শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৩০ অপরাহ্ন
নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) অডিট বিভাগের যুগ্মনিয়ন্ত্রক (অডিট) পদে চলতি দায়িত্বে থাকা মো. আল-আমিনের বিরুদ্ধে অসদাচরণ, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে অশোভন আচরণ ও দাপ্তরিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তাঁকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে বিএডিসি কর্তৃপক্ষ। নোটিশে সাত দিনের মধ্যে লিখিত জবাব দিতে বলা হয়েছে।
৫ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে জারি করা ওই নোটিশে বিএডিসির সচিব আবু জাফর রাশেদ স্বাক্ষর করেছেন। এতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন দাপ্তরিক ঘটনা উল্লেখ করে তাঁর ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে।
নোটিশের তথ্য অনুযায়ী, ২১ সেপ্টেম্বর একটি প্রকল্পের অফিসকক্ষে মূল্যায়ন কমিটির সভাকে কেন্দ্র করে বিরোধের সৃষ্টি হয়। ওই সভায় তাঁকে সভাপতি না করাকে কেন্দ্র করে প্রকল্প পরিচালককে উদ্দেশ করে অশোভন ভাষা ব্যবহারের অভিযোগ তোলা হয়েছে।
এ ছাড়া ৪ অক্টোবর প্রকল্পের অডিট-সংক্রান্ত কার্যক্রম ও সভাকে কেন্দ্র করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার আচরণ নিয়ে অভিযোগ ওঠে। নোটিশে দাপ্তরিক আলোচনার সময় অসৌজন্যমূলক আচরণ, শৃঙ্খলা পরিপন্থী কর্মকাণ্ড এবং অফিসের স্বাভাবিক কর্মপরিবেশ ব্যাহত করার বিষয়গুলোও উল্লেখ করা হয়েছে।
নোটিশে এসব অভিযোগকে সরকারি চাকরির আচরণ ও শৃঙ্খলার সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের কর্মচারী চাকরি প্রবিধানমালা, ১৯৯০-এর সংশ্লিষ্ট বিধির আলোকে বিষয়টি বিবেচনার কথা বলা হয়েছে।
বিএডিসির ‘জিয়া পরিষদ’ সভাপতি আল-আমিনের বিরুদ্ধে টেন্ডার বাণিজ্যসহ নানা অভিযোগ রয়েছে।
বদলি-পদায়নে প্রভাব বিস্তার, টেন্ডার মূল্যায়ন কমিটির কাজে হস্তক্ষেপ, ল্যাপটপ নিয়ে যাওয়া ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে খারাপ আচরণ কথা উল্লেখ রয়েছে।
বিএডিসির কারণ দর্শানোর নোটিশে উল্লেখ করা অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে টেন্ডার মূল্যায়ন কমিটির (টিইসি) কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ, মূল্যায়নে ব্যবহৃত ল্যাপটপ নিয়ে যাওয়া, বহিরাগত ব্যক্তিদের দাপ্তরিক এলাকায় ডেকে আনা, কর্মকর্তাদের হুমকি দেওয়া, নথি ছুড়ে মারা এবং অনুমতি ছাড়া কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকা।
তবে কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি হওয়া শাস্তির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অভিযুক্তের ব্যাখ্যা, তদন্তের ফলাফল এবং বিভাগীয় কার্যক্রমের ভিত্তিতেই অভিযোগগুলোর বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
আল-আমিনকে ঘিরে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি উঠেছে MIEFP প্রকল্পের টেন্ডার মূল্যায়ন কমিটির কার্যক্রম নিয়ে।
