শুক্রবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৬, ০৬:০৩ অপরাহ্ন

শিরোনাম
আজকের মেধাবী শিক্ষার্থীরাই আগামী দিনের সমৃদ্ধ – মাগুরায় কৃতি শিক্ষার্থী সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে নূরুল ইসলাম সাদ্দাম Macca Defence Pact: A Severe Setback to India’s Strategic Calculations* *— Professor MA Barnik *মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি : ভারতের স্ট্র্যাটেজিক হিসাব-নিকাশে বড় ধরনের ধাক্কা— অধ্যাপক এম এ বার্ণিক মাগুরার শ্রীপুরে বিদ্যুতায়িত হয়ে এক যুবকের মৃত্যু, আহত আরো -২জন চাটমোহরে তেল-জেলিতে তৈরি হচ্ছিল নকল দুধ, ভ্রাম্যমাণ আদালতে কারাদণ্ড ও জরিমানা The Mecca Defence Pact: India’s Concerns, the Positions of Major Powers, and Bangladesh’s Potential Gains and Losses* *–Professor M. A. Barnik মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি: ভারতের উদ্বেগ, পরাশক্তিদের অবস্থান এবং বাংলাদেশের সম্ভাব্য লাভ-ক্ষতি* *—অধ্যাপক এম এ বার্ণিক* কেন্দ্রীয় যুবদলের সিনিয়র সহ-সভাপতি পলের রোগমুক্তিতে এস. আলম ইসরাৎ এর উদ্যোগে দোয়া আন্দালিব রহমান পার্থকে তথ্যমন্ত্রী করায় চট্টগ্রাম প্রেসক্লাব নেতৃবৃন্দকে মিষ্টিমুখ করালো বিজেপি ভাষা সৈনিক অজিত গুহ মহাবিদ্যালয়ে পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা:) উদযাপন

*মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি : ভারতের স্ট্র্যাটেজিক হিসাব-নিকাশে বড় ধরনের ধাক্কা— অধ্যাপক এম এ বার্ণিক

সংবাদদাতা / ৫ বার ভিউ
সময়ঃ শুক্রবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৬, ০৬:০৩ অপরাহ্ন

১. ভূমিকা : একটি নতুন জোট, ভারতের নতুন হিসাব*

৭ আগস্ট ২০২৬ পবিত্র মক্কায় সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। চুক্তিটির মূল নীতি হলো—তিন দেশের কোনো একটির ওপর সশস্ত্র আক্রমণ হলে তা অন্য দুই দেশের বিরুদ্ধেও আক্রমণ হিসেবে বিবেচিত হবে। এ কারণেই অনেকে একে ন্যাটোর Article 5-ধরনের সম্মিলিত প্রতিরক্ষা কাঠামোর সঙ্গে তুলনা করছেন।

চুক্তিতে ভারতের নাম নেই। এটি সরাসরি ভারতবিরোধী চুক্তি বলেও আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়নি। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও বলেছে, চুক্তিটি প্রতিরক্ষামূলক এবং কোনো দেশের বিরুদ্ধে পরিচালিত নয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জাতীয় নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপর এর প্রভাব মূল্যায়নের কথা জানিয়েছে। এখানেই বোঝা যায়—দিল্লির উদ্বেগ কেবল চুক্তির লিখিত ভাষা নিয়ে নয়; বরং এর সম্ভাব্য ভূরাজনৈতিক পরিণতি নিয়ে।

*২. পাকিস্তানকে ঘিরেই ভারতের প্রধান উদ্বেগ*

ভারতের প্রথম এবং সবচেয়ে বড় উদ্বেগ পাকিস্তানকে নিয়ে। ভারত ও পাকিস্তানের দীর্ঘস্থায়ী দ্বন্দ্ব, কাশ্মীর প্রশ্ন, সীমান্ত উত্তেজনা এবং সামরিক প্রতিযোগিতার বাস্তবতায় পাকিস্তানের আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা-সমর্থন ভারতের কাছে সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

এখন পাকিস্তান একটি আনুষ্ঠানিক প্রতিরক্ষা কাঠামোর মধ্যে সৌদি আরব ও তুরস্কের সঙ্গে যুক্ত হলো। তুরস্কের রয়েছে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা শিল্প, আধুনিক ড্রোন প্রযুক্তি ও সামরিক সক্ষমতা; অন্যদিকে সৌদি আরবের রয়েছে বিপুল অর্থনৈতিক সামর্থ্য ও মধ্যপ্রাচ্যে রাজনৈতিক প্রভাব। এই দুই শক্তির সঙ্গে পাকিস্তানের আনুষ্ঠানিক প্রতিরক্ষা সম্পর্ক ভারতের কৌশলগত হিসাবকে অবশ্যই নতুনভাবে সাজাতে বাধ্য করবে।

