রবিবার, ৩০ অগাস্ট ২০২৬, ০১:৩২ অপরাহ্ন
১. পটভূমি* : পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিসেবে জনাব হুমায়ুন কবির যোগদানের পরপরই
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা নীতিতে একটি নতুন কৌশলগত বাঁক দৃশ্যমান হচ্ছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রী খলিলুর রহমান কিংবা প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদের আবস্থানের মধ্যেই জনাব হুমায়ুন কবির চমক দেখাতে শুরু করেন। চমক নিয়েই তিনি এখন সৌদি আরবে অবস্থান করছেন। সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের উদ্যোগে গঠিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশের সম্ভাব্য যোগদানের আলোচনা কেবল একটি সামরিক চুক্তিতে অংশগ্রহণের প্রশ্ন নয়; এর মধ্য দিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার প্রচলিত India-centric security architecture-এর বাইরে একটি বিকল্প কৌশলগত পরিসর তৈরির সম্ভাবনাও উন্মোচিত হচ্ছে। এটির কারিগর হতে চলছেন জনাব হুমায়ুন কবির।
বাংলাদেশ এখনো চুক্তিতে যোগ দেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি। তবে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির জানিয়েছেন, বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্য থাকলে এ ধরনের নিরাপত্তা কাঠামোয় অংশগ্রহণকে ইতিবাচকভাবে দেখা হচ্ছে। অন্যদিকে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল স্পষ্ট করেছেন, নয়াদিল্লি এমন সব উন্নয়ন নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে, যার জাতীয় নিরাপত্তার ওপর প্রভাব রয়েছে।
*২. নতুন কৌশলগত বাস্তবতা* :
১৯৭১-এর পর বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে এমন একটি পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করেছে, যেখানে কোনো একক শক্তির বলয়ে আবদ্ধ না থেকে ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, মধ্যপ্রাচ্য ও অন্যান্য শক্তির সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা হয়েছে। কিন্তু পরিবর্তিত বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক বাস্তবতায় ঢাকা এখন সেই ভারসাম্যকে আরও বহুমাত্রিক করতে চাইছে।
মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সমন্বয় নিজেই একটি নতুন নিরাপত্তা-সমীকরণ তৈরি করেছে। বাংলাদেশের সম্ভাব্য অন্তর্ভুক্তি হলে এই কাঠামো দক্ষিণ এশিয়ার পূর্বাঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত হওয়ার একটি নতুন মাত্রা পাবে।
এখানেই India-centric security architecture-এর সম্ভাব্য অবসানের সূচনা নিহিত।
*৩. ভারতের একক কৌশলগত প্রভাবের বাইরে বাংলাদেশ* :
বাংলাদেশ যদি এই প্রতিরক্ষা কাঠামোর অংশ হয়, তাহলে ঢাকার নিরাপত্তা-সম্পর্ক শুধু ভারতকেন্দ্রিক ভৌগোলিক বাস্তবতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। তুরস্কের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, পাকিস্তানের সামরিক সক্ষমতা এবং সৌদি আরবের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি বাংলাদেশের জন্য নতুন অংশীদারিত্বের ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে।
এর অর্থ ভারত-বিরোধী কোনো সামরিক জোটে বাংলাদেশের প্রবেশ—এমন সরল সমীকরণ নয়। বরং এর অর্থ হলো, বাংলাদেশ তার জাতীয় নিরাপত্তার জন্য একাধিক কৌশলগত বিকল্প তৈরি করতে চাইছে।
এই পরিবর্তন ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বাংলাদেশের নিরাপত্তা-সমীকরণে নতুন রাষ্ট্র ও নতুন প্রতিরক্ষা-অভিনেতাদের উপস্থিতি ভারতের প্রচলিত প্রভাবের পরিসরকে স্বাভাবিকভাবেই পুনর্মূল্যায়নের মুখে ফেলবে।
*৪. বঙ্গোপসাগর থেকে বৃহত্তর মুসলিম বিশ্বের দিকে কৌশলগত বিস্তার* :
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এই পরিবর্তনকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। বঙ্গোপসাগরের উত্তর প্রান্তে অবস্থিত বাংলাদেশ যদি পশ্চিম এশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়ার নতুন প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হয়, তাহলে নিরাপত্তা-সমীকরণে একটি Gulf–South Asia–Bay of Bengal strategic linkage তৈরি হতে পারে।
এটি এখনো সম্ভাবনা; বাস্তব সামরিক ব্যবস্থা নয়। কিন্তু প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ, সামরিক সহযোগিতা ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা সহযোগিতা ভবিষ্যতে বিস্তৃত হলে ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় নিরাপত্তা পরিকল্পনায় নতুন হিসাব যুক্ত হবে।
*৫. ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির বাস্তব পরীক্ষা* :
এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—দেশটি কি নিজের জাতীয় স্বার্থকে সামনে রেখে বহুমুখী কৌশলগত অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে পারবে?
