মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬, ০৫:৪২ অপরাহ্ন

শিরোনাম
ডা. মো. আজিজুল হোসেন নবীনগরের উজ্জ্বল নক্ষত্র, বাংলাদেশের গর্ব মাগুরায় জুলাই শহীদ দিবস ও জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে প্রস্তুতি সভা অনুষ্ঠিত 35 Thermonuclear Bombs in Iran’s Possession: Russia’s Claim Sends Shockwaves Through Global Politics— Professor M. A. Barnik ব্যাংক ম্যানেজারের উপর হামলা ও হত্যার প্রতিবাদে নবীনগরে মানববন্ধন  মাগুরার শ্রীপুরে রাস্তার বেহাল দশা, জনদুর্ভোগ চরমে! ইরানের হাতে ৩৫টি থার্মোনিউক্লিয়ার বোমা: রাশিয়ার দাবিতে বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন ভূমিকম্প—অধ্যাপক এম এ বার্ণিক মাগুরায় অনলাইন জুয়া চক্রের মাস্টার মাইন্ড আমিনুল গ্রেফতার! মাগুরায় কৃষি কর্মকর্তাকে ঝুলিয়ে পেটানোর হুমকি! যুবদল নেতা বহিস্কার! বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক স্পিকার ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের মৃত্যুতে বাংলাদেশ সুশীল ফোরামের শোক বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক স্পিকার ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার আর নেই-(ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।)

সংবাদদাতা / ১৭০ বার ভিউ
সময়ঃ মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬, ০৫:৪২ অপরাহ্ন

জুবায়ের রহমান চৌধুরী প্রধানবিচারপতি হয়ে ওঠার স্মৃতি
—-অধ্যাপক এম এ বার্ণিক
১. স্মৃতির এক সহযাত্রী:
কিছু মানুষ জীবনে আসে ইতিহাস হয়ে নয়, স্মৃতি হয়ে। বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী আমার জীবনে ঠিক তেমনই একজন—যাঁকে আমি কোনো এক দিনে বিচারপতি হতে দেখিনি, বরং মানুষ হয়ে উঠতে দেখেছি, ধীরে ধীরে, নীরবে, মূল্যবোধের আলোয়।
আজ তিনি যখন দেশের প্রধানবিচারপতির আসনে অধিষ্ঠিত হতে যাচ্ছেন, তখন আমার চোখ ভিজে ওঠে। এই অশ্রু গর্বের, কৃতজ্ঞতার, আর অতীতের—যেখানে ধানমন্ডির দুইটি বাড়ি আজও আমার স্মৃতিতে দাঁড়িয়ে আছে জীবন্ত ইতিহাস হয়ে।
আমি ভাষা-আন্দোলনের গবেষক বাঙ্গালি এম এ বার্ণিক। বয়সে তাঁর চেয়ে আমি মাত্র পাঁচ মাসের বড়। কিন্তু স্মৃতিতে আমি যেন তাঁর অনেক আগের সহযাত্রী।
প্রধানবিচারপতি
জুবায়ের রহমান চৌধুরী
২. ধানমন্ডি ৬ নম্বর রোড : ভাড়াবাসা, অথচ মূল্যবোধের প্রাসাদ:
তাঁদের প্রথম বাসস্থান ছিল ধানমন্ডি ৬ নম্বর রোডের একটি ভাড়াবাসা। ডুপ্লেক্স সাধারণ মানেরবাড়ি—কিন্তু ভেতরে ছিল এক অসাধারণ আলো।
আমি সে বাসায় অসংখ্যবার গেছি। সেই ঘরে ঢুকলেই মনে হতো—এটি ইট–সিমেন্টের ভবন নয়, এটি নীতি ও নৈতিকতার আশ্রয়কেন্দ্র।
জুবায়ের রহমান চৌধুরীর পিতা খ্যাতিমান বিচারপতি আবদুর রহমান চৌধুরী—একজন ভাষাসৈনিক, একজন ন্যায়ব্রতী মানুষ। তাকে সমকালীন জাতির বিবেক বলা হতো। ভাষা আন্দোলনের একজন গবেষক হিসেবে তাঁর সঙ্গেই আমার প্রথম পরিচয়। সেই পরিচয় খুব দ্রুত বন্ধুত্ব ছাড়িয়ে আত্মিক সান্নিধ্যে রূপ নেয়।
তিনি যখন ভাষা আন্দোলনের কথা বলতেন, তাঁর চোখে আমি আগুন দেখেছি, কিন্তু সে আগুন ছিল শুদ্ধতার।
একদিন তিনি বলেছিলেন—
“ভাষা রক্ষার লড়াই আসলে বিবেক রক্ষার লড়াই।”
এই একটি বাক্য আজও আমার কানে বাজে।
৩. জুবায়ের –পিতার পায়ের কাছে বসে থাকা এক নীরব ভবিষ্যৎ:
বিচারপতি আবদুর রহমান চৌধুরীর বাড়িতে প্রায় প্রতিদিন জ্ঞানীগুণী মানুষের আসর বসতো। আলোচনায় মনে হতো জ্ঞানের আসর। সেই আলোচনাগুলোতে যুবায়ের রহমান চৌধুরী নীরবে বসে থাকতেন। তখনো তিনি বিচারপতি নন, আইনজীবী নন—তিনি একজন ছাত্র, একজন সন্তান।
আমি দেখেছি—তিনি কথা বলার চেয়ে শুনতে ভালোবাসতেন।
শুনতেন পিতার কণ্ঠে ন্যায়বোধ, শুনতেন রাষ্ট্রের দায়, শুনতেন মানুষের প্রতি দায়িত্ব।
নীতিকথা আছে—
“যে সন্তান পিতার কথা মন দিয়ে শোনে, সে একদিন মানুষের কথা শোনার যোগ্য হয়।”
আমি নিশ্চিতভাবে বলি—সেই শোনার অভ্যাসই তাঁকে আজকের এই আসনে পৌঁছে দিয়েছে।
৪. ধানমন্ডি ৩২ নম্বর– মানবিকতার মিলনস্থল* :
পরবর্তীতে তাঁরা ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে নিজস্ব বাড়িতে চলে আসেন। এই বাড়িটিও আমার স্মৃতিতে গভীরভাবে গাঁথা।
এই বাড়ির সামনেই ছিল কবি বেগম সুফিয়া কামালের বাসভবন।
এই ভৌগোলিক নৈকট্য আমাদের সম্পর্ককে এক নতুন মাত্রা দেয়।
আমি ও জুবায়ের রহমান চৌধুরী—আমরা দুজনেই ধীরে ধীরে কবি সুফিয়া কামালের স্নেহভাজন হয়ে উঠি। তিনি আমাদের শুধু কবিতা শেখাননি, শেখান মানুষ হয়ে থাকা।একদিন তিনি যুবায়েরকে দেখে বলেছিলেন—
“বড় হয়ে যদি বিচারক হও, মনে রেখো—মানুষের চোখে তাকাতে যেন ভয় না লাগে।”
আজ সেই কথার ওজন আমি গভীরভাবে অনুভব করি।
কবির স্নেহে গড়ে ওঠা বিচারকের সংযম
বেগম সুফিয়া কামালের সান্নিধ্যে আমি ও যুবায়ের রহমান চৌধুরী শিখেছিলাম আচরণে নরম হতে, কিন্তু কখনো নতজানু হতে নয়।
নীতিকথা বলে—
“যে মানুষ কবির কাছে নম্র হতে শেখে, সে ক্ষমতার কাছে মাথা নত করে না।”
আমি তাঁর চোখে দেখেছি সেই সংযম, সেই নীরব দৃঢ়তা—যা পরে লন্ডনের ব্যারিস্টারি শিক্ষা, হাইকোর্টের প্র্যাকটিস কিংবা বিচারকের আসনেও অটুট থেকেছে।
৫. আরবিট্রেশনের ঘর — ন্যায়বোধের পরীক্ষাগার* :
বিচারপতি আবদুর রহমান চৌধুরীর বাসায় বহু আরবিট্রেশন বসত। আমি নিজে বহুবার সেখানে উপস্থিত ছিলাম।
সেই ঘরে যুবায়ের রহমান চৌধুরী শুধু পিতার পাশে বসে থাকতেন না—তিনি বিচার কীভাবে জন্ম নেয়, তা দেখতেন।
আমি দেখেছি—রায়ের আগে মানুষের কথা শোনা, যুক্তির ভারসাম্য, এবং শেষে বিবেকের কাছে মাথা নত করা।
এই দৃশ্যগুলোই তাঁকে বিচারপতি বানিয়েছে—শপথ নয়, পদোন্নতি নয়।
৬. প্রধানবিচারপতির আসনে– কালের সেই নীরব ছেলেটি* :
জুবায়ের রহমান চৌধুরী আমাদের কালের নীরব ছেলেটি আজ বাংলাদেশের প্রধানবিচারপতি। কিন্তু আমার চোখে তিনি এখনো সেই নীরব ছেলে—যিনি ধানমন্ডির এক ঘরে বসে শিখছিলেন কীভাবে মানুষ হতে হয়।
নীতিকথা বলে—
“যে মানুষ শুদ্ধ স্মৃতি নিয়ে বড় হয়, সে শুদ্ধ সিদ্ধান্ত নিতে পারে।”
আমি বিশ্বাস করি, বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী সেই শুদ্ধতার উত্তরাধিকার বহন করছেন।
শেষ কথা,
ইতিহাস তাঁর রায় লিখবে।
সংবাদপত্র তাঁর শপথের ছবি ছাপবে।
কিন্তু আমি লিখে রাখলাম—
একজন মানুষ কীভাবে মানুষ হয়ে উঠেছিলেন।
এই লেখা আমার চোখের জল দিয়ে লেখা।
এটি কোনো আনুষ্ঠানিক প্রবন্ধ নয়—এটি আমার জীবনের একটি অধ্যায়। আমি ও জুবায়ের রহমান চৌধুরীর যে যার বৃত্তে কালের সাক্ষী হয়ে বেঁচে আছি।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


[prayer_time pt="on" sc="on"]