*৩. পাকিস্তানের কৌশলগত আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা*

ভারতের আরেকটি আশঙ্কা হলো, নতুন প্রতিরক্ষা কাঠামো পাকিস্তানের রাজনৈতিক ও কৌশলগত আত্মবিশ্বাস বাড়াতে পারে। ভবিষ্যতে ভারত-পাকিস্তান সংকট সৃষ্টি হলে ইসলামাবাদ হয়তো ধরে নিতে পারে যে, সৌদি আরব ও তুরস্কের সঙ্গে তার আনুষ্ঠানিক প্রতিরক্ষা সম্পর্ক তাকে অতিরিক্ত কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক বা সামরিক সুবিধা দিতে পারে।

চুক্তির প্রতিরক্ষা ধারা ভারত-পাকিস্তান সংঘাতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হবে কি না, তা স্পষ্ট নয়। তবে দিল্লির উদ্বেগ সম্ভবত এখানেই যে, যুদ্ধের সময় চুক্তির আইনি ধারা যতটা গুরুত্বপূর্ণ, যুদ্ধের আগে প্রতিপক্ষের কৌশলগত আত্মবিশ্বাসও ততটাই গুরুত্বপূর্ণ। নতুন মিত্রতার ধারণা পাকিস্তানের সংকটকালীন সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব ফেলতে পারে।

*৪. পাকিস্তান-তুরস্ক সামরিক সম্পর্ক ভারতের বিশেষ উদ্বেগের কারণ*

ভারতের কাছে তুরস্কের বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্প দ্রুত শক্তিশালী হয়েছে। ড্রোন, ইলেকট্রনিক যুদ্ধব্যবস্থা, ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি এবং প্রতিরক্ষা উৎপাদনে তুরস্ক নতুন সক্ষমতা অর্জন করেছে।

পাকিস্তান ও তুরস্কের ঘনিষ্ঠ সামরিক সহযোগিতা যদি মক্কা চুক্তির মাধ্যমে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে, তবে ভারতকে প্রযুক্তিগত ও সামরিক ভারসাম্যের প্রশ্নে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। ভারতের উদ্বেগ তাই শুধু একটি সামরিক জোট নিয়ে নয়; বরং সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ, গোয়েন্দা সহযোগিতা এবং অস্ত্র-সহযোগিতার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়েও।

*৫. সৌদি আরবের ভূমিকা : অর্থনৈতিক শক্তি থেকে কৌশলগত শক্তিতে*

সৌদি আরব ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদার। জ্বালানি নিরাপত্তা, বিনিয়োগ, বাণিজ্য এবং ভারতীয় প্রবাসী—সব মিলিয়ে ভারত-সৌদি সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কিন্তু এখন সৌদি আরব পাকিস্তানের সঙ্গে একটি যৌথ প্রতিরক্ষা কাঠামোয় যুক্ত হওয়ায় ভারতের সামনে একটি নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। দিল্লি নিশ্চয়ই প্রশ্ন করবে—দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনা দেখা দিলে রিয়াদ কতটা নিরপেক্ষ থাকতে পারবে?

যদিও ভারতের সঙ্গে সৌদি আরবের শক্তিশালী অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে এবং এই সম্পর্ককে কেবল পাকিস্তান-কেন্দ্রিক দৃষ্টিতে দেখার সুযোগ নেই, তবুও প্রতিরক্ষা জোটের রাজনৈতিক প্রতীকী মূল্য ভারতের জন্য উপেক্ষা করা কঠিন।

*৬. ‘ইসলামিক ন্যাটো’ ধারণা ও ভারতের সতর্কতা*

মক্কা চুক্তিকে অনেকে ‘ইসলামিক ন্যাটো’ হিসেবে আখ্যায়িত করলেও বাস্তবে এটি এখনো ন্যাটোর মতো পূর্ণাঙ্গ সামরিক জোট নয়। এর কোনো একীভূত সামরিক কমান্ড, অভিন্ন প্রতিরক্ষা বাজেট বা স্বয়ংক্রিয় যুদ্ধ পরিচালনার কাঠামো প্রকাশ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

তবুও তিনটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রের সম্মিলিত সামরিক শক্তি একটি নতুন নিরাপত্তা কাঠামোর ইঙ্গিত বহন করে। ভারত বিশেষভাবে লক্ষ্য রাখবে—ভবিষ্যতে এ জোটে অন্য রাষ্ট্র যুক্ত হয় কি না। সদস্যসংখ্যা বাড়লে এর রাজনৈতিক ও সামরিক গুরুত্বও বহুগুণ বৃদ্ধি পেতে পারে।

*৭. মধ্যপ্রাচ্য থেকে দক্ষিণ এশিয়া : নিরাপত্তা সংকটের বিস্তার*

চুক্তিটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক দিক হলো—মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা সমীকরণের সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা সমীকরণ এখন আরও সরাসরি যুক্ত হতে পারে।

