মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ১২:২৩ অপরাহ্ন
১. বিবেকের অগ্নিপরীক্ষা*:
একটি প্রস্তাব কখনও কখনও কেবল প্রস্তাব থাকে না—সে হয়ে ওঠে সময়ের দর্পণ, বোধের পরীক্ষা, আর বিবেকের অগ্নিপরীক্ষা।
সারাবিশ্বে একই দিনে রোজা ও ঈদ পালনের আহ্বান যখন এল, তখন অনেকে তা দেখলেন রাজনৈতিক ভাষ্য হিসেবে; আমি দেখলাম সভ্যতার সম্ভাবনা হিসেবে।
ঢাকা, মক্কা, মস্কো, নিউইয়র্ক, সিডনি—পৃথিবীর পাঁচ প্রান্তে পাঁচ ভিন্ন আকাশ, কিন্তু চাঁদ তো একটিই।
খ্রিস্টান বিশ্ব যেমন একই দিনে বড়দিন পালন করতে পারে, মুসলিম উম্মাহ কেন পারে না এক আকাশের নিচে এক তারিখে রোজা শুরু করতে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই আমি লিখেছিলাম একটি নিবন্ধ—আর তাতেই শুরু হলো সমালোচনার ঝড়।
*২. প্রশ্নের ফাঁদ, যুক্তির আলোকবর্তিকা*:
একজন টেলিভিশন সাংবাদিক আমাকে প্রশ্ন করলেন—
“আমরা কি সারাবিশ্বে একই সময়ে সালাত আদায় করি?”
প্রশ্নটি শুনে আমি বিস্মিত হইনি; বরং মৃদু হেসেছিলাম। কারণ, প্রশ্নটি ছিল তুলনার ছদ্মবেশে যুক্তির বিপথযাত্রা।
নামাজের সময় নির্ধারিত হয় সূর্যের গতিপথে—ফজরের আলো, যোহরের ছায়া, মাগরিবের অস্তরাগ।
কিন্তু রোজা ও ঈদের সূচনা নির্ভর করে চাঁদের দর্শনে—একটি জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক বাস্তবতায়।
সূর্য ও চাঁদের এই ভিন্ন মানদণ্ডকে এক কাঁধে তুলে প্রশ্ন করা মানে হলো দুই নদীর স্রোতকে এক মাপে মাপার চেষ্টা।
*৩. ১৯৮৬: আম্মানের সেই ঐতিহাসিক সম্মেলন*:
১৯৮৬ সালে জর্ডানের রাজধানী আম্মান-এ অনুষ্ঠিত হয়েছিল মুসলিম বিশ্বের ফিকাহবিদদের এক ঐতিহাসিক সমাবেশ—OIC-এর ফিকাহ একাডেমির অধিবেশন।
৫৭টি মুসলিম দেশের প্রতিনিধিরা সেখানে মিলিত হয়েছিলেন এক অভিন্ন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে।
চাঁদ দেখা—তা কি স্থানীয় হবে, নাকি বৈশ্বিক?
সেই বৈঠকে অংশ নেন বাংলাদেশের প্রতিনিধিও। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের অধ্যাপক মাওলানা ড. মারুফ (যার সাক্ষাৎকার নিলেই অনেক সংশয় দূর হতে পারে) সেখানে স্বাক্ষর করেছিলেন বিশ্ব আলেমদের ঐকমত্যে।
তাহলে প্রশ্ন জাগে—
এই ৫৭ দেশের আলেম কি অজ্ঞ ছিলেন?
তাঁদের ইজমার (ঐকমত্যের) কি কোনো মূল্য নেই?
*৪. বিজ্ঞান ও শরিয়তের সংলাপ*:
আন্তর্জাতিক আল-হিলাল কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ড. শমশের আলী—একজন বিজ্ঞানী।
তিনি কি আবেগে নয়, বিজ্ঞানের যুক্তিতে কথা বলেননি?
জ্যোতির্বিজ্ঞান আজ নির্ভুলভাবে বলতে পারে চাঁদ কখন কোথায় দৃশ্যমান হবে।
যে বিশ্বে আমরা সেকেন্ডে সেকেন্ডে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে খবর আদান-প্রদান করি, সেখানে চাঁদের খবর পৌঁছাতে কি রাত পোহাতে হবে?
আমার চিন্তার পরিবর্তন সেখানেই।
আমি তাঁদের সংস্পর্শে গিয়ে বুঝলাম—এটি কেবল ধর্মীয় আবেগের প্রশ্ন নয়; এটি জ্ঞানভিত্তিক ঐক্যের প্রশ্ন।
*৫. ফিকাহের ভেতরের নীরব বিতর্ক*:
ইমাম আবু হানিফা একসময় মত দিয়েছিলেন—
পৃথিবীর এক প্রান্তে চাঁদ দেখা গেলে, অন্য প্রান্তের মুসলমানরাও রোজা শুরু করতে পারেন।
কিন্তু বাস্তবে হানাফি মাজহাবের অনুসারীরা অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় চাঁদ দেখাকেই প্রাধান্য দেন।
ফিকাহের ইতিহাসে এ বিতর্ক নতুন নয়—তবে আজকের প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে প্রশ্নটি নতুন মাত্রা পেয়েছে।
*৬. সমালোচনার ঝড় ও আত্মসমীক্ষা*:
আমাকে বলা হলো—
“আপনি একজন জ্ঞানভিত্তিক গবেষক হয়েও, কীভাবে এমন প্রস্তাব সমর্থন করলেন?”
আমি ভাবলাম—
জ্ঞান যদি কেবল ডিগ্রির দেয়ালে ঝোলানো থাকে, তবে তা জ্ঞান নয়;
জ্ঞান হলো চলমান নদী, যা নতুন স্রোতে পথ খুঁজে নেয়।
তারেক রহমানের প্রস্তাবকে আমি সমর্থন করেছি ব্যক্তি-নির্ভর আনুগত্যে নয়, বরং একটি সম্ভাব্য উম্মাহ-ঐক্যের স্বপ্নে।
*৭. এক আকাশ, এক চাঁদ, এক উম্মাহ*:
রোজার প্রথম সেহরিতে যদি ঢাকা, মক্কা, কায়রো, লন্ডন, সিডনি একসাথে নিয়ত করে—
ঈদের সকালে যদি একই দিনে তাকবির ধ্বনিত হয়—
তবে সেটি কেবল একটি তারিখের মিল নয়;
সেটি হবে হৃদয়ের সেতুবন্ধন।
চাঁদ তো বিভক্ত নয়—
আমরাই বিভক্ত করেছি দিগন্তকে।
আমি সমর্থন করেছি সেই প্রস্তাব, কারণ আমি বিশ্বাস করি—
ঐক্য মানে একরূপতা নয়, বরং অভিন্ন উপলব্ধি।
আর যদি প্রশ্ন আসে—
“কেন সমর্থন করলেন?”
তবে আমার উত্তর একটিই—
যেখানে যুক্তি, ঐতিহ্য ও বিজ্ঞান হাত মিলায়, সেখানে আমি নীরব দর্শক হয়ে থাকতে পারি না।
এই প্রতিবেদন কোনো ব্যক্তির পক্ষে সাফাই নয়;
এটি একটি ভাবনার পক্ষে অবস্থান।
এক আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে আমরা যদি এক চাঁদের দিকে তাকাতে পারি,
তবে এক দিনেই রোজা ও ঈদ পালন—
অসম্ভবের কল্পকাহিনি নয়,
সম্ভবের অপেক্ষমাণ ইতিহাস।