মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:১৪ পূর্বাহ্ন

শিরোনাম
মাগুরায় শ্রীপুর উপজেলায় জাতীয় কন্যাশিশু দিবস পালি বিজ্ঞানের জয়যাত্রা: মিরপুরে প্যারাডাইজ ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে বিজ্ঞান মেলা ২০২৬ অনুষ্ঠিত মাগুরায় চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং টার্মিনাল ইজারা চুক্তি বাতিলের দাবিতে বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত মাগুরার শ্রীপুরে নবাগত ইউএনও’র সাথে প্রেস ক্লাবের সাংবাদিকদের মতবিনিময় অনুষ্ঠিত জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের প্রধান আইন বিষয়ক উপদেষ্টা হলেন মাগুরার অ্যাড. কাজী আব্দুর রশিদ Five Historic Challenges Facing Tarique Rahman* *— Professor M. A. Barnik তারেক রহমানের পাঁচটি ঐতিহাসিক চ্যালেঞ্জ* *— অধ্যাপক এম এ বার্ণিক* মাগুরায় শিশু একাডেমির আয়োজনে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন   মাগুরায় আর্দশ শিক্ষক ফেডারেশনের আয়োজনে বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালিত মাগুরায় ৮ হাজার ইয়াবা ও নারীসহ ৩ মাদক কারবারি আচক! টাকা ও বাইক জব্দ!

ডোনার ফ্যাটিগ : বিশ্বের যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকায় মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা উত্তরণের প্রস্তাব —-অধ্যাপক এম এ বার্ণিক

সংবাদদাতা / ২৩৪ বার ভিউ
সময়ঃ মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:১৪ পূর্বাহ্ন

১. ভূমিকা :

২১শ শতাব্দীতে বিশ্ব রাজনীতি, সংঘাত ও মানবিক বিপর্যয়ের চিত্র ক্রমশ জটিল হয়ে উঠছে। গাজা থেকে সুদান, ইউক্রেন থেকে ইয়েমেন—প্রায় প্রতিটি মহাদেশেই মানবিক সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। দক্ষিণ এশিয়াতেও মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ ও রোহিঙ্গা সংকট মানবিক বিপর্যয়কে আরও ঘনীভূত করেছে। এই প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থাগুলো “ডোনার ফ্যাটিগ” বা দাতাদের ক্লান্তি নামক এক নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত, ক্রমাগত অর্থনৈতিক মন্দা এবং দাতাদের আগ্রহহীনতার কারণে যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকাগুলোতে মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা তীব্র হচ্ছে।

২. ডোনার ফ্যাটিগ —- ধারণা ও প্রেক্ষাপট :

“Donor Fatigue” বলতে বোঝায়—একটি দীর্ঘস্থায়ী সংকট বা ধারাবাহিক দুর্যোগে আন্তর্জাতিক দাতাগোষ্ঠী বা রাষ্ট্রগুলোর অনুদান দেওয়ার আগ্রহ ও সামর্থ্যের হ্রাস পাওয়া। এর মূল কারণগুলো হলো—

(১). সংঘাতের দীর্ঘস্থায়িত্ব : যেমন গাজা বা সিরিয়ার যুদ্ধ বহু বছর ধরে চলছে।

(২). অর্থনৈতিক চাপ : বৈশ্বিক মন্দা, খাদ্য ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, মুদ্রাস্ফীতি।

(৩). রাজনৈতিক অগ্রাধিকার পরিবর্তন : দাতা দেশগুলো নিজেদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকট মোকাবেলায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

(৪). সাহায্যের অকার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন : দুর্নীতি, অদক্ষতা ও সহায়তার ভুল বণ্টনের অভিযোগে অনেক দাতা হতাশ হয়ে যায়।

 

 

৩. বিশ্বব্যাপী যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে প্রভাব :

(১). গাজা : ইসরায়েলি অবরোধ ও যুদ্ধ পরিস্থিতিতে খাদ্য, ওষুধ ও আশ্রয়ের তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে। ডোনার ফ্যাটিগ বাড়লে গাজার লাখো মানুষের জীবন আরও বিপন্ন হবে।

(২). সুদান : গৃহযুদ্ধের কারণে লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত। খাদ্য নিরাপত্তা চরমভাবে হুমকির মুখে?

(৩). ইউক্রেন : দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ পশ্চিমা সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। তবে সহায়তার ধীরগতি জনগণের জীবনমানকে প্রভাবিত করছে।

(৪). ইয়েমেন : এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধে শিশুমৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি। এখানে সহায়তা কমে গেলে দুর্ভিক্ষ ভয়াবহ রূপ নেবে।

(৫). মিয়ানমার ও রোহিঙ্গা সংকট : সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে গৃহযুদ্ধে দেশটি ভেঙে পড়ার পথে। লাখো সাধারণ মানুষ গৃহহীন ও ক্ষুধার্ত। একই সঙ্গে বাংলাদেশের কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়া প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী আন্তর্জাতিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু ডোনার ফ্যাটিগের কারণে ত্রাণ তহবিল সংকুচিত হচ্ছে। জাতিসংঘ ইতিমধ্যে সতর্ক করেছে, পর্যাপ্ত অনুদান না পেলে রোহিঙ্গাদের খাদ্য রেশন অর্ধেক করতে হবে, যা এক ভয়াবহ মানবিক সংকট তৈরি করবে।

 

৪. ধনী দেশগুলোর ভূমিকা :

যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকায় মানবিক বিপর্যয় রোধে ধনী ও উন্নত দেশগুলোর ভূমিকা অপরিহার্য। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে—

(১). বাজেটের অগ্রাধিকার বদল : উন্নত দেশগুলো প্রতিরক্ষা ও সামরিক ব্যয়ে বিপুল অর্থ খরচ করছে, অথচ মানবিক সহায়তা তহবিলে বরাদ্দ কমাচ্ছে।

(২). রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব : অনেক সময় সহায়তা বণ্টন হয় রাজনৈতিক স্বার্থে; একটি অঞ্চলে বিপুল সহায়তা দেওয়া হলেও অন্য অঞ্চলে সহায়তা সীমিত থাকে। যেমন—ইউক্রেনে বিপুল সহায়তা দেওয়া হলেও ইয়েমেন বা গাজা তুলনামূলকভাবে উপেক্ষিত।

(৩). শরণার্থী নীতি : ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার অনেক দেশ নিজ ভূখণ্ডে শরণার্থী গ্রহণে অনীহা প্রকাশ করে, অথচ সংকটাপন্ন প্রতিবেশী দেশগুলো (বাংলাদেশ, লেবানন, জর্ডান ইত্যাদি) বোঝা বহন করছে।

(৪). অর্থনৈতিক সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও সীমিত অবদান : বৈশ্বিক জিডিপির বড় অংশ নিয়ন্ত্রণকারী দেশগুলো যদি মোট জাতীয় আয়ের (GNI) মাত্র ০.৭% মানবিক সহায়তায় ব্যয় করত, তবে বিশ্বের কোনো যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চল খাদ্যাভাব বা ওষুধ সংকটে পড়ত না।

৫. মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা :

খাদ্য, পানি ও চিকিৎসা সেবার ঘাটতি

শিশুমৃত্যু, মহামারির ঝুঁকি বৃদ্ধি

ব্যাপক বাস্তুচ্যুতি ও শরণার্থী সংকট

স্থানীয় অর্থনীতির পতন ও সামাজিক ভাঙন

সীমান্তবর্তী দেশগুলোর ওপর চাপ বৃদ্ধি (যেমন বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বোঝা)

 

৬. সমস্যা সমাধানের বাস্তবসম্মত উপায় :

(১). সহায়তার বিকেন্দ্রীকরণ : কেবল বড় দাতাদের ওপর নির্ভর না করে আঞ্চলিক শক্তি, ব্যক্তিগত দাতা ও প্রবাসী কমিউনিটিকে সম্পৃক্ত করা।

(২). স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা : দুর্নীতি ও অপব্যবহার রোধে ডিজিটাল ট্র্যাকিং সিস্টেম চালু করা।

(৩). দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা : শুধু ত্রাণ নয়, স্থানীয় উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ করা।

(৪). বৈশ্বিক কূটনীতি জোরদার : জাতিসংঘ, ওআইসি, আসিয়ান, আফ্রিকান ইউনিয়ন ও ইইউকে আরও সক্রিয়ভাবে শান্তি প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে আসতে হবে।

(৫). ধনী দেশগুলোর বাধ্যবাধকতা : উন্নত দেশগুলোকে জিডিপির নির্দিষ্ট অংশ মানবিক সহায়তায় বরাদ্দ করতে বাধ্য করার মতো বৈশ্বিক কাঠামো তৈরি করা।

(৬). জনসচেতনতা বৃদ্ধি : গণমাধ্যম ও সামাজিক প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে দাতাদের অনুপ্রাণিত করা।

(৭). বিকল্প অর্থায়ন পদ্ধতি : ইসলামি ওয়াকফ, সামাজিক বন্ড, ক্রাউডফান্ডিং ইত্যাদি উদ্ভাবনী উপায় প্রয়োগ।

 

৭. সামরিক সহয়তা নয় মানবিক সহায়তা জরুরি :

ডোনার ফ্যাটিগ কেবল অর্থনৈতিক বা কূটনৈতিক সমস্যা নয়; এটি মানবতার অস্তিত্ব সংকটের প্রশ্ন। গাজা, ইয়েমেন, সুদান, ইউক্রেন কিংবা মিয়ানমারের সংকট—সব ক্ষেত্রেই ধনী দেশগুলোর ভূমিকা নির্ণায়ক। যদি তারা সামরিক ব্যয় কমিয়ে মানবিক সহায়তা বৃদ্ধি না করে, তবে কোটি কোটি মানুষ খাদ্য, চিকিৎসা ও আশ্রয় থেকে বঞ্চিত হবে। বিশেষত মিয়ানমার ও রোহিঙ্গা সংকট দক্ষিণ এশিয়ায় নিরাপত্তাহীনতা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য ভয়াবহ হুমকি হয়ে উঠতে পারে। তাই মানবতার স্বার্থে এখনই কার্যকর, ন্যায্য ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নিশ্চিত করা জরুরি।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


[prayer_time pt="on" sc="on"]