মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:৫৮ অপরাহ্ন
বুড়িগঙ্গার জল সেদিন অন্যরকম ছিল।
যেনো নদী ও জানত—দু’দিন পর মানুষের হাতে উঠবে ব্যালট, আর তার আগের রাতে মানুষের কণ্ঠে উঠবে ঢেউ।
১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৪।
সন্ধ্যার আলো গড়িয়ে পড়ছে সদরঘাটের সিঁড়িতে। জাহাজটা ছাড়ার আগেই মানুষের ভিড়ে কাঠের তক্তা হাঁপিয়ে উঠছে। কেউ হাতের ব্যাগ বুকে চেপে ধরেছে, কেউবা ছেলেমেয়েকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে—সবার চোখে একটাই গন্তব্য, একটাই তাড়া: ভোট।
আমার ভাতিজা ফারুকও তাদেরই একজন।
ঢাকা শহরে বড় হওয়া ছেলেটার বুকের ভেতর তখন গ্রামের মাটি ডাকছে। সে ‘ধানের শীষ’-এর অন্ধ সমর্থক—সে কথা সে লুকোয় না, ঢাকেও না। ভোলার লালমোহনে যাবে, ভোট দেবে—এই ছিল তার একমাত্র ধর্মকর্ম।
জাহাজ ছাড়লো।
বুড়িগঙ্গার বুক চিরে এগোতে লাগলো লোহার শরীর, আর মানুষের শরীর থেকে ছুটে এলো কণ্ঠস্বর। প্রথমে ফিসফাস, তারপর ফিসফাসের বুক ফাটিয়ে বেরিয়ে এলো স্লোগান—
“দাঁড়িপাল্লা! দাঁড়িপাল্লা!”
আকাশ যেনো থমকে দাঁড়ালো।
বাতাসও খানিকটা চমকে গেল।
জাহাজের ভেতর মুহূর্তেই উৎসব। কেউ হাততালি দিচ্ছে, কেউ মোবাইল তুলে ভিডিও করছে, কেউ আবার হাসছে—সে হাসিতে আনন্দ আছে, আবার একটু ভয়ও আছে।
ফারুক চুপ।
তার গলা শুকিয়ে এসেছে। ‘ধানের শীষ’ শব্দটা ঠোঁটের কাছে এসে বারবার ফিরে যাচ্ছে। সে চারদিকে তাকায়—সব চোখ একদিকে, সব কণ্ঠ এক সুরে। স্রোতের বিপরীতে দাঁড়ানো মানুষ যেমন নদীর মাঝখানে ভারসাম্য খোঁজে, ফারুকও তেমনই খুঁজছিল নিজের জায়গা।
ঠিক তখনই—
কোনো এক অদৃশ্য বুদ্ধির ঝাঁপটা এসে পড়লো তার মাথায়। সে হেসে উঠলো, একটু কাঁচা, একটু পাকা হাসি। তারপর বুক ভরে চিৎকার করলো—
“যখন যেমন, তখন তেমন—দাঁড়িপাল্লা! দাঁড়িপাল্লা!”
জাহাজ ফেটে পড়লো হাসিতে।
কেউ বললো, “এই তো ছেলে!”
কেউ বললো, “রাজনীতি বুঝে গেছে!”
আর নদী—নদী তখন নিঃশব্দে সব শুনে নিচ্ছে, কোনো পক্ষ নিচ্ছে না।
আমি দূরে দাঁড়িয়ে ভাবলাম—
মানুষের ভোটের চেয়ে তার কণ্ঠ বড়, তার টিকে থাকার বুদ্ধি বড়। প্রতীক বদলায়, স্লোগান বদলায়, কিন্তু মানুষের গন্তব্য একটাই—নিজের ঘরে ফেরা, নিজের অধিকার ছুঁয়ে দেখা।
সেই রাতে জাহাজ শুধু লালমোহনের দিকে যায়নি।
গিয়েছে মানুষের মনের ভেতর দিয়ে—যেখানে আদর্শ আর বাস্তবতা দাঁড়িপাল্লার দুই পাশে দুলছিল, আর মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিল ফারুকের মতো হাজারো মানুষ—
যারা জানে, নদীতে বাঁচতে হলে কখনো কখনো সাঁতার নয়, ভেসে থাকাটাই সবচেয়ে বড় কৌশল।