সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:২৯ পূর্বাহ্ন
১. চার দেশের মিলন—কেবল জোট নয়, নতুন শক্তির মানচিত্র*
একুশ শতকের তৃতীয় দশকে বিশ্বরাজনীতির আকাশে ধীরে ধীরে একটি নতুন নক্ষত্রমণ্ডল দৃশ্যমান হচ্ছে—CRINK : China, Russia, Iran and North Korea।
এটি এখনো NATO-এর মতো আনুষ্ঠানিক চারদেশীয় সামরিক জোট নয়। বরং পারস্পরিক স্বার্থ, অস্ত্র-প্রযুক্তি, গোয়েন্দা সহযোগিতা, অর্থনৈতিক লেনদেন, সামরিক মহড়া এবং পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলার মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা একটি কৌশলগত নিরাপত্তা বলয়। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক CSIS-ও বলছে, চার দেশের সহযোগিতা দ্রুত বেড়েছে, যদিও এখনো আনুষ্ঠানিক চারদেশীয় সামরিক সমন্বয়ের প্রমাণ সীমিত।
কিন্তু ইতিহাসের বড় পরিবর্তন সবসময় চুক্তির কাগজে প্রথম লেখা হয় না। অনেক সময় পরিবর্তনের বীজ বপন হয় নীরবে—অস্ত্রের চালানে, প্রযুক্তির বিনিময়ে, সামরিক মহড়ায় এবং শত্রুর বিরুদ্ধে অভিন্ন অবস্থানে।
*২. কেন এই চার দেশ একসঙ্গে?*
চার দেশের ভৌগোলিক অবস্থান ভিন্ন, অর্থনৈতিক কাঠামো ভিন্ন, রাজনৈতিক মতাদর্শও এক নয়। কিন্তু তাদের সামনে একটি অভিন্ন বাস্তবতা রয়েছে—মার্কিন নেতৃত্বাধীন বিশ্বব্যবস্থার চাপ ও নিষেধাজ্ঞা থেকে নিজেদের কৌশলগত স্বাধীনতা রক্ষা করা।
চীন চায় বিশ্বব্যবস্থায় মার্কিন একক আধিপত্য কমাতে।
রাশিয়া চায় ইউরোপ থেকে এশিয়া পর্যন্ত নিজের কৌশলগত প্রভাব পুনর্গঠন করতে।
ইরান চায় মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন-ইসরায়েলি প্রভাবের মোকাবিলা করে নিজের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে।
উত্তর কোরিয়া চায় পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের বিরুদ্ধে নিজের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা তৈরি করতে।
অর্থাৎ চার দেশের লক্ষ্য অভিন্ন না হলেও তাদের প্রতিরোধের দিকটি একই দিকে।
*৩. যুদ্ধক্ষেত্র হয়ে উঠেছে প্রযুক্তির বিশ্ববিদ্যালয়*
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ CRINK সহযোগিতাকে একটি নতুন মাত্রা দিয়েছে। ইরানের ড্রোন প্রযুক্তি রাশিয়ার হাতে গেছে; উত্তর কোরিয়া রাশিয়াকে বিপুল গোলাবারুদ ও সামরিক সহায়তা দিয়েছে; বিনিময়ে রাশিয়া তার যুদ্ধক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা ও সামরিক প্রযুক্তি অংশীদারদের কাছে পৌঁছে দিতে সক্ষম হচ্ছে। গবেষণায় এমনকি ইরানি প্রযুক্তির রাশিয়ার মাধ্যমে উত্তর কোরিয়া ও চীনের দিকে প্রবাহের কথাও উঠে এসেছে।
ফলে যুদ্ধ এখন শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নেই।
এক দেশের যুদ্ধ-অভিজ্ঞতা অন্য দেশের অস্ত্রভাণ্ডারে ঢুকছে;
এক দেশের প্রযুক্তি অন্য দেশের ড্রোনে রূপান্তরিত হচ্ছে;
এক দেশের নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলার কৌশল অন্য দেশের অর্থনৈতিক ঢাল হয়ে উঠছে।
এটাই CRINK-এর প্রকৃত শক্তি।
*৪. রাশিয়া–উত্তর কোরিয়া : বলয়ের সামরিক মেরুদণ্ড*
CRINK-এর মধ্যে সবচেয়ে দৃশ্যমান সামরিক সম্পর্ক এখন রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার।