বিএডিসির কারণ দর্শানোর নোটিশে ৪ অক্টোবরের ঘটনার বিবরণে বলা হয়েছে, দরপত্র মূল্যায়নের সময় আল-আমিন সংশ্লিষ্ট কক্ষে গিয়ে তাঁকে টিইসির সভাপতি করা হয়নি কেন, তা নিয়ে আপত্তি জানান। ড. মো. শাফায়েত হোসেনকে কমিটির সভাপতি করায় তিনি ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখান এবং তাঁকে সভাপতির পদ থেকে পদত্যাগ করানোর হুমকি দেন বলে নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে।
একজন অডিট কর্মকর্তার টেন্ডার মূল্যায়ন কমিটির সভাপতি পদ নিয়ে আপত্তির বিষয়টি প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় তাঁর ভূমিকা ও এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। তবে এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য পাওয়া গেলে অভিযোগের প্রেক্ষাপট আরও স্পষ্ট হবে।
মূল্যায়নের ল্যাপটপ নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ
নোটিশে বলা হয়েছে, টেন্ডার মূল্যায়ন কমিটির সদস্যদের সঙ্গে উত্তপ্ত পরিস্থিতির একপর্যায়ে আল-আমিন মোবাইল ফোনে কয়েকজন বহিরাগত ব্যক্তিকে সেখানে আসতে বলেন। পরে তিনি দরপত্র মূল্যায়নে ব্যবহৃত একটি ল্যাপটপ নিয়ে চলে যান বলে অভিযোগ করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া ল্যাপটপটি নিয়ে যাওয়ার বিষয়টিকে এখতিয়ারবহির্ভূত আচরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সরকারি দরপত্র মূল্যায়নের মতো সংবেদনশীল কার্যক্রমে ব্যবহৃত ডিভাইস নিয়ে যাওয়ার অভিযোগের কারণে তথ্যের নিরাপত্তা এবং মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এ ঘটনায় ল্যাপটপে থাকা তথ্যের নিরাপত্তা বা দরপত্র মূল্যায়নে কোনো প্রভাব পড়েছিল কি না, তা নিশ্চিত হতে সংশ্লিষ্ট নথি ও কর্তৃপক্ষের বক্তব্য প্রয়োজন।
টেন্ডার মূল্যায়ন কমিটির সদস্যসচিবের কক্ষে কর্মকর্তারা অবস্থানকালে একজন অপরিচিত ব্যক্তি দরজা ঠেলে ‘শাফায়েত কে?’ জানতে চান বলেও নোটিশে উল্লেখ রয়েছে। পরে অন্য কর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপে ওই ব্যক্তি সেখান থেকে চলে যান।
অফিসের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কার্যক্রম চলাকালে বহিরাগত ব্যক্তির উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ওই ব্যক্তি কে ছিলেন, কী উদ্দেশ্যে সেখানে গিয়েছিলেন এবং কার নির্দেশে দাপ্তরিক এলাকায় প্রবেশ করেছিলেন—এসব বিষয় তদন্তাধীন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
বিএডিসির নোটিশে ৩০ জুনের একটি ঘটনাও তুলে ধরা হয়েছে। অডিট-সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে আলোচনার সময় আল-আমিন নিয়ন্ত্রক (অডিট)-এর কক্ষে গিয়ে কর্মশালা ও ত্রিপক্ষীয় সভা সম্পর্কে তাঁকে কেন অবহিত করা হয়নি, তা জানতে চান বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এ সময় উচ্চস্বরে কথা বলা, দোষারোপ এবং সভা করতে না দেওয়ার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। একই ঘটনায় সদস্য পরিচালক (অর্থ) ও চেয়ারম্যান সম্পর্কে অশালীন মন্তব্য করার অভিযোগও নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া সদস্য পরিচালক (অর্থ)-এর দপ্তরে অডিট-সংক্রান্ত একটি নথি ছুড়ে মারার অভিযোগ আনা হয়েছে।
অনুমতি ছাড়া অনুপস্থিতি ও কৈফিয়তপত্র ছেঁড়ার অভিযোগ
আল-আমিনের বিরুদ্ধে কর্মস্থলে অননুমোদিত অনুপস্থিতির অভিযোগও রয়েছে।
