মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ০২:৩৭ অপরাহ্ন
খুবি প্রতিনিধি,
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০৬ একরের বিস্তৃত সবুজে সকালবেলার নরম আলো যেমন ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে, তেমনি ছড়িয়ে পড়ে সহায়তা ও গ্রহণযোগ্যতার এক সহজ রুটিন, মাত্র পাঁচ টাকায় পুরো ক্যাম্পাসে ভ্যানে চলাচল। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির সময়ে এই সামান্য ভাড়া শুধু একটি পরিবহন সুবিধা নয় বরং এটি শিক্ষার্থীদের সময় বাঁচায়, মানসিক চাপ কমায় এবং ক্যাম্পাসের মানবিক সম্পর্ককে আরও ঘনিষ্ঠ করে। ক্লাস, লাইব্রেরি, গবেষণাগার, হল কিংবা ক্যাফেটেরিয়া যেখানেই যাওয়া প্রয়োজন, কাছে পাঁচ টাকা থাকলেই ভ্যান থেমে যায়, হাসিমুখে বলে, “চলুন মামা, পৌঁছে দিচ্ছি।” এই সহজ কথাটাই খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের দৈনন্দিন সৌন্দর্যকে সম্পূর্ণ করে।
ভ্যান চালকদের মধ্যে একটি পরিচিত মুখ আলেক চাচা পঞ্চাশোর্ধ্ব, অভিজ্ঞ, মুখভরা সদাচারণ, পনেরো বছর ধরে ভ্যান চালিয়ে শিক্ষার্থী-শিক্ষকদের গন্তব্যে পৌঁছে দেন। তাঁর কথা শুনলে বোঝা যায়, পাঁচ টাকার এই সম্পর্ক সংখ্যার চেয়ে বড় একটা কৃতজ্ঞতার ভাষা। “মাত্র পাঁচ টাকা দিলেই যথেষ্ট,” আলেক চাচার কণ্ঠে যেন স্বস্তির সুর। “শিক্ষার্থীরা আমাদের ঘরের মানুষের মতো। সকালে যখন ক্লাসের তাড়ায় তারা উঠে আসে, তখন মনে হয় আমি নিজের পরিবারের কাউকে পৌঁছে দিচ্ছি। মাঝে মাঝে কেউ খুচরা না পেলে হাসিমুখেই বলে ‘চাচা, পরে দেব।’ আমি বলি “না মামা, যাও তুমি।” এই বিশ্বাসটাই তো বড়। তাঁর কথায় বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা পারস্পরিক আস্থার কথা উঠে আসে, যে আস্থা দীর্ঘদিনের সেবা আর শালীন ব্যবহারে তৈরি হয়, সহজ কোনো চুক্তিপত্রে নয়।
তরুণ ভ্যানচালক সাদিকুলের গল্পে আছে নতুন প্রজন্মের উদ্যম। মাত্র দুই বছরের অভিজ্ঞতা, তবু তিনি বুঝে গেছেন, এই সেবার কেন্দ্রবিন্দু ভাড়া নয়, মানবিকতা। “আমি ভালোবেসেই ক্যাম্পাসে ভ্যান চালাই,” সাদিকুল জানান, “সারা দিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরেই থাকি। দুপুরে ক্যাফে ক্যান্টিনে খেয়েই আবার কাজে যাই। পাঁচ টাকায় ভাড়া, আমাদের জন্য এতে সমস্যা হয় না। বরং যে হাসিমুখে শিক্ষার্থীরা ওঠে-নামে, ‘ধন্যবাদ’ বলে, সেটাই দিনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। অনেক সময় একজনই ওঠেন, বলি পাঁচ টাকাই দিন। কেউ দশ টাকা দিলে ধন্যবাদ জানিয়ে দেই। এটা একটা বুঝাপড়া, একটা পরিবারের মতো পরিবেশ।”