২০২৪ সালের কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তির পর দুই দেশের সামরিক সম্পর্ক দ্রুত গভীর হয়েছে। ২০২৬ সালেও রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়া সামরিক সহযোগিতা আরও প্রাতিষ্ঠানিক করার দিকে এগিয়েছে। একই সঙ্গে উত্তর কোরিয়া চীন ও রাশিয়া—দুই শক্তির সঙ্গেই সম্পর্ক ভারসাম্যপূর্ণভাবে বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ রাশিয়া–উত্তর কোরিয়া সীমান্তে নতুন সড়ক সেতু উদ্বোধনও দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদি যোগাযোগ বৃদ্ধির প্রতীক হয়ে উঠেছে।
এ যেন ভবিষ্যতের একটি দৃশ্যের পূর্বাভাস—
এক প্রান্তে মস্কো, অন্য প্রান্তে পিয়ংইয়ং;
মাঝখানে সীমান্ত নদী;
আর সেই নদীর ওপর দিয়ে শুধু যানবাহন নয়—অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও কৌশলগত সম্পর্কও পার হচ্ছে।
*৫. চীন : নীরব কিন্তু সবচেয়ে শক্তিশালী স্তম্ভ*
CRINK-এর সবচেয়ে বড় শক্তি চীন। অর্থনীতি, শিল্প, প্রযুক্তি, বাণিজ্য, উৎপাদন ক্ষমতা এবং কূটনৈতিক প্রভাব—সব মিলিয়ে চীন এই বলয়ের সম্ভাব্য কেন্দ্রীয় শক্তি।
রাশিয়া যদি দেয় সামরিক শক্তি,
ইরান যদি দেয় মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত গভীরতা,
উত্তর কোরিয়া যদি দেয় পারমাণবিক প্রতিরোধ ও সামরিক জনবল,
তাহলে চীন দিতে পারে অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত স্থায়িত্ব।
এই সমন্বয়ই ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
*৬. আমেরিকার পতন—নাকি আমেরিকান একক আধিপত্যের অবসান*
এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
“CRINK-এর মূল লক্ষ্য আমেরিকার পতন”—এমন ধারণা রাজনৈতিক বিশ্লেষণে ব্যবহৃত হলেও এটিকে এখনই চার দেশের ঘোষিত রাষ্ট্রীয় লক্ষ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা যায় না। বরং গবেষণাগুলো দেখাচ্ছে, তাদের সহযোগিতার বড় উদ্দেশ্য হলো মার্কিন চাপ মোকাবিলা করা, নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চলা এবং নিজেদের কৌশলগত স্বাধীনতা বাড়ানো।
তবে ইতিহাসের বিচারে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে।
একটি সাম্রাজ্যের পতন সবসময় তার রাজধানী দখলের মধ্য দিয়ে ঘটে না।
কখনো তার পতন শুরু হয় যখন—
তার মুদ্রার একক আধিপত্য কমে ]যায়,
তার নিষেধাজ্ঞা অকার্যকর হতে শুরু করে,
তার সামরিক উপস্থিতির খরচ বেড়ে যায়,
তার মিত্রদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হয়,
এবং প্রতিদ্বন্দ্বীরা নিজেদের মধ্যে বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তোলে।
CRINK-এর সম্ভাব্য প্রভাব এখানেই।
*৭. ভবিষ্যতের যুদ্ধ হয়তো যুদ্ধ ঘোষণা ছাড়াই শুরু হবে*
ধরা যাক, ২০৩০-এর দশকের কোনো এক সকাল।
বিশ্বের কয়েকটি অঞ্চলে একই সময়ে সামরিক উত্তেজনা তৈরি হলো।
পূর্ব এশিয়ায় উত্তর কোরিয়া সীমান্তে চাপ বাড়াল।
ইন্দো-প্যাসিফিকে চীন সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি করল।
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধব্যবস্থা সক্রিয় করল।
ইউরোপীয় থিয়েটারে রাশিয়া সামরিক চাপ সৃষ্টি করল।
তখন ওয়াশিংটনের সামনে প্রশ্ন দাঁড়াবে—
কোন আগুন আগে নেভানো হবে?
