সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬, ০২:৩৯ পূর্বাহ্ন
১. বিবেকের দরজায় টোকা দেয় যে-সংবাদ*
সকালের সংবাদপত্রগুলো কখনো কখনো আদালতের নথির চেয়েও ভারী হয়ে ওঠে। কাগজের পাতায় ছাপা কয়েকটি শব্দ তখন শুধু সংবাদ থাকে না; তারা হয়ে ওঠে অস্বস্তির আয়না, বিবেকের দরজায় টোকা দেওয়া অদৃশ্য আঙুল।
বগুড়ার আকাশে সেদিনও সূর্য উঠেছিল যথারীতি। মাঠে কৃষক গিয়েছিল, দোকান খুলেছিল ব্যবসায়ী, স্কুলের ঘণ্টা বেজেছিল। কিন্তু মানুষের মুখে মুখে ভেসে বেড়াচ্ছিল দুটি নাম—দুটি ইউনিয়নের নাম, দুটি প্রশ্নের নাম, দুটি বিতর্কের নাম।
কেউ বলছিল, নামের ভেতরে ক্ষমতার ছায়া আছে। কেউ বলছিল, এটি নিছক কাকতাল। আবার কেউ বলছিল, রাষ্ট্রের মানচিত্রে ব্যক্তিগত ছায়া পড়া উচিত নয়।
সাংবাদিকরা প্রশ্ন করেছিলেন।
আর প্রশ্ন কখনো কখনো ক্ষমতার কাছে বারুদের মতো ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে।
—
*২. নামের ভেতরে কার ছায়া?*
একটি ইউনিয়নের নাম কখনো কেবল একটি নাম নয়। একটি নামের মধ্যে থাকে ইতিহাস, ভৌগোলিক স্মৃতি, মানুষের আবেগ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পরিচয়।
বগুড়ার দুটি ইউনিয়নের নামকরণ নিয়ে যখন আলোচনা শুরু হলো, তখন সংবাদমাধ্যম বিষয়টিকে জনস্বার্থের আলোয় নিয়ে আসে। সংবাদের ভাষা ছিল প্রশ্নের ভাষা; অভিযোগের ভাষা নয়।
কিন্তু প্রশ্ন অনেক সময় তলোয়ারের চেয়েও ধারালো।
যে কলম প্রশ্ন তোলে, তাকে অনেকেই বিদ্রোহী ভাবে। অথচ সাংবাদিকের কলম বিদ্রোহের নয়, অনুসন্ধানের অস্ত্র।
সেই অনুসন্ধানের পথেই এগিয়ে গিয়েছিলেন দৈনিক অগ্রযাত্রা প্রতিদিন-এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক রেজানুল ইসলাম।
—
*৩. সংবাদকক্ষের নিঃশব্দ রাত*
রাতের সংবাদকক্ষগুলো অদ্ভুত।
সেখানে কীবোর্ডের শব্দে মানুষের ঘুম ভাঙে না, কিন্তু ক্ষমতার ঘুম ভেঙে যেতে পারে।
রেজানুল ইসলাম হয়তো সেদিনও সংবাদ সম্পাদনার টেবিলে বসেছিলেন। ডেস্কল্যাম্পের হলুদ আলোয় কাগজগুলো ছড়িয়ে ছিল। কোথাও তথ্য, কোথাও সূত্র, কোথাও প্রশ্ন।
একজন সম্পাদক জানেন, ভুল সংবাদ বিপজ্জনক।
কিন্তু তিনি এটাও জানেন, সত্য সংবাদও কখনো কখনো বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।
কলম যখন ক্ষমতার দরজায় কড়া নাড়ে, তখন অনেক সময় আইন তার পেছনে পেছনে হাঁটতে শুরু করে।
—
*৪. সত্যের অদ্ভুত নিয়তি*
পৃথিবীর সবচেয়ে একাকী বস্তু সম্ভবত সত্য।
প্রথমে তাকে অস্বীকার করা হয়।
তারপর তাকে আক্রমণ করা হয়।
অবশেষে তাকে মেনে নেওয়া হয়।
বগুড়ার ইউনিয়নগুলোর নাম পরিবর্তনের আলোচনা ও প্রশাসনিক উদ্যোগ পরবর্তীকালে জনসমক্ষে আসে। কিন্তু যে সংবাদ প্রথমে প্রশ্ন তুলেছিল, সেই সংবাদকর্মীদের ভাগ্যে জুটল মামলা, গ্রেফতার ও অনিশ্চয়তা।
এ যেন এমন এক নাট্যমঞ্চ, যেখানে ভবিষ্যৎ এসে অতীতকে সত্য প্রমাণ করে, কিন্তু অতীতের সাক্ষীদেরই কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে রাখা হয়।
—
*৫. সম্পাদকের হাতে কলম, রাষ্ট্রের হাতে আইন*
রেজানুল ইসলাম কোনো যুদ্ধের সেনাপতি নন।
তার হাতে বন্দুক নেই।
তার হাতে রয়েছে সংবাদ।
কিন্তু ইতিহাস বহুবার দেখিয়েছে—ক্ষমতাবানরা অনেক সময় বন্দুকের চেয়ে কলমকে বেশি ভয় পায়।
কারণ বন্দুক শরীর আহত করে, আর সংবাদ আহত করে ভণ্ডামি।
