বুধবার, ২৬ অগাস্ট ২০২৬, ১২:০৩ অপরাহ্ন
১. আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা কৌশলে বাংলাদেশের অবস্থা*
একসময় ভূরাজনীতির বড় মঞ্চে বাংলাদেশকে অনেকে দেখতেন ছোট্ট এক দর্শকের মতো—গ্যালারিতে বসে খেলা দেখছে, মাঝে মাঝে হাততালি দিচ্ছে, আর ভাবছে, “এবার কে জিতবে?” কিন্তু সময় বড় বিচিত্র জিনিস। আজ সেই দর্শকই যেন হঠাৎ করে মাঠের মাঝখানে এসে দাঁড়িয়েছে! ভারত একদিকে তাকিয়ে আছে, চীন আরেকদিকে; আরব দুনিয়া দূর থেকে হাত নাড়ছে, পাকিস্তান-তুরস্ক কৌশলগত সমীকরণের খাতা খুলে বসেছে। আর মাঝখানে বাংলাদেশ—যেন কোনো বিয়ের আসরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু সবচেয়ে দ্বিধাগ্রস্ত আত্মীয়—সবাই তাকে নিজের টেবিলে বসাতে চায়!
সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক সংবাদ বলছে, বাংলাদেশ সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের নতুন মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে ইতিবাচকভাবে ভাবছে। একই সময়ে চীনের সঙ্গে J-10CE যুদ্ধবিমান ও আক্রমণাত্মক হেলিকপ্টার কেনার বিষয়ে আলোচনা এগোচ্ছে। এই দুই খবরকে আলাদা আলাদা সংবাদ হিসেবে পড়লে হয়তো সাধারণ মনে হবে; কিন্তু পাশাপাশি রাখলে বোঝা যায়—বাংলাদেশ এখন কেবল মানচিত্রের একটি ভূখণ্ড নয়, বরং বৃহত্তর কৌশলগত দাবার বোর্ডের এমন একটি ঘুঁটি, যার অবস্থান নিয়ে খেলোয়াড়দের কৌতূহল বেড়েছে।
*২. স্ট্র্যাটেজিক মানচিত্রের মাঝখানে বাংলাদেশ*
বাংলাদেশের সামনে যেন এখন চারজন অতিথি এসে বসেছেন।
ভারত বলছে,
“পাশের বাড়ির মানুষ, আমার কথাটাও শুনবে।”
চীন বলছে,
“বন্ধু, আধুনিক প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি লাগলে আমার দোকান খোলা আছে।”
মধ্যপ্রাচ্য বলছে,
“ভাই, নিরাপত্তার নতুন পারিবারিক সমিতি হচ্ছে, আপনিও সদস্য হবেন নাকি?”
আর পাকিস্তান ও তুরস্ক একটু দূরে বসে কূটনৈতিক চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে হিসাব কষছে—ঢাকা কোন টেবিলে কতক্ষণ বসে!
বাংলাদেশের অবস্থা তাই অনেকটা এমন—সবাই দাওয়াত দিচ্ছে, কিন্তু কোনো দাওয়াতেই গিয়ে এমন খাবার খাওয়া যাবে না, যাতে পাশের বাড়ির লোক রাগ করে!
এই বাস্তবতার মধ্যেই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তার ভারসাম্য রক্ষার ক্ষমতা। কারণ ঢাকা যদি একদিকে অতিরিক্ত ঝুঁকে পড়ে, অন্যদিকে সঙ্গে সঙ্গে কপালে ভাঁজ পড়বে। আর বাংলাদেশের কপালে ভাঁজ পড়লে শুধু পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নয়, ব্যবসায়ী, প্রবাসী, নিরাপত্তা বিশ্লেষক—সবারই রাতের ঘুম কমে যেতে পারে।
*৩. মক্কা চুক্তি : শুধু বন্ধুত্ব, নাকি নতুন নিরাপত্তা অঙ্ক*
সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা সহযোগিতার নতুন কাঠামোতে বাংলাদেশের সম্ভাব্য অংশগ্রহণের আলোচনা স্বাভাবিকভাবেই ভারতের কৌশলগত মহলে নজর কাড়বে। কারণ দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা রাজনীতিতে ভারত ও পাকিস্তানের সম্পর্ক কখনোই পাড়ার ক্রিকেট ম্যাচের মতো ছিল না—যেখানে হারলে পরদিন আবার হাসিমুখে ব্যাট-বল নিয়ে হাজির হওয়া যায়।
Reuters-এর প্রতিবেদনে বাংলাদেশের এই উদ্যোগকে দেশের ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির একটি বড় পরীক্ষার মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা হিসেবে দেখা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদেরও উদ্বেগ—যে কোনো সামরিক জোটে অংশগ্রহণ বাংলাদেশকে এমন সংঘাতে জড়িয়ে ফেলতে পারে, যার সঙ্গে তার সরাসরি জাতীয় স্বার্থের সম্পর্ক নাও থাকতে পারে।
এখানেই আসল প্রশ্ন—বাংলাদেশ কি আমন্ত্রিত অতিথি হবে, নাকি স্থায়ী সদস্য?
