রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৪১ পূর্বাহ্ন
পরাশক্তির রাজনীতির খেলায় ডোনাল্ট ট্রাম্প নিজকে পাকা-খেলোয়াড় ভেবেই বিশ্বে একক আধিপত্য বিস্তারে প্রবৃত্ত হয়েছিলো। দূর আটলান্টিকের ওপারে বসে ট্রাম্প ভেবেছিলেন, চাপ, নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক হুমকির সমন্বয়ে ইরানকে এমন এক কোণঠাসা অবস্থায় নেওয়া যাবে, যেখানে তার প্রতিটি পদক্ষেপ হবে ওয়াশিংটনের হিসাবমতো। ওয়াশিংটনের বিজয়ে সবাই কাঁপতে থাকবে! কিন্তু ইতিহাস কখনো কেবল এক পক্ষের অঙ্ক মেনে চলে না। ট্রাম্পের হিসাবও মিলেনি।
ট্রাম্পের বিজয়-সমীকরণের কেন্দ্রে ছিল দ্রুত ফল পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা। তিনি মনে করেছিলেন, অর্থনৈতিক অবরোধ ইরানের জনজীবনে চাপ সৃষ্টি করবে, রাজনৈতিক নেতৃত্বকে দুর্বল করবে এবং শেষ পর্যন্ত তেহরানকে আলোচনার টেবিলে নতজানু হয়ে ফিরতে বাধ্য করবে। কিন্তু ইরান সেই চাপকে কেবল সংকট হিসেবে দেখেনি; বরং তা পরিণত করেছে আত্মনির্ভরতার পরীক্ষায়। দেশটির জনগণ, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ও নিরাপত্তা কাঠামো বুঝে নিয়েছিল—এ লড়াই শুধু সরকারের সঙ্গে বাইরের শক্তির নয়, বরং জাতীয় মর্যাদা ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতারও লড়াই।
তেহরানের এক পুরোনো বইয়ের দোকানে বসে বৃদ্ধ আলী তাঁর নাতিকে বলছিলেন, “যে জাতি নিজের ভবিষ্যৎ অন্যের হাতে তুলে দেয়, সে জাতি কখনো সত্যিকারের স্বাধীন হয় না।” কথাটি হয়তো কোনো কূটনৈতিক নথিতে লেখা নেই, কিন্তু ইরানের প্রতিরোধের মনস্তত্ত্ব বোঝার জন্য এর চেয়ে শক্তিশালী ব্যাখ্যা খুব কমই আছে। নিষেধাজ্ঞা ইরানের অর্থনীতিতে ক্ষত তৈরি করেছে, সাধারণ মানুষের জীবন কঠিন করেছে—এ সত্য অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবু সেই চাপ রাজনৈতিক আত্মসমর্পণে রূপ নেয়নি।
বরং ইরান আঞ্চলিক কূটনীতি, প্রতিরক্ষা সক্ষমতা, প্রযুক্তি ও বিকল্প অর্থনৈতিক সম্পর্কের ওপর জোর দিয়েছে। প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়েছে, বৈশ্বিক শক্তিগুলোর সঙ্গে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে এবং দেখিয়েছে—একটি দেশকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা সবসময় তাকে একা করে না; কখনো কখনো তা তাকে নতুন মিত্র খুঁজে নিতে বাধ্য করে।
ট্রাম্পের পরিকল্পনার আরেকটি দুর্বলতা ছিল ইরানের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতাকে সরলভাবে দেখা। ইরান কোনো একরৈখিক রাষ্ট্র নয়; সেখানে মতভেদ আছে, বিতর্ক আছে, সংস্কারের দাবি আছে, অর্থনৈতিক অসন্তোষও আছে। কিন্তু বিদেশি চাপ যখন জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নকে সামনে নিয়ে আসে, তখন অভ্যন্তরীণ বিভাজনের অনেকটাই সাময়িকভাবে গৌণ হয়ে যায়। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও বহু ইরানি মনে করেছে, বাইরের শক্তির নির্দেশে পরিবর্তন গ্রহণযোগ্য নয়।
