মঙ্গলবার, ০২ জুন ২০২৬, ১২:৩৮ পূর্বাহ্ন
স্টাফ রিপোর্টার:
রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ঘাটসংলগ্ন কলাবাগান এলাকা এবং মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার তেওতা ইউনিয়নে পদ্মা নদীর বুকে গভীর রাতে ভয়াবহভাবে চলছে অবৈধ বালু উত্তোলন। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের চোখের সামনেই একটি সংঘবদ্ধ ও প্রভাবশালী সিন্ডিকেট ড্রেজার ও একাধিক বলগেট ব্যবহার করে রাতভর পদ্মার তলদেশ কেটে বালু লুট করছে। অথচ নৌ-পুলিশ, স্থানীয় প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ রহস্যজনকভাবে নিশ্চুপ ভূমিকা পালন করছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রাজবাড়ী জেলার কলাবাগান এলাকায় “সামিয়া সুমাইয়া এন্টারপ্রাইজ” নামের একটি বলগেট এবং মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার তেওতা ইউনিয়নে জাতীয় পাওয়ার গ্রীড সংলগ্ন এলাকায় “নবীজির দোয়া” নামের একটি লোড ড্রেজারসহ আরও বেশ কয়েকটি বলগেট ও ড্রেজার প্রতিরাতে নদীতে অবস্থান নেয়। রাত ১০টার পর শুরু হয় বালু কাটার মহোৎসব, যা চলে ভোর পর্যন্ত। নদীর বুক চিরে শত শত ঘনফুট বালু উত্তোলন করে বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো দৃশ্যমান অভিযান বা জব্দ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে না।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, মানিকগঞ্জের তেওতা ইউনিয়নে জাতীয় পাওয়ার গ্রীডের অতি সন্নিকটে নদীর তলদেশ থেকে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এভাবে অপরিকল্পিত ও অবৈধভাবে নদী খনন চলতে থাকলে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ পরিবর্তন, ভয়াবহ ভাঙন এবং জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হুমকির মুখে পড়তে পারে। এমনকি জাতীয় বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থাও মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। কিন্তু এত বড় জাতীয় নিরাপত্তা ঝুঁকির বিষয়েও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের নীরবতা জনমনে বিস্ময় ও ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, ড্রেজার চলাকালে নদীতে স্পিডবোট ও ট্রলারযোগে ১০ থেকে ১৫ জন অস্ত্রধারী ব্যক্তি পাহারায় থাকে। কেউ কাছে যাওয়ার চেষ্টা করলে অস্ত্র প্রদর্শন করে ভয়ভীতি দেখানো হয়। এমনকি প্রতিবাদ করলেই প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, “রাত নামলেই পুরো নদী এলাকা যেন সন্ত্রাসী বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।”
একাধিক বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “যদি বৈধভাবেই বালু উত্তোলন করা হয়, তাহলে দিনের আলোতে কাজ করতে সমস্যা কোথায়? কেন গভীর রাতে ড্রেজার বসাতে হয়? কেন অস্ত্রধারী পাহারা রাখতে হয়? কেন সাধারণ মানুষকে ভয় দেখানো হয়?” তাদের দাবি, প্রশাসনের রহস্যজনক নিরবতা ও নিষ্ক্রিয়তাই এই সিন্ডিকেটকে আরও বেপরোয়া করে তুলেছে।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, দৌলতদিয়া ঘাটসংলগ্ন নদীপথে নৌ-পুলিশের টহল থাকার পরও কীভাবে রাতভর ড্রেজার চলে? প্রশাসনের চোখের সামনেই যদি অবৈধ বালু উত্তোলন হয়, তাহলে সাধারণ মানুষ কোথায় যাবে? অনেকেই অভিযোগ তুলেছেন, প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়া ছাড়া এত বড় অবৈধ বালু সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে পরিচালনা করা সম্ভব নয়।
এলাকাবাসী অবিলম্বে রাজবাড়ী জেলা প্রশাসন, মানিকগঞ্জ জেলা প্রশাসন, শিবালয় উপজেলা প্রশাসন, নৌ-পুলিশ, পরিবেশ অধিদপ্তর, বিদ্যুৎ বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন। তারা যৌথ অভিযান পরিচালনা করে অবৈধ ড্রেজার ও বলগেট জব্দ, জড়িতদের গ্রেফতার, অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের আইনের আওতায় আনা এবং জাতীয় পাওয়ার গ্রীড সংলগ্ন এলাকায় সব ধরনের বালু উত্তোলন বন্ধের দাবি জানিয়েছেন।
স্থানীয়দের হুঁশিয়ারি, এখনই কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে যেকোনো সময় ভয়াবহ নদীভাঙন, জাতীয় সম্পদের অপূরণীয় ক্ষতি কিংবা বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তখন দায় এড়ানোর সুযোগ থাকবে না সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষের।