রবিবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:০৩ অপরাহ্ন
১. ভূমিকা: অভ্যুত্থান থেকে পূর্ণ বিপ্লবের পথে
২০২৪ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশের রাজনীতিতে সংঘটিত গণ-অভ্যুত্থান এক ঐতিহাসিক রাজনৈতিক সম্ভাবনার জন্ম দেয়। তরুণদের নেতৃত্ব, স্বতঃস্ফূর্ত গণঅংশগ্রহণ এবং রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিক্রিয়া—সব মিলিয়ে এটি ছিল এক সাহসী নবযাত্রা। কিন্তু বিপ্লবের সেই যাত্রা থমকে যায়, কারণ অভ্যুত্থানের পরে বিপ্লবী সরকার গঠনের মতো সুপরিকল্পিত কাঠামো ও রাজনৈতিক দৃঢ়তা অনুপস্থিত ছিল।
২. অন্তর্বর্তী সরকারের উপর দায়িত্ব চাপানো: রাজনৈতিক ভুল না কৌশলগত ব্যর্থতা?
জুলাই অভ্যুত্থানের নায়কেরা মুখে বলেছিলেন, “এই শাসন আর থাকবে না”—কিন্তু তাদের হাতে ছিল না কোনো কার্যকর রূপরেখা বা বিকল্প সরকার গঠনের রুপরূপ। তারা রাজনৈতিক ঐকমত্যের অজুহাতে অন্তর্বর্তী সরকারের উপর দায়িত্ব ঠেলে দেন, যা আদতে ছিল বিপ্লবী দায়িত্ব এড়ানোর একটি উপায়। অথচ ইতিহাস জানায়, বিপ্লবের ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে হলে নেতৃত্বকেই নিতে হয় সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব ও পরিকল্পনা থাকতে হবে।
৩. বিশ্ব ইতিহাসে সফল বিপ্লবের শিক্ষা: ঘোষণাপত্র, সনদ ও বিকল্প কাঠামোই নির্ধারণ করেছে ভবিষ্যৎ
বিপ্লব মানে কেবল একক শাসকের পতন নয়, বরং এক নতুন রাষ্ট্র, শাসনব্যবস্থা ও ন্যায়ের কাঠামোর জন্ম। এটি বিশ্ব ইতিহাসে একাধিকবার প্রমাণিত হয়েছে। যেমন:
🔹 ফরাসি বিপ্লব (১৭৮৯)
রাজতন্ত্রের পতনের পর বিপ্লবকারীরা ‘Declaration of the Rights of Man and of the Citizen’ ঘোষণা করে। এটি ছিল জনগণের মৌলিক অধিকার ও নতুন রাষ্ট্রচিন্তার ভিত্তি। গনতান্ত্রিক চেতনার ছত্রছায়ায় জাতীয় পরিষদ গঠন করে তারা নতুন সংবিধান রচনায় এগিয়ে যায়।
🔹 বলশেভিক বিপ্লব (১৯১৭)
লেনিন নেতৃত্বাধীন বলশেভিকরা জারতন্ত্র উৎখাত করেই থেমে থাকেনি। তারা “April Theses” ও “Decree on Peace, Land and Workers” প্রকাশ করে একটি বিপ্লবী সরকার গঠন করে যা শ্রমিক, কৃষক ও সৈনিকদের প্রতিনিধি ছিল। সোভিয়েত কাঠামো দ্বারা তারা বিকল্প রাষ্ট্র পরিচালনার চিত্র তুলে ধরে।
🔹 কিউবান বিপ্লব (১৯৫৯)
ফিদেল কাস্ত্রোর বিপ্লব সফল হওয়ার পরে অবিলম্বে ‘Provisional Government’ ঘোষণা করা হয় এবং রাষ্ট্রীয় সকল কাঠামো সমাজতান্ত্রিক রূপে পুনর্গঠন শুরু হয়। মার্কিন প্রভাবের বিরুদ্ধে জাতীয় স্বার্বভৌমতার প্রশ্নকে প্রথম সারিতে রাখা হয়।
> এই বিপ্লবগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে একটি মূল শিক্ষা—ঘোষণাপত্র ও বিকল্প শাসন কাঠামো ছাড়া কোনো বিপ্লব দীর্ঘস্থায়ী হয় না।
৪. ‘জুলাই সনদ’ ও ‘জুলাই ঘোষণাপত্র’-এর অভাব: বাংলাদেশের অভ্যুত্থান কেন হোঁচট খেল?
