বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬, ১২:৩২ পূর্বাহ্ন
২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনন্য ঘটনা। শেখ হাসিনার দীর্ঘমেয়াদি ফ্যাসিবাদী শাসনের পতনের মাধ্যমে জনগণের আন্দোলন বিজয় ছিনিয়ে আনে। কিন্তু আজ সেই বিপ্লব-উত্তর বাস্তবতায় আমরা দেখতে পাচ্ছি—যে রাজনৈতিক কাঠামো ভাঙার জন্য রক্ত ঝরেছিল, সেটি আসলে অক্ষত অবস্থায় রয়ে গেছে। রাষ্ট্রপতি চুপ্পু, সেনাপ্রধান ওয়াকার ও প্রশাসনিক মহলের মূল চালিকাশক্তি অপরিবর্তিত থাকায় জনগণ প্রত্যাশিত রূপান্তর থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে ভিপি নূরের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ২০১৮ সালের কোটা আন্দোলন থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের পুনঃপ্রতিষ্ঠিত কোটা আন্দোলন পর্যন্ত তিনি ছিলেন ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের মুখ। শেখ হাসিনার পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা ছিল— একটি বিপ্লবী সরকার গঠন, জুলাই সনদের বাস্তবায়ন, গণপরিষদ নির্বাচন এবং নতুন সংবিধান প্রণয়ন। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার বিপ্লবের এজেন্ডা পাশ কাটিয়ে কেবল নির্বাচন আয়োজনের মাধ্যমে বিদায় নেওয়ার কৌশল নেয়।
এখানেই রাজনৈতিক সংকটের মূল নিহিত। বিপ্লব কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন নয়; বিপ্লবের সারবত্তা হলো রাষ্ট্র কাঠামোর পরিবর্তন। যদি সেই কাঠামো অপরিবর্তিত থাকে, তবে পুরনো ফ্যাসিবাদ পুনরায় মাথাচাড়া দেবে। এই আশঙ্কা আজ বাস্তবে রূপ নিচ্ছে। জাতীয় পার্টি ও ১৪ দলকে ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক পুনর্বাসনের প্রচেষ্টা চলছে, যেটি ভারতের সক্রিয় ভূমিকার সঙ্গে সম্পৃক্ত। ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ বিপ্লবী চেতনা ভেঙে দেওয়ার পরিকল্পনায় মাঠে নামছে—এর প্রথম লক্ষ্য ছিল ভিপি নূর।
২৯ আগস্ট ভিপি নূরের ওপর হামলা প্রমাণ করে, রাষ্ট্রযন্ত্রের একটি অংশ এখনো ফ্যাসিবাদের অনুগত। সামরিক ও পুলিশি শক্তি যদি বিপ্লবী নেতৃত্বকে দমন করতে উদ্যত হয়, তবে জুলাই বিপ্লবের অন্য নেতারাও একই পরিণতির শিকার হবেন। ভিপি নূর আজ প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছেন—বিপ্লবী সরকার ছাড়া কোনো বিপ্লব টেকসই হয় না।
ড. মুহাম্মদ ইউনূস কিংবা বিএনপি—দু’পক্ষই জুলাই বিপ্লব থেকে রাজনৈতিক সুবিধা পেয়েছে, কিন্তু তারা কখনো বিপ্লবী সরকার গঠনের দাবি তোলে নি। কারণ, বিপ্লবী সরকার মানে রাষ্ট্রকাঠামোর মৌলিক পরিবর্তন, যা তাদের ক্ষমতার গাণিতিক সমীকরণকে অস্থির করে তুলবে। তাই বিপ্লবের মূল নায়কদের সামনে এখন দ্বৈত চ্যালেঞ্জ:
১. পুরনো ফ্যাসিবাদী শক্তির পুনঃপ্রতিষ্ঠা ঠেকানো;
২. এবং একটি সত্যিকারের বিপ্লবী সরকার প্রতিষ্ঠা করা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষণে বলা যায়—জুলাই বিপ্লব আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। যদি বিপ্লবী সরকার গঠন না হয়, তবে বিপ্লবের নায়কদের ভবিষ্যৎ হবে ভিপি নূরের মতো—আক্রমণের শিকার, নিঃশেষ এবং ইতিহাসে হারিয়ে যাওয়া। আর যদি বিপ্লবী সরকার প্রতিষ্ঠা হয়, তবে বাংলাদেশের রাষ্ট্র কাঠামোতে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।