এটাই হতে পারে CRINK-এর সবচেয়ে ভয়ংকর কৌশলগত সুবিধা।
তারা হয়তো একসঙ্গে কোনো যুদ্ধ করবে না; বরং একাধিক যুদ্ধক্ষেত্রের সম্ভাবনা তৈরি করে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিকে ছড়িয়ে দিতে পারে। সাম্প্রতিক সামরিক বিশ্লেষণেও রাশিয়া–উত্তর কোরিয়া সম্পর্ককে এ ধরনের বহু-মুখী চাপ সৃষ্টির সম্ভাব্য উপাদান হিসেবে দেখা হচ্ছে।
*৮. কিন্তু CRINK-এর দুর্বলতার দিক*
এই বলয়কে অজেয় মনে করা ভুল হবে।
চীন ও রাশিয়ার স্বার্থ সবসময় এক নয়। ইরানের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক মূলত বাস্তববাদী। উত্তর কোরিয়া নিজের স্বার্থে চীন ও রাশিয়ার মধ্যে ভারসাম্য রাখে। চার দেশের মধ্যে পারস্পরিক আস্থারও সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
২০২৬ সালের বিভিন্ন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সংকটের সময় চীন ও রাশিয়া ইরানকে রাজনৈতিকভাবে সমর্থন করলেও সরাসরি সামরিক যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার ক্ষেত্রে যথেষ্ট সতর্ক।
অতএব CRINK এখনো একটি অভিন্ন কমান্ডের সামরিক বাহিনী নয়।
বরং এটি একটি নমনীয় শক্তির নেটওয়ার্৯. ভবিষ্যতের পৃথিবী : দুই মেরু নয়, বহু শক্তির সংঘাত
শীতল যুদ্ধের পৃথিবী ছিল মূলত দুই মেরুর।
ভবিষ্যতের পৃথিবী হয়তো হবে ভিন্ন।
একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা।
অন্যদিকে চীন–রাশিয়া–ইরান–উত্তর কোরিয়ার ক্রমবর্ধমান সমন্বয়।
আর মাঝখানে থাকবে ভারত, তুরস্ক, সৌদি আরব, মধ্য এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার বহু রাষ্ট্র—যারা কোনো একটি শিবিরে পুরোপুরি ঢুকে না গিয়ে নিজেদের স্বার্থ অনুযায়ী অবস্থান বদলাবে।
এমন পৃথিবীতে ক্ষমতা মানে শুধু পারমাণবিক বোমা নয়; ক্ষমতা মানে প্রযুক্তি, অর্থনীতি, খাদ্য, জ্বালানি, সাইবার সক্ষমতা, মহাকাশ, সমুদ্রপথ এবং তথ্যের নিয়ন্ত্রণ।
*১০. শেষ দৃশ্য : ইতিহাসের নতুন অধ্যায়*
হয়তো কোনো একদিন ইতিহাসবিদেরা ২০২০-এর দশকের দিকে ফিরে তাকিয়ে বলবেন—
“তখনই পুরোনো বিশ্বব্যবস্থার ভিত নড়তে শুরু করেছিল।”
কেউ হয়তো বলবেন, আমেরিকার পতন তখনই শুরু হয়েছিল।
আবার কেউ বলবেন, আমেরিকা পতন করেনি—বরং আমেরিকার একক বিশ্বনেতৃত্বের যুগের অবসান হয়েছিল।
আর সেই পরিবর্তনের পেছনে CRINK হয়তো একমাত্র কারণ ছিল না; কিন্তু এটি ছিল এমন একটি কৌশলগত শক্তি-নেটওয়ার্ক, যা যুক্তরাষ্ট্রকে একই সময়ে একাধিক দিক থেকে প্রতিযোগিতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিল।
ভবিষ্যতের পর্দা এখনো পুরোপুরি ওঠেনি।
কিন্তু মঞ্চ প্রস্তুত হচ্ছে।
একদিকে আটলান্টিকের পুরোনো শক্তি,
অন্যদিকে ইউরেশিয়ার নতুন সংযোগ,
মধ্যপ্রাচ্যের আগ্নেয় ভূগোল,
আর পূর্ব এশিয়ার পারমাণবিক ছায়া।
সম্ভবত আগামী বিশ্বযুদ্ধের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হবে—কে কাকে পরাজিত করবে তা নয়; বরং কে বিশ্বকে নিজের মতো করে সাজানোর ক্ষমতা অর্জন করবে।
আর সেই নতুন পৃথিবীর দরজায় CRINK যদি সত্যিই একটি কার্যকর সামরিক-নিরাপত্তা বলয়ে পরিণত হয়, তাহলে আমেরিকার পতনের চেয়েও বড় ঘটনা ঘটতে পারে—শেষ হতে পারে একক আধিপত্যের যুগ, শুরু হতে পারে বহুমেরু শক্তির এক নতুন বিশ্বব্যবস্থা।
*[ অধ্যাপক এম এ বার্ণিক একজন সুপরিচিত আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক পর্যবেক্ষক ও উচ্চমার্গের প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ]*