মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ১০:৩০ পূর্বাহ্ন
রাতটি ছিল অদ্ভুত নীরব। আকাশে চাঁদ ছিল, কিন্তু তার আলো যেন মাটিতে নামতে ভয় পাচ্ছিল। মসজিদের মিনারে হালকা বাতাস ছুঁয়ে যাচ্ছিল, আর সেই বাতাসের সাথেই যেন ভেসে আসছিল এক প্রশ্ন—
“পাঁচ ওয়াক্ত সালাত—তার সূচনা কোথায়?”
আব্দুল হাকিম, এক জ্ঞানপিপাসু মানুষ, বসে ছিলেন একটি পুরনো কাঠের টেবিলের সামনে। সামনে খোলা কুরআন শরীফ। পৃষ্ঠাগুলো যেন কথা বলছিল, শব্দগুলো যেন জেগে উঠছিল নীরবতার ভেতরে।
তিনি পড়ছিলেন—
সূরা নূর, আয়াত ৫৮।
ফজর ও ইশার কথা।
তারপর সূরা হুদ, আয়াত ১১৪—
দিনের দুই প্রান্ত, রাতের অংশ—জোহর, আসর, মাগরিব।
অবশেষে সূরা ইসরা, আয়াত ৭৮—
যেখানে যেন একসাথে ফুটে উঠেছে পাঁচ ওয়াক্তের পূর্ণ নকশা।
হাকিমের চোখে তখন এক অদ্ভুত দীপ্তি। মনে হলো, যেন অন্ধকারে কেউ একটি প্রদীপ জ্বালিয়ে দিয়েছে।
তিনি ধীরে বললেন—
“তাহলে… এই আলো তো কুরআনেই ছিল! এত স্পষ্ট, এত নির্মল!”
কিন্তু ঠিক তখনই তার মনে ভেসে উঠলো আরেকটি দৃশ্য—
মিরাজের রাত।
নবী করীম (সা.) আকাশপথে, নক্ষত্রের সীমানা পেরিয়ে, এক অপার্থিব সফরে।
সেখানে সালাতের উপহার, আর হযরত মূসা (আ.)-এর পরামর্শ—
পঞ্চাশ থেকে পাঁচে নামিয়ে আনা।
হাকিমের ভ্রু কুঁচকে গেলো।
“যদি কুরআনের আয়াতেই সালাতের সময় নির্ধারিত থাকে,”—তিনি ভাবলেন—
“তবে কি সেই আলো আসার পরও অপেক্ষা ছিল?
নাকি আমরা আলো দেখেও অন্য আলো খুঁজতে ব্যস্ত?”
বাতাস যেন হঠাৎ থেমে গেলো।
মসজিদের দেয়ালে ঝুলে থাকা ঘড়ির কাঁটা টিকটিক করে উঠলো—
যেন সময় নিজেই প্রশ্ন করছে।
তিনি আবার কুরআনের দিকে তাকালেন।
পড়লেন—
“ইন্নাহু লা-কুরআনুন কারীম”—
নিশ্চয়ই এটি এক মহিমান্বিত কুরআন। অর্থাৎ কুরআনের বাণী অকাট্য, দ্বিতীয় অন্য গ্রন্থের সাথে তুলনা কিংবা পরিমাপযোগ্য নয়। আল্লাহর কথার উপর কারো কথা হয় না। উক্ত আয়াতে, আল্লাহর কথার উপর কারো পরামর্শ গ্রহণও নাকচ হয়ে গেছে।
তাই কুআনের শব্দগুলো যেনো আবদুল হাকিমের কানে বজ্রপাতের মতো আঘাত করলো!
তিনি ফিসফিস করে বললেন—
“যদি এটি মহিমান্বিত হয়, তবে কি আমরা তার মর্যাদা পুরোপুরি দিচ্ছি?”
তার মনে হলো—
বিশ্বাস যেন একটি নদী।
কুরআন তার উৎস, স্বচ্ছ ও নির্মল।
আর অন্যান্য বর্ণনা—সেগুলো যেন উপনদী, যা কখনো সেই উৎসের সাথে মিশে যায়, কখনো দূরে সরে যায়।
হাকিম মাথা নিচু করলেন।
তার চোখে জল।
কিন্তু সেই জল দুঃখের নয়—
সত্য খোঁজার তৃষ্ণার।
বাইরে তখন ফজরের আজান ভেসে এলো—
*“আল্লাহু আকবার… আল্লাহু আকবার*…”
তিনি উঠে দাঁড়ালেন।
মনে হলো, সব প্রশ্নের উত্তর হয়তো তর্কে নয়,
সিজদার নীরবতায় লুকিয়ে আছে।
সিজদায় মাথা রেখে তিনি শুধু বললেন—
“হে আল্লাহ,
আমাকে সত্যকে সত্য হিসেবে দেখার চোখ দিন,
আর তাকে অনুসরণ করার সাহস দিন।”
চাঁদের আলো এবার আর লুকালো না।
নেমে এলো নীরবে—
ঠিক যেমন কুরআনের আলো নেমে আসে হৃদয়ে,
যদি কেউ সত্যিই তা খুঁজে পেতে চায়!
আবদুল হাকিমের মনে প্রশ্ন জাগে, যারা আল-কুরআনকে সমাজে প্রতিষ্ঠা করতে চান, সেই আলেম-ওলামাদের কাছে কুরআনের জ্বলন্ত বাণী থাকার পরও, সেটাকে পাশ কাটিয়ে, মিরাজের সময় মূসা নবীর পরামর্শ প্রাধান্য পায় কেন?