বুধবার, ২২ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:৪৩ অপরাহ্ন
১. পচন ধরলো না ধরানো হলো*:
পরীক্ষার হলটি যেন আর পাঁচটা দিনের মতোই ছিল—শান্ত, স্থির, নিয়মের বাঁধনে আবদ্ধ। অথচ সেই নীরবতার ভেতরেই লুকিয়ে ছিল এক অদৃশ্য অস্থিরতা; যেন দেয়ালের ভেতর ফাটল ধরেছে, কিন্তু চোখে দেখা যাচ্ছে না। শিক্ষার্থীরা কলম হাতে বসে আছে, কিন্তু তাদের সামনে যে প্রশ্নপত্র, তা যেন সময়ের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে বসেছে।
দৈনিক যুগান্তরে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উঠে আসে—২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় ২০২৫ সালের প্রশ্নপত্র দিয়ে পরীক্ষা নেওয়ার এক বিস্ময়কর ঘটনা। নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের সেই পরীক্ষাকেন্দ্র যেন হঠাৎ করে এক প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়—শুধু একটি ভুল নয়, বরং এটি শিক্ষাক্ষেত্রে মহা-অধপতনে একটি প্রতিচ্ছবি। এটা কী শিক্ষায় পচন, নাকি পচন ধরানো, সেই প্রশ্ন এখন মুখে মুখে।
*২. সময়ের সাথে প্রতারণা*:
এক ঘণ্টা পঁচিশ মিনিট—সময়টা হয়তো খুব বড় নয়, কিন্তু এই সামান্য সময়েই ১৭৭টি তরুণ মস্তিষ্ক একটি মিথ্যার ভেতর বন্দী ছিল। তারা লিখছিল, কিন্তু যা লিখছিল, তা যেন ভবিষ্যতের জন্য নয়; বরং অতীতের এক ভুলে যাওয়া অধ্যায়ের পুনরাবৃত্তি।
এই দৃশ্যটি যেন এক উপন্যাসের করুণ অধ্যায়—যেখানে নায়ক জানেই না, সে ভুল মঞ্চে দাঁড়িয়ে অভিনয় করছে।
*৩. নীতি বনাম অব্যবস্থাপনা*:
শিক্ষা—যে শব্দটি নীতি, আদর্শ, এবং জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রতীক—সেই শিক্ষাই আজ যেন প্রশাসনিক অবহেলার ভারে নুয়ে পড়েছে। প্রশ্নপত্রের এই ভুল কেবল একটি কারিগরি ত্রুটি নয়; এটি একটি নৈতিক বিচ্যুতি।
নীতির জায়গায় যদি গাফিলতি বসে, আদর্শের জায়গায় যদি দায়সারা মনোভাব স্থান নেয়—তবে প্রশ্নপত্রের ভুল তো হবেই, বরং তা হয়ে উঠবে অবধারিত।
*৪. লুকোচুরি খেলা*:
কোথায় ছিল সেই বহুস্তর যাচাই ব্যবস্থা? কোথায় ছিল দায়িত্ববোধ?
প্রশ্নগুলো যেন বাতাসে ভাসে, উত্তর খুঁজে পায় না।
এই ঘটনাটি যেন একটি আয়না—যেখানে শিক্ষাব্যবস্থার মুখ দেখা যায়, কিন্তু সেই মুখে স্পষ্ট ভাঙনের রেখা। ডিজিটাল যুগে দাঁড়িয়ে এমন একটি প্রাথমিক ভুল প্রমাণ করে—আমরা প্রযুক্তিতে এগোলেও, মানসিকতায় এখনও পিছিয়ে আছি। শিক্ষামন্ত্রী শিক্ষার্থীদের সাথে যখন অবান্তর রাজনীতির লুকোচুরি খেলছেন, তখনই যেন ফাঁক দিয়ে প্রশ্নপত্রের লুকোচুরি খেলা শুরু হয়।
*৫. শিক্ষার্থীদের নীরব আর্তনাদ*:
হঠাৎ প্রশ্ন পরিবর্তন—একজন পরীক্ষার্থীর জন্য এটি শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি তার আত্মবিশ্বাসের ওপর আঘাত।
যে উত্তর সে লিখেছে, তা কি মূল্যায়িত হবে?
যে সময় সে ব্যয় করেছে, তা কি ফেরত পাওয়া যাবে?
এই প্রশ্নগুলো কোনো প্রশ্নপত্রে লেখা থাকে না, কিন্তু প্রতিটি শিক্ষার্থীর মনে গেঁথে যায়।
*৬. রাজনৈতিক পাঠ: দায় কার*:
এই ঘটনার ভেতরে একটি গভীর রাজনৈতিক বার্তা লুকিয়ে আছে।
যেখানে জবাবদিহিতা দুর্বল, সেখানে ভুলই নিয়ম হয়ে দাঁড়ায়।
যেখানে দায়িত্ব নির্ধারণ অস্পষ্ট, সেখানে দায় এড়ানোই সংস্কৃতি হয়ে যায়।
শিক্ষাব্যবস্থা যদি নীতি ও আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়, তবে তা আর কেবল শিক্ষা থাকে না—তা হয়ে ওঠে একটি প্রহসন। দায় কেবল সরকারেরই নয়, পুরো জাতির অধপতনের বাস্তব উদাহরণ!
*৭. অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ*:
এই গল্পটি কোনো কল্পকাহিনি নয়; এটি বাস্তবতার নির্মম প্রতিচ্ছবি।
একটি প্রশ্নপত্রের ভুল আমাদের মনে করিয়ে দেয়—শিক্ষার অবক্ষয় শুরু হয় ছোট ছোট গাফিলতি থেকে, আর তা ধীরে ধীরে গ্রাস করে পুরো ব্যবস্থাকে।
যদি আমরা এখনই নীতি, আদর্শ এবং জবাবদিহিতার পথে ফিরে না আসি—তবে ভবিষ্যতের প্রজন্ম শুধু ভুল প্রশ্নের উত্তরই দেবে না, বরং ভুল বাস্তবতার মধ্যেই বড় হবে।