বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই ২০২৬, ০১:২৬ পূর্বাহ্ন
প্ররোচনার মামলা না নিয়ে অপমৃত্যুর মামলা, ক্ষোভ নিহতের পরিবারের
নিজস্ব প্রতিবেদক, জাজিরা (শরীয়তপুর):
শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার পশ্চিম নাওডোবার হাজি তাহের ঢালিকান্দি এলাকার প্রবাসী রশিদ বেপারীর ছেলে মিরাজ বেপারী (২০) প্রেমের সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া, প্রতারণা এবং মানসিক আঘাত সহ্য করতে না পেরে বিষপান করে আত্মহত্যা করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। রাজধানীর একটি হাসপাতালে ছয় দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে গত শুক্রবার তিনি মারা যান। এ ঘটনায় নিহতের পরিবার আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে নিয়মিত মামলা করতে চাইলেও পুলিশ অপমৃত্যুর মামলা গ্রহণ করায় এলাকায় ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
অভিযুক্ত হামিদা আক্তার, যিনি টিকটক কনটেন্ট নির্মাতা হিসেবে পরিচিত, মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার কাঠালবাড়ী বাংলাবাজার এলাকার বাসিন্দা। বর্তমানে তিনি ঢাকার কেরানীগঞ্জে বসবাস করছেন। পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, হামিদারা তিন বোন। তার মা হামিদার বাবার দ্বিতীয় স্ত্রী। প্রথম স্ত্রীর ঘরে আরও পাঁচ সন্তান রয়েছে।
নিহতের পরিবার, বন্ধু ও স্বজনদের দাবি, হামিদার নানা বাড়ির এলাকার এক বন্ধুর মাধ্যমে মিরাজ ও হামিদার পরিচয় হয়। পরে ফেসবুকে তাদের ঘনিষ্ঠতা বাড়ে এবং একপর্যায়ে সরাসরি দেখা-সাক্ষাৎ শুরু হয়। সম্পর্কের একপর্যায়ে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, দুই বান্ধবীকে সাক্ষী রেখে একজন হুজুরের মাধ্যমে ধর্মীয় রীতিতে তাদের বিয়ে সম্পন্ন হয়েছিল বলে মিরাজ বিশ্বাস করতেন।
পরিবারের অভিযোগ, এরপর বিভিন্ন সময়ে মাসিক খরচ, ব্যক্তিগত প্রয়োজন ও উপহারের কথা বলে হামিদা মিরাজের কাছ থেকে অর্থ নিতেন। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে পর্যাপ্ত লিখিত বা আইনি প্রমাণ নেই বলেও পরিবার স্বীকার করেছে।
পরিবার জানায়, চলতি বছরের এপ্রিলের শুরু থেকে হামিদার আচরণে পরিবর্তন লক্ষ্য করেন মিরাজ। এ নিয়ে তাদের মধ্যে একাধিকবার কথা কাটাকাটি হয়। মিরাজ সম্পর্কটি দুই পরিবারের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানোর কথা বললে হামিদা এতে আপত্তি জানান। পরে ২১ এপ্রিল পরীক্ষার অজুহাতে তিনি যোগাযোগ বন্ধ করে দেন।
পরিবারের দাবি, গত ১৪ জুন পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর কেরানীগঞ্জ এলাকার এক প্রতিবেশী যুবককে (ছদ্মনাম আশিক) বিয়ে করেন হামিদা। বিষয়টি মিরাজ তার এক বান্ধবীর মাধ্যমে জানতে পারেন। পরে এ নিয়ে দুজনের মধ্যে তীব্র বাকবিতণ্ডা হয়। পরিবারের অভিযোগ, ওই সময় মিরাজ মৃত্যুর কথা বললে হামিদা তাকে ‘মরে যেতে’ বলেন এবং গালিগালাজ করেন।
নিহতের স্বজনদের আরও দাবি, বিষপানের আগের দিন মিরাজ হামিদার মা, বোন ও কয়েকজন স্বজনের সঙ্গে ফোনে কথা বলে তাদের সম্পর্ক ও কথিত বিয়ের বিষয়টি জানান। কিন্তু তারা বিষয়টি গুরুত্ব না দিয়ে উল্টো অপমানজনক আচরণ করেন। এমনকি আত্মহত্যা করে ‘পুরুষত্ব’ প্রমাণ করতে বলেন, না হলে সম্পর্ক ভুলে যেতে বলেন বলেও পরিবারের অভিযোগ। স্বজনদের দাবি, সংশ্লিষ্ট মোবাইল ফোনগুলোর ফরেনসিক পরীক্ষা করা হলে এসব কথোপকথনের সত্যতা উদঘাটিত হবে।
পরদিন মিরাজ বিষপান করলে প্রথমে স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকার একটি হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে ছয় দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর তিনি মারা যান। পুলিশ সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করলে দাফন সম্পন্ন হয়।
এ বিষয়ে পদ্মা দক্ষিণ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুস সালাম বলেন, “পরিবারের পক্ষ থেকে একটি অপমৃত্যুর আবেদন পাওয়া গেছে। সেই অনুযায়ী অপমৃত্যুর মামলা নেওয়া হয়েছে। বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে। তদন্তে আত্মহত্যায় প্ররোচনার প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
অন্যদিকে, কেরানীগঞ্জ এলাকার কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অভিযুক্ত পরিবারের বিরুদ্ধে এলাকায় বিভিন্ন ধরনের নেতিবাচক অভিযোগ রয়েছে বলে তারা দাবি করেন। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা এই প্রতিবেদনের পক্ষ থেকে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
নিহতের পরিবারের দাবি, আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে নিয়মিত মামলা গ্রহণ, সংশ্লিষ্ট মোবাইল ফোনের ফরেনসিক পরীক্ষা এবং ঘটনার পূর্ণাঙ্গ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
উল্লেখ্য, আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগ একটি গুরুতর ফৌজদারি বিষয়। অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কাউকে দোষী বলা যায় না। ঘটনার প্রকৃত কারণ, দায় এবং অপরাধের অস্তিত্ব তদন্ত ও আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে।