শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:৫৬ অপরাহ্ন
নির্বাচনকে নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন করতে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার অভিযান জরুরি
—অধ্যাপক এম এ বার্ণিক
১. ভূমিকা:
আগামী জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশে একটি শান্তিপূর্ণ, নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন পরিবেশ নিশ্চিত করা এখন রাষ্ট্রের অন্যতম অগ্রাধিকার। রাজনৈতিক উত্তাপ, এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, পুরনো শত্রুতার জটিলতা এবং নির্বাচনের আগে বিদ্যমান নানা ঝুঁকি মাথায় রেখে আইন–শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আগেভাগেই ‘প্রিভেন্টিভ অপারেশন’ বা প্রতিরোধমূলক অভিযানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিশেষ করে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার, বর্ডার বন্ধ রাখা এবং গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি—এই চারটি পদক্ষেপকে নির্বাচন নিরাপত্তার মূল স্তম্ভ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
২. অবৈধ অস্ত্রের থ্রেট ম্যাপিং ও জরুরি অভিযান:
নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা যায়—
রাজনৈতিক গ্রুপ সমর্থিত সন্ত্রাসী চক্র,
স্থানীয় চাঁদাবাজ বাহিনী,
মাদক–সন্ত্রাস চক্র,
এবং বর্ডার এলাকা থেকে প্রবেশকারী অস্ত্র ব্যবসায়ীরা
নানা ধরনের অস্ত্র সংগ্রহ করে এলাকাভিত্তিক শক্তি প্রদর্শন বা ভোটকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে।
সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী
র্যাব, পুলিশ ও ডিবি যৌথভাবে দেশের ৪৩টি জেলায় ‘অবৈধ অস্ত্র হটস্পট’ শনাক্ত করেছে।
এসব এলাকায় দেশি–বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র, এলজি, রিভলভার, শটগান, একে–২২ ও একে–৪৭-এর মতো উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন অস্ত্র চোরাচালানের শঙ্কা ছিল।
গত কয়েক সপ্তাহে পরিচালিত অভিযানে ৩৫০টির বেশি আগ্নেয়াস্ত্র, প্রায় ৫,০০০ রাউন্ড গুলি এবং বিপুল বিস্ফোরক উদ্ধার করা হয়েছে।
সীমান্তবর্তী কিছু এলাকায় মাটিচাপা অস্ত্রভান্ডারও শনাক্ত হয়েছে।
গোয়েন্দা প্রতিবেদন বলছে, নির্বাচনের আগে এসব অস্ত্র ব্যবহার করে নাশকতা বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির একটি সংগঠিত পরিকল্পনা ছিল। এরই আলোকে অভিযান জোরদার করা হয়েছে।
৩. তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী ও ওয়ারেন্টভুক্ত আসামিদের গ্রেফতার অভিযান:
নির্বাচনের আগে সম্ভাব্য সহিংসতা রোধে আইন–শৃঙ্খলা বাহিনী তিন ধরনের গ্রুপকে টার্গেট করছে
(১). তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজ বাহিনী।
(২). ওয়ারেন্টভুক্ত পলাতক আসামি।
(৩). রাজনৈতিক সহিংসতায় পূর্বে জড়িত চক্র।
অভিযানের সাম্প্রতিক চিত্র:
ডিবি ও র্যাব যৌথভাবে তৈরি করা ‘হাই রিস্ক প্রোফাইল’ তালিকায় প্রায় ১,৭০০ ব্যক্তি রয়েছে।
গত মাসে অন্তত ৬০০ জন তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী গ্রেফতার হয়েছে।
ঢাকার ১৬টি থানা এলাকায় শুধু বিশেষ অভিযানে ১৮টি কুখ্যাত বাহিনীর ৮৬ জন সদস্য ধরা পড়েছে।
চট্টগ্রাম, খুলনা, কক্সবাজার, সিলেট, বরিশাল ও নারায়ণগঞ্জে বড় ধরনের সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া হয়েছে।