দুইটির মধ্যে পার্থক্য বিশাল। দাওয়াতে গেলে কাবাব খেয়ে ফিরে আসা যায়; কিন্তু পারিবারিক জোটে নাম লিখালে সুখে-দুঃখে, ঝগড়ায়-ফ্যাসাদে উপস্থিতির প্রশ্ন আসে!
বাংলাদেশের তাই প্রয়োজন আবেগের চেয়ে কৌশলগত হিসাব।
*৪. চীনের J-10CE : আকাশে শুধু যুদ্ধবিমান নয়, কূটনীতিরও উড্ডয়ন*
চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক নতুন নয়। কিন্তু J-10CE যুদ্ধবিমান নিয়ে আলোচনা নতুন গুরুত্ব বহন করছে। Reuters-এর তথ্য অনুযায়ী, সম্ভাব্য চুক্তির আনুষ্ঠানিক আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে এবং এটি সাম্প্রতিক বছরগুলোর বড় প্রতিরক্ষা ক্রয়ের অন্যতম হতে পারে।
এখন স্বাভাবিক প্রশ্ন—একটি যুদ্ধবিমান কেনা মানে কি শুধু যুদ্ধবিমান কেনা?
আহা, ভূরাজনীতিতে এত সরল হিসাব হলে কূটনীতিবিদদের চাকরি অনেক আগেই বিপদে পড়ত!
একটি আধুনিক যুদ্ধবিমান কেনার সঙ্গে যুক্ত থাকে প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ, অস্ত্রব্যবস্থা, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরক্ষা সম্পর্ক। ফলে J-10CE কেবল চীনের কারখানা থেকে আকাশে উড়ে আসা একটি বিমান নয়; এটি বাংলাদেশ-চীন কৌশলগত সম্পর্কের গভীরতার প্রতীকও হতে পারে।
আর ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকে চীনা প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক নিশ্চয়ই গভীর পর্যবেক্ষণের বিষয় হবে। এখানেই বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে কঠিন কাজ—চীন থেকে প্রতিরক্ষা সক্ষমতা নেওয়া, কিন্তু এমন বার্তা না দেওয়া যে বাংলাদেশ কারও বিরুদ্ধে সামরিক মঞ্চ সাজাচ্ছে।
সোজা কথা, যুদ্ধবিমান আকাশে ওড়ে—কিন্তু তার ছায়া অনেক সময় কূটনৈতিক টেবিলেও পড়ে।
*৫. ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক : নিকট প্রতিবেশীর অঙ্ক কখনো সহজ নয়*
বাংলাদেশ ও ভারত শুধু দুটি প্রতিবেশী রাষ্ট্র নয়। নদী, সীমান্ত, বাণিজ্য, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, নিরাপত্তা, সংস্কৃতি এবং মানুষের জীবনের সঙ্গে দুই দেশের সম্পর্ক জড়িয়ে আছে।
তাই ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে কেউ চাইলে “একটি অধ্যায়” বলতে পারেন; কিন্তু আসলে এটি পুরো বইয়ের একটি বড় অংশ।
বাংলাদেশের মধ্যপ্রাচ্য ও চীনের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক বাড়লে ভারতের উদ্বেগ থাকবে—এটি অস্বাভাবিক নয়। বিশেষ করে এমন একটি প্রতিরক্ষা কাঠামোয় পাকিস্তানের উপস্থিতি থাকলে নয়াদিল্লির কৌশলগত ক্যালকুলেটরটি যে কিছুটা গরম হয়ে উঠবে, তা অনুমান করা কঠিন নয়।
কিন্তু বাংলাদেশেরও নিজস্ব নিরাপত্তা প্রয়োজন আছে, নিজস্ব প্রতিরক্ষা আধুনিকীকরণের প্রয়োজন আছে এবং স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনার সার্বভৌম অধিকার আছে।
এখানে নীতিটা হওয়া উচিত—বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা কারও বিরুদ্ধে নয়; বাংলাদেশের নিরাপত্তার জন্য।
এই একটি বাক্য যত সহজ, বাস্তবে তার প্রয়োগ তত কঠিন।
*৬. বাংলাদেশ এখন শুধু “বাফার” নয়, “ব্রিজ”ও হতে পারে*
বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সুযোগ এসেছে।
ঢাকা যদি বিচক্ষণতার সঙ্গে এগোয়, তাহলে সে ভারত ও চীনের মধ্যে সংঘাতের মঞ্চ হবে না; বরং যোগাযোগের একটি সেতু হতে পারে। একইভাবে মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক শুধু জনশক্তি রপ্তানি ও রেমিট্যান্সের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে নিরাপত্তা, প্রযুক্তি, বিনিয়োগ ও কৌশলগত সহযোগিতার নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করতে পারে।
বাংলাদেশকে তাই *তিনটি বিষয়* একসঙ্গে ভাবতে হবে—
*প্রথমত,* জাতীয় নিরাপত্তা;
*দ্বিতীয়ত,* অর্থনৈতিক স্বার্থ;
*তৃতীয়ত,* কৌশলগত স্বাধীনতা।
একটিকে বাঁচাতে গিয়ে অন্য দুটিকে বলি দেওয়া যাবে না।
“বন্ধুত্ব সবার সঙ্গে, জোট কাদের সঙ্গে?”