*৬. মক্কা চুক্তিতে যোগদান* : বাংলাদেশের জন্য যেমন নতুন কৌশলগত সুযোগ তৈরি করতে পারে, তেমনি এর সঙ্গে সামরিক দায়বদ্ধতার প্রশ্নও রয়েছে। চুক্তির collective-defence ধারণার কারণে কোনো সদস্য রাষ্ট্রের ওপর আক্রমণ ঘটলে অন্য সদস্যদের কী ধরনের দায়িত্ব তৈরি হবে—এটি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
অতএব, কেবল ভারতীয় প্রতিক্রিয়া বিবেচনা করে নয়, বাংলাদেশের নিজস্ব জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনীতি, কূটনৈতিক স্বাধীনতা ও দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
*৭. ভারতের জন্য বার্তাটি কী?*
বাংলাদেশের সম্ভাব্য পদক্ষেপকে ভারতের বিরুদ্ধে সরাসরি বৈরিতার ঘোষণা হিসেবে দেখা ভুল হবে। কিন্তু এটি দিল্লির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত বার্তা—বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি আর কোনো একক আঞ্চলিক শক্তির নিরাপত্তা-দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না।
ভারতের জন্য নতুন বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশ তার কৌশলগত অংশীদারিত্বের পরিধি পশ্চিম এশিয়া, তুরস্ক ও পাকিস্তান পর্যন্ত বিস্তৃত করতে চাইতে পারে। ভারতীয় কৌশলগত বিশ্লেষণেও এই পরিবর্তনকে পূর্বাঞ্চলীয় নিরাপত্তা-পরিসরে নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
*৮. স্বাধীন সামরিক নিরাপত্তা কাঠামোর প্রত্যাশা*
বাংলাদেশ যদি মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যোগ দেয়, তাহলে এর তাৎপর্য শুধু একটি নতুন সামরিক জোটে সদস্যপদ অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এটি বাংলাদেশের পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা নীতিতে strategic diversification-এর একটি দৃশ্যমান পদক্ষেপ হয়ে উঠতে পারে।
আর সেই কারণেই বিষয়টি ভারতের কাছে এত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা-স্থাপত্যে একটি নতুন সমীকরণ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে—যেখানে ভারত আর একমাত্র কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা-অভিনেতা নয়; বরং বাংলাদেশ একাধিক শক্তির সঙ্গে নিজস্ব স্বার্থভিত্তিক কৌশলগত সম্পর্ক গড়ে তুলবে।
সুতরাং, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশের সম্ভাব্য যোগদানকে শুধু একটি সামরিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত কৌশলগত তাৎপর্য অনুধাবন করা যাবে না। এটি হতে পারে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা—যেখানে “India-centric security architecture”-এর পরিবর্তে বাংলাদেশ নিজের জাতীয় স্বার্থকে কেন্দ্র করে একটি বহুমাত্রিক, ভারসাম্যপূর্ণ ও অধিকতর স্বাধীন নিরাপত্তা কাঠামোর দিকে এগিয়ে যাবে।
*[ অধ্যাপক এম এ বার্ণিক : স্বনামধন্য সামরিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক এবং কৌশলগত আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির পর্যবেক্ষক ]*