদ্যোগের অনুমোদন ও হিসাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। এসব বিরোধ নিষ্পত্তি না হলে উদ্যোগের কার্যকারিতা ও গ্রহণযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
*চতুর্থত*, ডাকসুর ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা: ডাকসু শিক্ষার্থীদের অধিকার ও কল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে; কিন্তু শিক্ষক নিয়োগ, গবেষণার অর্থায়ন, একাডেমিক নীতি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক সংস্কারের পূর্ণ কর্তৃত্ব তার হাতে নেই। ফলে ডাকসুর একক প্রচেষ্টায় আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিং উন্নত করা সম্ভব নয়।
*৩. উত্তরণের পথ: দায়িত্ব ভাগ করে কার্যকর উদ্যোগ*
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মানোন্নয়নে ডাকসু, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও শিক্ষকদের সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
*(১). ডাকসুর দায়িত্ব*: আবাসন, খাবারের মান, পাঠকক্ষ, নিরাপত্তা ও শিক্ষার্থীদের গবেষণায় অংশগ্রহণের সুযোগ উন্নয়নে অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং অগ্রগতির নিয়মিত প্রতিবেদন প্রকাশ।
*(২). বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দায়িত্ব*: গবেষণায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি, শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতা, আধুনিক গবেষণাগার প্রতিষ্ঠা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণ।
*(৩). যৌথ উদ্যোগ*: ডাকসু ও প্রশাসনের প্রতিনিধিদের নিয়ে সময়সীমাবদ্ধ কর্মপরিকল্পনা এবং নিয়মিত অগ্রগতি পর্যালোচনার ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
*(৪). আর্থিক জবাবদিহি*: সব প্রকল্পের অর্থের উৎস, ব্যয়, অনুমোদন ও নিরীক্ষার তথ্য প্রকাশ নিশ্চিত করা।
*(৫). র্যাঙ্কিংয়ের বাস্তব বিশ্লেষণ*: THE, QS এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক মূল্যায়নের সূচক পৃথকভাবে বিশ্লেষণ করে গবেষণা, শিক্ষার পরিবেশ ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার দুর্বলতা চিহ্নিত করা।
*৪. প্রশাসনিক সদিচ্ছা প্রয়োজন*
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মানোন্নয়ন কোনো একক সংগঠনের পক্ষে সম্ভব নয়। ডাকসুর উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ হলেও প্রশাসনিক সমন্বয়, সঠিক অগ্রাধিকার, স্বচ্ছ অর্থব্যবস্থা এবং একাডেমিক সংস্কার ছাড়া সেগুলো কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে পারবে না।
আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিংকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে না দেখে উন্নয়নের একটি নির্দেশক হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে ঐতিহাসিক মর্যাদার ওপর নির্ভর না করে গবেষণা, উদ্ভাবন, শিক্ষার মান ও শিক্ষার্থীদের কল্যাণে বাস্তব অগ্রগতি নিশ্চিত করতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে এগিয়ে নিতে ডাকসুর উদ্যোগ প্রয়োজন, প্রশাসনের সদিচ্ছা অপরিহার্য, আর গবেষণা ও একাডেমিক উৎকর্ষে ধারাবাহিক বিনিয়োগই হবে প্রকৃত পরিবর্তনের ভিত্তি।
*[ লেখক অধ্যাপক এম এ বার্ণিক একজন উচ্চমার্গের প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ও আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক পর্যবেক্ষণ, শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়নে তিনি মার্কিন শিক্ষামনোবিজ্ঞানী G. Stanley Hall-এর মতাদর্শের অনুগামী ]*