এই জায়গাতেই ট্রাম্পের হিসাব ভেঙে পড়ে। তিনি ভেবেছিলেন, চাপ ইরানকে দুর্বল করবে; কিন্তু চাপ ইরানকে আরও সতর্ক, আরও কৌশলী এবং আরও দৃঢ় করেছে। তিনি ভেবেছিলেন, ভয় দেখালে প্রতিপক্ষ পিছু হটবে; কিন্তু ইরান ভয়কে রাজনৈতিক ভাষায় অনুবাদ করে প্রতিরোধের প্রতীকে পরিণত করেছে। তিনি ভেবেছিলেন, একতরফা সিদ্ধান্তই আন্তর্জাতিক বাস্তবতা নির্ধারণ করবে; কিন্তু বিশ্বরাজনীতি ক্রমেই বহুমেরুকেন্দ্রিক হয়ে উঠেছে।
এক সন্ধ্যায় তেহরানের এক তরুণ গবেষক, নাসির, তাঁর সহকর্মীকে বলছিলেন, “আমরা হয়তো সব যুদ্ধে জিতিনি, কিন্তু আমাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার হারাইনি।” এই বাক্যেই ইরানের কৌশলগত সাফল্যের সারাংশ নিহিত। বিজয় সবসময় প্রতিপক্ষকে পরাজিত করার নাম নয়; কখনো কখনো নিজের অবস্থান অক্ষুণ্ন রাখাও বড় বিজয়।
তবে এই গল্পকে একপাক্ষিক উল্লাসে পরিণত করা উচিত নয়। ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞার প্রভাব বাস্তব, অর্থনৈতিক সংকট বাস্তব, জনগণের কষ্টও বাস্তব। ইতিবাচক বিশ্লেষণের অর্থ সমস্যাকে অস্বীকার করা নয়; বরং সংকটের মধ্যেও যে কৌশল, ধৈর্য ও আত্মপরিচয়ের শক্তি কাজ করে, তা অনুধাবন করা। ইরানের অভিজ্ঞতা দেখায়, সামরিক বা অর্থনৈতিক চাপ দিয়ে কোনো জাতির রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তিকে সবসময় নিয়ন্ত্রণ করা যায় না।
শেষ পর্যন্ত ট্রাম্পের বিজয়-সমীকরণ চূর্ণবিচূর্ণ হয়েছে কোনো একক ঘটনার কারণে নয়; বরং বাস্তবতার বহুস্তরীয় প্রতিরোধে। ইরানের জনগণের জাতীয় চেতনা, নেতৃত্বের কৌশল, আঞ্চলিক সম্পর্ক, বিকল্প আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং দীর্ঘমেয়াদি ধৈর্য—সব মিলেই সেই সমীকরণকে অকার্যকর করেছে।
সূর্য তখন তেহরানের ওপর পুরোপুরি উঠেছে। শহরটি আবার ব্যস্ত হয়ে উঠছে। দোকানের শাটার উঠছে, রাস্তায় মানুষের চলাচল বাড়ছে, আর ইতিহাস নীরবে লিখে চলেছে নতুন অধ্যায়। সেই অধ্যায়ের শিক্ষা স্পষ্ট—কোনো শক্তিশালী রাষ্ট্রের পরিকল্পনা যত নিখুঁতই মনে হোক, জনগণের আত্মমর্যাদা, জাতীয় স্বার্থ ও কৌশলগত ধৈর্যকে উপেক্ষা করলে বিজয়ের অঙ্ক শেষ পর্যন্ত পরাজয়ের গল্প হয়ে যেতে পারে।
*[ লেখক: অধ্যাপক এম এ বার্ণিক একজন উচ্চমার্গের প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ও আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক পর্যবেক্ষক ]*