একজন সম্পাদক যখন প্রশ্ন করেন, তিনি ব্যক্তিগত শত্রুতা করেন না; তিনি জনমতের প্রতিনিধিত্ব করেন।
তিনি আদালতের বিচারক নন।
তিনি তদন্ত কর্মকর্তাও নন।
তিনি কেবল সমাজের সামনে একটি আয়না ধরেন।
আর আয়নার সবচেয়ে বড় অপরাধ হলো—সে মুখের কৃত্রিমতা লুকাতে জানে না।
—
*৬. হাতকড়ায় যখন বন্দি হয় বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ*
হাতকড়ার একটি নিজস্ব শব্দ আছে।
সে শব্দ কেবল লোহার নয়; সে শব্দের ভেতরে ভয় থাকে।
একজন সাংবাদিকের হাতে হাতকড়া পরলে কেবল একজন মানুষ গ্রেফতার হন না; অনেক অপ্রকাশিত সংবাদ নীরব হয়ে যায়।
অনেক তরুণ প্রতিবেদক নিজের খাতা বন্ধ করে দেন।
অনেক সম্পাদক নিজের বাক্য ছোট করে ফেলেন।
অনেক সংবাদকক্ষের বাতি আগেভাগেই নিভে যায়।
কারণ ভয় কখনো একজনকে গ্রেফতার করে না; ভয় একটি পেশার চারদিকে অদৃশ্য দেয়াল তৈরি করে।
—
*৭. গণতন্ত্রের জানালায় ছিদ্র*
গণতন্ত্রকে অনেকেই সংসদ ভবনের গম্বুজে খোঁজেন।
আসলে গণতন্ত্র বাস করে সংবাদপত্রের ছোট একটি কলামেও।
সেখানে একজন সাংবাদিক প্রশ্ন করতে পারেন।
একজন সম্পাদক প্রকাশ করতে পারেন।
একজন নাগরিক পড়তে পারেন।
যেদিন এই তিনজনের মধ্যে ভয় ঢুকে পড়ে, সেদিন গণতন্ত্রের জানালাগুলো একে একে বন্ধ হতে শুরু করে। এভাবেই গণতন্ত্রের জানালা ছিদ্রিত হয়ে গেছে!
—
*৮. রেজানুল ইসলামের প্রতীকী অবস্থান*
আজ রেজানুল ইসলাম শুধু একজন সম্পাদক নন।
তিনি একটি প্রশ্নের নাম।
তিনি একটি বিতর্কের নাম।
তিনি সেই সমস্ত স্থানীয় সাংবাদিকের প্রতীক, যারা জেলা শহরের ছোট অফিসে বসে বড় বড় প্রশ্ন তোলেন।
ঢাকার আলোকোজ্জ্বল টেলিভিশন স্টুডিওর বাইরে যে সাংবাদিকতা আছে, তার নামই স্থানীয় সাংবাদিকতা।
সেখানে বেতন কম।
সুবিধা কম।
ঝুঁকি বেশি।
কিন্তু সত্যের প্রতি দায়বদ্ধতা অনেক সময় রাজধানীর চেয়েও বেশি।
—
*৯. আদালত ও বিবেকের কাঠগড়া*
আইনের আদালত রায় দেয়।
কিন্তু সময়েরও একটি আদালত আছে।
সেখানে সাক্ষী থাকে ইতিহাস।
বিচারক থাকে বিবেক।
আর রায় লিখে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম।
আজকের এই ঘটনাও একদিন ইতিহাসের পৃষ্ঠায় লেখা হবে।
সেখানে হয়তো প্রশ্ন উঠবে—
যদি সংবাদের মূল বিষয় পরবর্তীতে গ্রহণযোগ্য হয়, তবে সংবাদ প্রকাশকারীর অপরাধ কোথায়?
যদি প্রশ্ন করাই অপরাধ হয়, তবে উত্তর খোঁজার দায়িত্ব কে নেবে?
—
*১০ অন্ধকারের মধ্যেও প্রদীপ জ্বলে*
রাত যত গভীর হয়, একটি ছোট প্রদীপের আলোও তত বেশি দৃশ্যমান হয়।
বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা সেই প্রদীপ।
রেজানুল ইসলামের ঘটনা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, সত্যের পথ কখনোই গোলাপের পাপড়িতে বিছানো থাকে না। সেখানে কাঁটা আছে, ভয় আছে, অনিশ্চয়তা আছে।
তবু সংবাদপত্রের পাতায় প্রতিদিন ভোর হয়।
তবু কোনো সম্পাদক রাত জেগে শেষ লাইনটি লিখে যান।
তবু কোনো সাংবাদিক প্রশ্ন করেন।
কারণ ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—
তলোয়ার সাম্রাজ্য তৈরি করতে পারে, কিন্তু সত্য শেষ পর্যন্ত স্মৃতি নির্মাণ করে।
আর সেই স্মৃতির ভেতরেই একদিন হয়তো লেখা থাকবে—
একজন সম্পাদক ছিলেন, যিনি কেবল সংবাদ প্রকাশ করেছিলেন; আর সেই সংবাদের ভেতরেই সময় নিজের মুখ দেখতে পেয়েছিল।