সৌদি আরবের নিরাপত্তা সংকট, ইরানকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা, তুরস্কের আঞ্চলিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং পাকিস্তানের দক্ষিণ এশীয় নিরাপত্তা স্বার্থ—সব মিলিয়ে একটি বিস্তৃত কৌশলগত বলয় তৈরি হতে পারে।

ভারতের জন্য এর অর্থ হলো, ভবিষ্যতের কোনো ভারত-পাকিস্তান সংকট আর কেবল দ্বিপক্ষীয় বা দক্ষিণ এশীয় সংকট নাও থাকতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের শক্তিগুলোও তখন কূটনৈতিকভাবে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

*৮. ভারতের পররাষ্ট্রনীতির সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ*

ভারত দীর্ঘদিন ধরে একাধিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা করে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, রাশিয়ার সঙ্গে ঐতিহাসিক সামরিক সম্পর্ক, ইসরায়েলের সঙ্গে প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি এবং সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব—এই বহুমুখী কূটনীতি ভারতের বড় শক্তি।

কিন্তু মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি ভারতের সামনে নতুন প্রশ্ন তুলেছে—পাকিস্তানকে একটি প্রতিরক্ষা কাঠামোর অংশীদার হিসেবে গ্রহণ করেও সৌদি আরব ও তুরস্কের সঙ্গে ভারত কীভাবে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখবে?

অতএব ভারতের সম্ভাব্য নীতি হবে—সরাসরি বিরোধিতা নয়, বরং গভীর পর্যবেক্ষণ, কৌশলগত সতর্কতা এবং সক্রিয় কূটনৈতিক সম্পৃক্ততা। কারণ চুক্তিটিকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দিলে যেমন আতঙ্ক সৃষ্টি হতে পারে, তেমনি একে উপেক্ষা করাও ভারতের জন্য বাস্তবসম্মত হবে না।

*৯. বাংলাদেশ প্রসঙ্গ : ঢাকার জন্য শিক্ষণীয় বার্তা*

মক্কা চুক্তি দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা কাঠামোয় নতুন সম্ভাবনা ও নতুন চাপ—দুই-ই সৃষ্টি করতে পারে। বাংলাদেশ যদি ভবিষ্যতে এ ধরনের কোনো নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হওয়ার বিষয় বিবেচনা করে, তাহলে ভারতের উদ্বেগও বাংলাদেশের কূটনৈতিক সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হবে—কোনো প্রতিরক্ষা কাঠামোয় যুক্ত হওয়া দেশের নিরাপত্তা বাড়াবে, নাকি বহুপক্ষীয় ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নতুনভাবে জড়িয়ে ফেলবে?

বাংলাদেশের সম্ভাব্য সম্পৃক্ততার প্রশ্নটি ইতোমধ্যে ভারতসহ আঞ্চলিক সম্পর্কের ভারসাম্য নিয়ে আলোচনা সৃষ্টি করেছে। তাই ঢাকার যেকোনো সিদ্ধান্তে জাতীয় নিরাপত্তার পাশাপাশি প্রতিবেশী সম্পর্ক, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির ভারসাম্যকে গুরুত্ব দিতে হবে।

*১০. ভারতের বিরোধিতার চেয়ে বড় বিষয় কৌশলগত উদ্বেগ*

মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির প্রতি ভারতের অবস্থানকে কেবল ‘বিরোধিতা’ হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়বে না। ভারতের আসল উদ্বেগ হলো—পাকিস্তানকে ঘিরে নতুন শক্তির সমীকরণ, তুরস্কের সামরিক সক্ষমতার সম্ভাব্য ব্যবহার, সৌদি আরবের কৌশলগত অবস্থানের পরিবর্তন এবং মধ্যপ্রাচ্য-দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা ব্যবস্থার পারস্পরিক সংযোগ।

তবে আরেকটি বাস্তবতাও স্মরণ রাখতে হবে—মক্কা চুক্তি ভারতবিরোধী কোনো আনুষ্ঠানিক জোট হিসেবে ঘোষিত হয়নি এবং ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ শুরু হলেই সৌদি আরব ও তুরস্ক স্বয়ংক্রিয়ভাবে যুদ্ধে অংশ নেবে, এমন নিশ্চয়তাও নেই।

সুতরাং ভারতের সামনে এখন সবচেয়ে বড় কাজ হলো আতঙ্ক নয়, বিশ্লেষণ; আবেগ নয়, কৌশল; এবং প্রতিক্রিয়া নয়, সুপরিকল্পিত প্রস্তুতি। নতুন এই প্রতিরক্ষা সমীকরণ কত দূর যাবে, তার ওপর নির্ভর করবে দক্ষিণ এশিয়ার সামরিক ভারসাম্য।

*[ অধ্যাপক এম এ বার্ণিক : খ্যাতিমান প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ও ভূরাজনৈতিক পর্যবেক্ষক ]*


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


[prayer_time pt="on" sc="on"]