নোটিশে ৬ আগস্টের একটি স্মারকের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, তিনি ৩০ জুলাই থেকে ৪ আগস্ট পর্যন্ত কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া অফিসে অনুপস্থিত ছিলেন। এর আগেও তাঁর বিরুদ্ধে অননুমোদিত অনুপস্থিতির অভিযোগ করা হয়েছিল বলে নোটিশে উল্লেখ রয়েছে।
এ বিষয়ে কৈফিয়ত তলবের চিঠি পাওয়ার পর সেটি ছিঁড়ে ফেলার অভিযোগও আনা হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের নেতাদের ডেকে এনে নিয়ন্ত্রক (অডিট)-এর সঙ্গে উত্তপ্ত পরিস্থিতি তৈরির অভিযোগ রয়েছে।
৪ অক্টোবরের আরেক ঘটনায় প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তাকে চেয়ারম্যানের দপ্তরে ডেকে তথ্য নেওয়া হচ্ছিল। নোটিশ অনুযায়ী, এ সময় আল-আমিন চেয়ারম্যানের কক্ষে গিয়ে তাঁকে না জানিয়ে কেন ওই কর্মকর্তাদের ডাকা হয়েছে এবং তাঁদের কাছে কেন তথ্য চাওয়া হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
কর্তৃপক্ষ তাঁর এ আচরণকে গুরুতর অসদাচরণ ও অপেশাদার আচরণ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
টেন্ডারসংক্রান্ত অভিযোগের পাশাপাশি বিএডিসির বিভিন্ন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বদলি ও পদায়নে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও রয়েছে আল-আমিনের বিরুদ্ধে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, কোন কর্মকর্তা কোথায় বদলি বা পদায়িত হবেন, সে বিষয়ে তিনি প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করেন।
বিভিন্ন প্রকল্পের টেন্ডারসংক্রান্ত বিষয়েও তাঁর সক্রিয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন প্রতিষ্ঠানের কিছু কর্মকর্তা। তবে এসব অভিযোগের স্বতন্ত্র প্রমাণ, সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তের নথি এবং কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য ছাড়া অভিযোগগুলোর সত্যতা চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
আল-আমিন বর্তমানে উপনিয়ন্ত্রক (অডিট) থেকে যুগ্মনিয়ন্ত্রক (অডিট) পদে চলতি দায়িত্বে রয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তিনি বিএডিসির ‘জিয়া পরিষদ’-এর সভাপতি হিসেবেও পরিচিত।
প্রতিষ্ঠানটির কারণ দর্শানোর নোটিশে ১৯৯০ সালের বিএডিসি কর্মচারী চাকরি প্রবিধানমালার সংশ্লিষ্ট বিধির উল্লেখ করে দায়িত্ব পালনে অবহেলা ও অসদাচরণের অভিযোগ আনা হয়েছে। একই সঙ্গে সাময়িক বরখাস্তসহ বিভাগীয় ব্যবস্থা কেন নেওয়া হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়েছে।
এখন আল-আমিনের জবাব, অভিযোগগুলোর পক্ষে-বিপক্ষে উপস্থাপিত তথ্যপ্রমাণ এবং পরবর্তী বিভাগীয় কার্যক্রমের ওপর বিষয়টির পরিণতি নির্ভর করছে। অভিযোগগুলোর বিষয়ে তাঁর বক্তব্য এবং বিএডিসি কর্তৃপক্ষের বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাওয়া গেলে এ বিষয়ে আরও পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যাবে।
কর্তৃপক্ষের নির্দেশ অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে নোটিশ পাওয়ার পর নির্ধারিত সাত দিনের মধ্যে লিখিত ব্যাখ্যা দাখিল করতে হবে। নির্ধারিত সময়ে জবাব না দিলে বিধি অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলেও নোটিশে উল্লেখ রয়েছে।