দীর্ঘদিনের আরেক পরিচিত নাম জাহাঙ্গীর মামা মনে করিয়ে দেন, এই ভ্যানসেবার সঙ্গে জড়িয়ে আছে দায়িত্বশীলতার চর্চা। “আমাদের একসময় আইডি-কার্ডভিত্তিক এক শৃঙ্খলা ছিল, চেনা চালক, চেনা ভ্যান। কেউ কোনো কিছু ভ্যানে রেখে গেলে আমরা খুঁজে বের করে দিতাম। শিক্ষার্থীরা ভাবত এখানে হারিয়ে গেলে ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। এই বিশ্বাস টিকিয়ে রাখাটাই আমাদের গর্ব,” বলেন তিনি। তাঁর কথায় বোঝা যায়, ভ্যান চালানো তাঁর কাছে পেশা হলেও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও স্বস্তি রক্ষা করা যেন এক নীরব দায়িত্ব, যার কোনো আলাদা মূল্য নেই আছে কেবল গর্ব।
নুর ইসলাম মামার স্মৃতিতে এই সেবার ইতিহাস যেন পাতা উল্টায়। ২০০৭ সালে যখন তিনি শুরু করেছিলেন, ভাড়া ছিল দুই টাকা। সময়ের সঙ্গে ভাড়া পাঁচ টাকায় স্থির হয়েছে, কিন্তু যে মনোভাবের ভিতরে ভ্যান চলছে, তা বদলায়নি। নুর ইসলাম বলেন,“শিক্ষার্থীরা খুব ভদ্র। কারও বাড়তি ভাড়া দেওয়ার সামর্থ্য থাকলে দেয়, না থাকলে সমস্যা নেই। কেউ কষ্টে থাকলে আমরা বুঝি। এই বুঝে নেওয়া, এই সহানুভূতিই ক্যাম্পাসের সৌন্দর্য বাড়ায়।” তাঁর কথায় প্রতিদিনের ছোট ছোট সহমর্মিতাই এই পরিবহন ব্যবস্থাকে কেবল ‘সস্তা’ নয়, সত্যিকার ‘শিক্ষার্থী বান্ধব’ করে।
শিক্ষার্থীদের চোখে ভ্যানসেবা একটি নিশ্চিন্ততার ঠিকানা। রসায়ন ডিসিপ্লিনের ইমরান হোসেন বলেন, “আমাদের জীবন খুব দ্রুত চলে ক্লাস, ল্যাব, লাইব্রেরি, ক্লাব অনেক কাজ। পাঁচ টাকার এই সহজ সুবিধা না থাকলে সময় নষ্ট হতো, ক্লান্তিও বেড়ে যেত। কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা আমাদের ভ্যানচালক মামারা খুব ভদ্র, নিয়ম মেনে চলেন, কথা বলেন সম্মানের সঙ্গে। আমরা ভরসা করতে পারি এটাই সবচেয়ে বড়।” ইমরানের কথায় ভ্যানকে শুধু বাহন নয়, ‘বিশ্বাস’ হিসেবে চেনা যায়। এই বিশ্বাসই শিক্ষার্থীদের দিনকে কম ক্লান্ত আর বেশি সংগঠিত করে।
শিক্ষা ডিসিপ্লিনের স্নাতকোত্তর দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ইমাম হোসেন মনে করেন, পাঁচ টাকার এই নীতি সমতা নিশ্চিত করে, সবার জন্য একই সুবিধা, একই ভাড়া। “শুধু কম খরচ নয়, এটি আমাদের এক ধরনের মর্যাদাবোধ দেয়। বুঝি, এই বিশ্ববিদ্যালয় আমাদের কথা ভাবে। যখন বৃষ্টি নামে, ভারী ব্যাগ কাঁধে থাকে, তখন ভ্যানের সিটে বসেই মনে হয় কতটা সহজ করে দিচ্ছে আমাদের জীবন।” ইমামের এই অনুভব যেন একাডেমিক জীবনকে ঘিরে গড়ে ওঠা স্নেহের একটি ছাতা, যেখানে ক্লান্তি ভিজে গেলে ভ্যানের ছাউনি মাথার উপর আর আশ্বাসের সুর কানে।