বিভিন্ন জেলা গোয়েন্দা ইউনিটকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে—
“নির্বাচনকালীন সহিংসতায় জড়াতে পারে এমন যেকোনো ব্যক্তি আগেভাগে শনাক্ত ও গ্রেফতার করতে হবে।”
৪. সীমান্ত এলাকা সিলগালা ও অস্ত্র প্রবাহ বন্ধে কঠোর নজরদারি :
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনীকে নির্বাচনের আগে বিশেষ মোতায়েন করা হয়েছে।
ভারত, মিয়ানমার ও সমুদ্রসীমা দিয়ে অস্ত্র পাচারের রুটে রেড অ্যালার্ট জারি।
সীমান্তে অতিরিক্ত চেকপোস্ট, রাত্রিকালীন টহল বৃদ্ধি ও ড্রোন নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
কক্সবাজার-টেকনাফ অঞ্চলের ইয়াবা–অস্ত্র চক্র এবং উত্তরের সীমান্তে ‘ছোট অস্ত্র পাচার চেইন’ ভাঙতে বিশেষ অপারেশন চলমান।
গোয়েন্দা সংস্থাগুলো জানায়, নির্বাচনের আগমুহূর্তে আন্তর্জাতিক চক্রের সহায়তায় দেশে অস্ত্র ঢোকার চেষ্টা বৃদ্ধি পেয়েছিল। কঠোর নজরদারির কারণে এসব প্রবাহ অনেকটাই বন্ধ করা গেছে।
৫. সাইবার ও ডিজিটাল মনিটরিং বৃদ্ধি :
এবার সাইবার অপরাধকেও নির্বাচন–পূর্ব নিরাপত্তার বড় হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ফেসবুক পেইজ, এনোনিমাস গ্রুপ, টেলিগ্রাম–ভিত্তিক নাশকতা পরিকল্পনাগুলো নজরদারিতে।
গুজব ছড়ানো বা উসকানিমূলক লাইভ ভিডিওর বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক অ্যাকশন টিম কাজ করছে।
ইতোমধ্যে নাশকতার পরিকল্পনায় যুক্ত থাকার অভিযোগে কয়েকটি নেটওয়ার্ক নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে।
৬. ভোটার–নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশের ‘এলাকা ক্লিনিং অপারেশন’:
নির্বাচনি তফসিল ঘোষণার আগে প্রতিটি থানা দায়িত্ব পেয়েছে—
নিজ এলাকায় সন্ত্রাসী–চাঁদাবাজ দমন,
ভাড়াটে মাস্তানদের অপসারণ,
ভোটের সময় প্রভাব বিস্তারের জন্য টেন্ডারবাজ ও বাহিনী গঠনের প্রচেষ্টা বন্ধ করা,
স্থানীয় অস্ত্র নির্মাণকারখানা ধ্বংস করা।
একে বলা হচ্ছে “এলাকা ক্লিনিং অপারেশন”।
নির্বাচনের নিরপেক্ষতা রক্ষায় এসব এলাকায় পুলিশ–র্যাব–বিজিবির যৌথ কন্ট্রোল রুম খোলা হচ্ছে।
৭. নির্বাচনকে শান্তিপূর্ণ রাখার জন্য কঠোর বার্তা:
সরকারি উচ্চপর্যায়ে স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে—
“কোনো অবস্থাতেই অবৈধ অস্ত্রধারী মুক্ত থাকতে পারবে না।”
“ভোটকেন্দ্রের ৫০০ মিটারের মধ্যে অস্ত্রধারী দেখলে তাৎক্ষণিক গ্রেফতার।”
“বাহিনী–সমর্থিত এলাকার আধিপত্যের রাজনীতি বন্ধ করতে হবে।”
“নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ব্যক্তিগত শত্রুতা থেকে কেউ যেন সহিংসতায় না জড়ায়।”
গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, আগাম এসব পদক্ষেপ নেওয়ায় নির্বাচনের আগে সম্ভাব্য নাশকতা বা সহিংসতার ঝুঁকি বড় অংশে কমে এসেছে।
৮. উপসংহার :
নির্বাচন একটি জাতীয় নিরাপত্তা–সংবেদনশীল বিষয়। নির্বাচন কমিশন, আইন–শৃঙ্খলা বাহিনী, সশস্ত্র বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সমন্বিত পদক্ষেপের কারণে নির্বাচনের আগাম নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার এবং সীমান্ত নজরদারি—এই তিনটি পদক্ষেপ সফলভাবে বাস্তবায়ন করতে পারলে নির্বাচন অবাধ, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বাড়বে।