শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬, ০৫:৫৯ অপরাহ্ন
*১০১ বছরেও মাহাথির মোহাম্মদ মু
শতবর্ষ পেরিয়ে যখন মানুষ জীবনের শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়ায়, তখন অধিকাংশই হয়ে ওঠেন স্মৃতির মানুষ। কিন্তু এমন কিছু মানুষ আছেন, যাদের জীবন কেবল ইতিহাস নয়—ভবিষ্যতেরও পথপ্রদর্শক। মাহাথির মোহাম্মদ তাঁদেরই একজন।
১০১ বছরে পদার্পণ করা এই রাষ্ট্রনায়কের জীবন যেন এক দীর্ঘ উপন্যাস। সেখানে দারিদ্র্য আছে, সংগ্রাম আছে, আত্মবিশ্বাস আছে, আছে একটি জাতিকে মাথা উঁচু করে দাঁড় করানোর দুর্বার সংকল্প।
একজন সাধারণ চিকিৎসক থেকে তিনি হয়ে উঠেছিলেন মালয়েশিয়ার রূপকার। তাঁর হাতে গড়া মালয়েশিয়া আজ আধুনিক অবকাঠামো, শিল্পায়ন, প্রযুক্তি, শিক্ষা ও সুশাসনের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। কুয়ালালামপুরের আকাশছোঁয়া অট্টালিকা, উন্নত মহাসড়ক, শিল্পাঞ্চল কিংবা প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি—এসবের পেছনে রয়েছে এক দূরদর্শী নেতৃত্বের স্বাক্ষর।
কিন্তু মাহাথিরের প্রকৃত শক্তি ছিল তাঁর চিন্তায়। তিনি বারবার বলেছেন—কোনো জাতি অন্যের সাহায্যে বড় হয় না; বড় হয় নিজের শ্রম, শৃঙ্খলা, শিক্ষা, বিজ্ঞানমনস্কতা এবং আত্মমর্যাদার শক্তিতে।
তিনি বিশ্বাস করতেন, দুর্নীতির সঙ্গে উন্নয়নের সহাবস্থান সম্ভব নয়। তাই রাষ্ট্র পরিচালনায় তিনি জবাবদিহি, দক্ষতা ও সততার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর কাছে সময়ের মূল্য ছিল জাতীয় সম্পদের সমান।
মুসলিম বিশ্বের উদ্দেশে মাহাথিরের সবচেয়ে বড় বার্তা ছিল—ইসলাম জ্ঞান, গবেষণা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও ন্যায়বিচারের ধর্ম। মুসলমানরা যদি কেবল অতীতের গৌরব নিয়ে বেঁচে থাকে, তবে ভবিষ্যৎ নির্মাণ সম্ভব নয়। তিনি মুসলিম যুবসমাজকে আধুনিক শিক্ষা, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের পথে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
বাংলাদেশের জন্যও তাঁর জীবন এক অনন্য শিক্ষার ভাণ্ডার। আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদ সীমিত হতে পারে, কিন্তু মানুষের মেধা সীমাহীন। যদি আমরা শিক্ষা, দক্ষতা, উৎপাদনশীলতা, সুশাসন এবং দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনকে জাতীয় অঙ্গীকারে পরিণত করতে পারি, তবে বাংলাদেশও উন্নয়নের নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে।
মাহাথির দেখিয়েছেন—রাষ্ট্রের উন্নয়ন কেবল অর্থনৈতিক সূচকে নয়; মানুষের চরিত্র, কর্মসংস্কৃতি এবং জাতীয় আত্মবিশ্বাসের মধ্যেই প্রকৃত উন্নয়নের ভিত্তি গড়ে ওঠে।
তাঁর জীবনের কয়েকটি অনুকরণীয় শিক্ষা আজও সমান প্রাসঙ্গিক—
(১)- বড় স্বপ্ন দেখুন, কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণে কঠোর পরিশ্রম করুন।
(২)- জ্ঞান ও প্রযুক্তিকে জাতীয় উন্নয়নের প্রধান হাতিয়ার বানান।
(৩)- দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপস নয়।
(৪)- সময়কে সম্মান করুন; সময় নষ্ট মানেই জাতির ক্ষতি।
(৫)- আত্মনির্ভরশীল অর্থনীতি গড়ে তুলুন।
(৬)- নেতৃত্ব মানে ক্ষমতা ভোগ নয়, মানুষের সেবা করা।
(৭) জাতীয় স্বার্থকে ব্যক্তিগত ও দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে রাখুন।
১০১ বছরের এই দীর্ঘ যাত্রায় মাহাথির মোহাম্মদ প্রমাণ করেছেন—বয়স মানুষের শক্তিকে কমায় না, যদি আদর্শ, প্রজ্ঞা ও দেশপ্রেম অটুট থাকে। তাঁর জীবন আমাদের শেখায়, একজন সৎ, দূরদর্শী ও সাহসী নেতা একটি জাতির ভাগ্য বদলে দিতে পারেন।
আজ যখন মুসলিম বিশ্ব নানা সংকট, বিভাজন ও উন্নয়ন-চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, তখন মাহাথির মোহাম্মদের জীবন নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয়—ঐক্য, জ্ঞান, বিজ্ঞান, শৃঙ্খলা এবং সুশাসনই অগ্রগতির একমাত্র টেকসই পথ।
১০১ বছরে দাঁড়িয়ে মাহাথির মোহাম্মদ শুধু মালয়েশিয়ার নয়, সমগ্র মুসলিম বিশ্বের এক জীবন্ত প্রেরণার নাম। তাঁর জীবন আমাদের বলে—জাতির পুনর্জাগরণ শুরু হয় একজন মানুষের স্বপ্ন থেকে, আর সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেয় কোটি মানুষের সম্মিলিত কর্মে।
মাহাথির মোহাম্মদের প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা, সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ুর শুভকামনা। তাঁর কর্মময় জীবন আগামী প্রজন্মকে আরও বহু বছর পথ দেখাক—এই প্রত্যাশাই রইল।