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা ডিসিপ্লিনের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী নওরীন হক এই ব্যবস্থাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে দেখেন। “আসলেই এটি আমাদের পরিচয়। বাইরের দুনিয়ায় যখন সবকিছুই ব্যয়ের চাপ বাড়ায়, তখন ক্যাম্পাসের ভেতরে পাঁচ টাকার এই নিশ্চয়তা আমাদের অনেকটা হালকা করে দেয়,” বলেন তিনি। “চালকদের সঙ্গে আমাদের এক আন্তরিক সম্পর্ক আছে। নাম ধরে চেনেন, গন্তব্য জিজ্ঞেস করেন, তাড়া থাকলে একটু গতি বাড়ান, সবটাই এক পরিবারের মতো। এমন পরিবেশ সব বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখা যায় না।” নওরীনের এই উপলব্ধিতে ধরা পড়ে, ভ্যানসেবা কেবল যাত্রা নয় একটি সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা, যা শিক্ষার্থীজীবনকে কোমলতায় জড়ায়।
প্রশাসনের দৃষ্টিতেও ভ্যানসেবা এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিগত অঙ্গ। ছাত্র বিষয়ক পরিচালক প্রফেসর ড. মো. নাজমুস সাদাত জানান, বিশ্ববিদ্যালয় এই মানবিক সুবিধাটিকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে যাচ্ছে। “আমরা পুরোনো ও অভিজ্ঞ ভ্যানচালকদের সঙ্গে ইতোমধ্যে কথা বলেছি। খুব শিগগিরই বিজ্ঞপ্তি দিয়ে আগ্রহীদের নিবন্ধন করা হবে। জাতীয় পরিচয়পত্র এবং ভ্যানের কন্ডিশন দেখে নির্বাচন করা হবে, যাতে নিরাপত্তা ও সৌন্দর্য রক্ষা পায়। যারা দীর্ঘদিন ধরে সেবা দিচ্ছেন, তাদের অগ্রাধিকার থাকবে,” বলেন তিনি। তাঁর কণ্ঠে ভরসা-যেন এই ঐতিহ্য এখন আরও দৃঢ় কাঠামো পেতে চলেছে। নিবন্ধন, পরিচয়পত্র, সৌজন্যমূলক আচরণবিধি ও ভ্যানের মান বজায় রাখার মতো বিষয়গুলো নিশ্চিত হলে শিক্ষার্থীরা যেমন স্বস্তি পাবে, তেমনি ভ্যানচালকরাও পাবেন একটি স্থায়ী সম্মান ও পরিচিতি।
সব মিলিয়ে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচ টাকার ভ্যানসেবা এক সৌন্দর্যবোধের অভ্যাস। কেউ ভ্যানে ব্যাগ ভুলে গেলে চালক খুঁজে দেয়, কেউ খুচরা না পেলে পরেরবার দেয়, কেউ তাড়া থাকলে একটু আগে পৌঁছে দেয়, এমন অসংখ্য ছোট ঘটনা প্রতিদিনই ঘটছে অগোচরে। এই নীরব সহায়তাগুলো মিলে তৈরি হয় বড় এক আস্থা, যা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেবল শিক্ষার জায়গা নয়, এক নরম মানবিক স্থান হিসেবে চিনিয়ে দেয়। শিক্ষার্থীরা যখন বলে “ভ্যান ছাড়া আমাদের সকাল কল্পনা করা মুশকিল” তখন বোঝা যায়, এই সেবার মূল্য কেবল অর্থে মাপা যায় না। এটি সময় দেয়, নিরাপত্তা দেয়, হাসি দেয় আর দেয় এক সঙ্গে পথচলার আনন্দ।