শনিবার, ২৩ মে ২০২৬, ০১:২১ পূর্বাহ্ন
*ডাকসুর দূরদর্শী পদক্ষেপ: শিক্ষা সম্পর্কের নতুন মানচিত্রে বাংলাদেশ ও চীন*
—-অধ্যাপক এমএ বার্ণিক
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচীন বটগাছগুলো যেন যুগ যুনগ ধরে তরুণদের স্বপ্ন পাহারা দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এই ক্যাম্পাস কখনো ভাষার অধিকারের জন্য রক্তাক্ত হয়েছে, কখনো স্বাধীনতার মশাল জ্বালিয়েছে, আবার কখনো নতুন সমাজ বিনির্মাণের স্বপ্ন দেখিয়েছে। সেই ঐতিহাসিক প্রাঙ্গণ থেকেই এবার জন্ম নিচ্ছে আরেকটি নতুন অধ্যায়— শিক্ষা, জ্ঞান ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার এক অনন্য অভিযাত্রা।
চীন সরকারের আমন্ত্রণে ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম-এর নেতৃত্বে ১৫ সদস্যের একটি শিক্ষার্থী প্রতিনিধি দল বর্তমানে চীন সফর করছে। এই সফর যেন কেবল একটি আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় আমন্ত্রণ নয়; বরং এটি ছিল দুই দেশের তরুণ প্রজন্মের হৃদয়ের দরজা খুলে দেওয়ার এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত।
বেইজিংয়ের প্রশস্ত সড়ক, প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্ববিদ্যালয়, আলোকিত গবেষণাগার আর শৃঙ্খলাবদ্ধ শিক্ষা পরিবেশ দেখে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা যেন ভবিষ্যতের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি প্রত্যক্ষ করেন। সেই সফরের আলোচনায় ডাকসুর পক্ষ থেকে উঠে আসে “ঢাকা-বেইজিং ইয়ুথ ফেলোশিপ”-এর যুগান্তকারী প্রস্তাব।
ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম যখন এই ফেলোশিপের ধারণা তুলে ধরেন, তখন তা ছিল না শুধুই একটি কাগুজে পরিকল্পনা; বরং তা ছিল এক নতুন প্রজন্মের স্বপ্ন, জ্ঞানভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার এক উজ্জ্বল রূপরেখা। জানা গেছে, চীন সরকার বিষয়টি আন্তরিকভাবে বিবেচনা করছে।
তবে এই সফরের সবচেয়ে আলোচিত দিক হয়ে উঠেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক সংকট নিরসনে চীনের সহযোগিতার ঘোষণা।
দীর্ঘদিন ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আবাসন সংকটে ভুগছে। অসংখ্য শিক্ষার্থী মেসের সংকীর্ণ কক্ষে, ভাড়া বাসার অস্বস্তিকর পরিবেশে কিংবা দীর্ঘ যাতায়াতের ক্লান্তি নিয়েই স্বপ্ন বাঁচিয়ে রেখেছে। কেউ লাইব্রেরির টেবিলে মাথা রেখে ভবিষ্যতের হিসাব কষেছে, কেউবা রাতভর রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক চর্চার পর ঘুমানোর জায়গা খুঁজেছে। সেই বাস্তবতায় চীনের এই উদ্যোগ যেন বহুদিনের তৃষ্ণার্ত ক্যাম্পাসে হঠাৎ নেমে আসা শান্তির বৃষ্টি।
ডাকসুর উদ্যোগকে সম্মান জানিয়ে চীন সরকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আবাসিক সংকট সমাধানের লক্ষ্য ৫টি মেয়েদের হল ও ৫টি ছেলেদের হল নির্মাণকাজ হাতে নিয়েছে বলে জানা গেছে। শুধু তাই নয়, বর্তমান ডাকসু নেতাদের এই সফর উপলক্ষে আরও একটি নতুন ছাত্রী হল নির্মাণে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ঘোষণাও দিয়েছে চীন।
এই সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার পর ক্যাম্পাসজুড়ে যেন নতুন আশার আলো জ্বলে উঠেছে। শিক্ষার্থীদের অনেকেই বলছেন, এটি শুধু ভবন নির্মাণের ঘোষণা নয়; বরং এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য জ্ঞানচর্চার নিরাপদ আশ্রয় নির্মাণের প্রতিশ্রুতি।
বিশ্লেষকদের মতে, ডাকসু চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের শিক্ষা সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এক অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। কারণ রাষ্ট্রীয় সম্পর্কের বাইরে শিক্ষার্থী পর্যায়ে এমন সহযোগিতা ভবিষ্যতের কূটনীতিকে আরও শক্তিশালী করে। আজকের এই শিক্ষার্থী প্রতিনিধিরাই আগামী দিনের গবেষক, নীতিনির্ধারক, বিজ্ঞানী ও রাষ্ট্রনায়ক।
“ঢাকা-বেইজিং ইয়ুথ ফেলোশিপ” বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের তরুণরা চীনের প্রযুক্তি, গবেষণা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, চিকিৎসা বিজ্ঞান ও উদ্ভাবনী শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাবে। একইসঙ্গে চীনা শিক্ষার্থীরাও বাংলাদেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সম্ভাবনাকে কাছ থেকে জানার সুযোগ পাবে।
সম্ভাব্য এই ফেলোশিপের আওতায় থাকতে পারে—
(১) শিক্ষা ও গবেষণা বিনিময় কর্মসূচি,
(২) প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়ক প্রশিক্ষণ,
(৩) যৌথ যুব সম্মেলন ও নেতৃত্ব উন্নয়ন কর্মশালা,
(৪) উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও স্টার্টআপ সহযোগিতা,
(৫) জলবায়ু পরিবর্তন ও টেকসই উন্নয়ন বিষয়ক গবেষণা,
(৬) সাংস্কৃতিক বিনিময় ও ভাষা শিক্ষা কার্যক্রম।
বিশ্ববিদ্যালয় কেবল পাঠদানের স্থান নয়; এটি একটি জাতির চিন্তা, সংস্কৃতি ও নেতৃত্ব তৈরির কারখানা। আর সেই কারখানার তরুণদের জন্য নিরাপদ আবাসন, আন্তর্জাতিক শিক্ষা সহযোগিতা ও গবেষণার সুযোগ নিশ্চিত করা মানেই একটি জাতির ভবিষ্যৎকে শক্তিশালী করা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির চায়ের আড্ডা থেকে শুরু করে বেইজিংয়ের আধুনিক গবেষণাগার— এই যাত্রাপথ যেন নতুন সময়ের এক সেতুবন্ধন। এমন এক সেতু, যেখানে রাজনীতির ভাষার চেয়ে বড় হয়ে উঠছে জ্ঞান, সহযোগিতা ও তরুণদের স্বপ্ন।
হয়তো একদিন ইতিহাসের পাতায় লেখা থাকবে—
একদল তরুণ বেইজিং সফরে গিয়েছিল; তারা ফিরে এসেছিল শুধু সফরের অভিজ্ঞতা নিয়ে নয়, বরং হাজারো শিক্ষার্থীর মাথা গোঁজার আশ্রয়, আন্তর্জাতিক শিক্ষার নতুন দুয়ার এবং বাংলাদেশ-চীন বন্ধুত্বের এক দীপ্তিমান ভবিষ্যতের নকশা নিয়ে।