জুলাই অভ্যুত্থানের নায়কেরা আজও এমন কোনো ‘জুলাই সনদ’ বা ‘জুলাই ঘোষণাপত্র’ দিতে পারেননি, যা থেকে মানুষ জানতে পারবে—কী হবে নতুন রাষ্ট্রের কাঠামো, গণতন্ত্রের রূপ, অর্থনীতি ও বিচারব্যবস্থার রূপরেখা। এই শূন্যস্থানই অভ্যুত্থানকে ব্যর্থতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
> এখনো সময় আছে—এই বিপ্লবীদেরই দিতে হবে একটি স্পষ্ট ঘোষণাপত্র ও সনদ।
জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার নামে অন্যদের উপর দায়িত্ব চাপালে বিপ্লবের চেতনা আবারও বিকৃত হবে।
৫. ঘুরে দাঁড়ানোর পথ ও পরামর্শ: বিশ্ববিপ্লবের পথ অনুসরণ করে বাংলাদেশে বিপ্লবী প্রতিষ্ঠা
( ১)জুলাই সনদের প্রণয়ন ও প্রচার
বিপ্লবীদের উচিত অবিলম্বে একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক সনদ (July Charter) তৈরি করে জনতার সামনে উপস্থাপন করা—যেখানে থাকবে রাষ্ট্রীয় কাঠামো, বিচারপদ্ধতি, প্রশাসনিক সংস্কার, অর্থনৈতিক ন্যায্যতা, ভারতীয় প্রভাবমুক্তির রূপরেখা ও জনগণের অধিকারের স্পষ্ট সংজ্ঞা।
( ২) জুলাই ঘোষণাপত্রের মাধ্যমে বিকল্প সরকার গঠনের প্রস্তাব
এই ঘোষণাপত্রে অন্তর্বর্তী বিপ্লবী সরকারের প্রস্তাবনা তুলে ধরতে হবে, যা জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণে গঠিত হবে, এবং গণপরিষদের মাধ্যমে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।
( ৩) বিপ্লবী কাঠামোর প্রস্তুতি ও সাংগঠনিক পুনর্গঠন
বিভিন্ন জেলা, মহানগর ও ইউনিয়ন পর্যায়ে বিপ্লবী কমিটি গঠন করতে হবে, যারা স্থানীয় প্রশাসনের বিকল্প হিসেবে কাজ করবে: আইন সহায়তা, জনমত সংগঠন, খাদ্য ও নিরাপত্তা তদারকি।
(৪) রাষ্ট্রচিন্তা ও রাজনৈতিক শিক্ষা প্রসার
‘নতুন রাষ্ট্র কেমন হবে’—এ বিষয়ে নিরবচ্ছিন্ন আলোচনা, পাঠচক্র, জনগণের মাঝে ছোট-বড় প্রচারপত্র বিতরণ ও সামাজিক মাধ্যমে নীতিনির্ধারণী কনটেন্ট প্রচার অত্যন্ত জরুরি।
৬. উপসংহার: বিপ্লবের দায়িত্ব বিকল্পের ভিত গড়াই
আজকের বিপ্লবীরা যদি ইতিহাস না পড়ে, তবে তার পুনরাবৃত্তির শিকার হবে।
বিশ্ব ইতিহাসের সফল বিপ্লবগুলো আমাদের দেখায়—সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা, রাজনৈতিক ঘোষণা ও বিকল্প সরকার ছাড়া কোনো বিপ্লবই চূড়ান্ত মুক্তি দিতে পারেনি।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এখনও সম্ভব “জুলাই সনদ” ও “জুলাই ঘোষণাপত্র” প্রকাশ করে একটি বৈধ বিপ্লবী সরকার গঠন করা, যা হবে জনগণের আকাঙ্ক্ষার বাস্তব অনুবাদ।
এই দায়িত্ব এখন আর রাষ্ট্র কিংবা বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির নয়, বরং সরাসরি বিপ্লবী জনগণের নেতৃত্বের।
> তারা যদি এগিয়ে না আসে, তবে জুলাই অভ্যুত্থান হবে আরেকটি অমীমাংসিত ইতিহাস।