এখানেই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
বিশ্ব এখন আর পুরোনো দিনের মতো সাদা-কালো নয়। একই দেশের সঙ্গে কেউ বাণিজ্য করে, আবার প্রতিরক্ষা প্রতিযোগিতাও করে; কারও সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা থাকে, আবার অন্য ইস্যুতে মতবিরোধও থাকে।
তাই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ হবে কোনো পক্ষের স্থায়ী শিবিরে ঢুকে না গিয়ে বহুমাত্রিক অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা।
চীনের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা থাকবে, ভারতের সঙ্গে নিরাপত্তা সংলাপ থাকবে, মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক থাকবে, পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গেও অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা চলবে।
অর্থাৎ, বাংলাদেশের নীতি হতে পারে—
«“সবার সঙ্গে কথা বলব, দেশের স্বার্থ দেখে সিদ্ধান্ত নেব।”»
এতে কারও মন খারাপ হলে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বিনীতভাবে বলা যেতে পারে—
“ভাই, এটা ব্যক্তিগত কিছু নয়; জাতীয় স্বার্থের ব্যাপার!”
*৭. শেষ কথা : সুযোগও আছে, বিপদও আছে*
বাংলাদেশ এখন একটি নতুন ভূরাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। ভারত-চীন প্রতিযোগিতা, মধ্যপ্রাচ্যের নতুন নিরাপত্তা কাঠামো এবং দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তিত প্রতিরক্ষা বাস্তবতার মাঝখানে বাংলাদেশের অবস্থান ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
কিন্তু গুরুত্ব পাওয়া আর শক্তিশালী হয়ে ওঠা এক জিনিস নয়।
সবাই যদি বাংলাদেশের দিকে তাকায়, তাতে খুশি হওয়ার কারণ আছে; আবার সবাই যদি বাংলাদেশকে নিজের দিকে টানতে চায়, তাতে সতর্ক হওয়ার কারণও আছে।
আজ বাংলাদেশের সামনে দরজা খুলছে। কিন্তু সব দরজা দিয়ে একসঙ্গে বের হতে গেলে মাঝখানে আটকে যাওয়ার সম্ভাবনাও থাকে!
সুতরাং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কৌশল হওয়া উচিত—কোনো সামরিক জোটের অন্ধ অনুসারী নয়, কারও বিরুদ্ধে ব্যবহৃত দাবার ঘুঁটিও নয়; বরং নিজের স্বার্থে সিদ্ধান্ত নেওয়া একটি আত্মবিশ্বাসী, ভারসাম্যপূর্ণ ও কৌশলগতভাবে স্বাধীন রাষ্ট্র।
ভারতকে প্রতিবেশী হিসেবে গুরুত্ব দিতে হবে, চীনকে কৌশলগত ও অর্থনৈতিক অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে, মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে সম্পর্ককে বহুমাত্রিক করতে হবে—কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের জাতীয় পতাকার পাশে সবচেয়ে বড় নামটি হতে হবে একটিই—
“বাংলাদেশের স্বার্থ।”
কারণ ভূরাজনীতির বিশাল দাবার বোর্ডে বাংলাদেশ আর শুধু একটি ছোট ঘুঁটি নয়; ধীরে ধীরে এমন একটি অবস্থানে পৌঁছাচ্ছে, যেখানে তার এক পা এদিক-ওদিক হলে পুরো বোর্ডের খেলোয়াড়রাই নতুন করে হিসাব করতে বসবে।
আর সেই হিসাবের খাতা খুলে বাংলাদেশ যেন শুধু একটাই কথা লিখতে পারে—
“আমরা কারও বিরুদ্ধে নই; কিন্তু বাংলাদেশের স্বার্থের বিরুদ্ধে কেউ গেলে—সেখানে আমাদের নিজস্ব উত্তর থাকবে।”
*[পাদটীকাঃ অধ্যাপক এম এ বার্ণিক একজন পেশাদার প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ]*