সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬, ১১:৫৩ অপরাহ্ন
অক্সফোর্ডের শতবর্ষী প্রাচীরগুলো অনেক ইতিহাসের সাক্ষী। বিশ্বনেতা, রাষ্ট্রচিন্তক, নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী ও সমাজসংস্কারকদের পদচারণায় সমৃদ্ধ এই প্রাঙ্গণে যখন বাংলাদেশের বিপ্লবোত্তর ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা হয়, তখন সেটি শুধু একটি একাডেমিক অনুষ্ঠান থাকে না; বরং একটি জাতির সম্ভাবনা, সংকট ও স্বপ্নকে বৈশ্বিক পরিসরে তুলে ধরার সুযোগে পরিণত হয়।
সেই আলোচনায় বাংলাদেশের তরুণ নেতৃত্বের প্রতিনিধিত্ব করতে উপস্থিত ছিলেন ছাত্রনেতা আবু ছাদিক কায়েম এবং হাসনাত আব্দুল্লাহ। তাদের উপস্থিতি ছিল কেবল ব্যক্তি হিসেবে নয়, বরং একটি প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষা ও সংগ্রামের প্রতীক হিসেবে।
অক্সফোর্ডের আলোচনাকক্ষে যখন বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন, গণআন্দোলন এবং রাষ্ট্র পুনর্গঠনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল, তখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থী ও গবেষকেরা জানতে চাইছিলেন— একটি আন্দোলনের পর একটি জাতি কীভাবে নিজেদের নতুন করে গড়ে তোলে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই ছাদিক কায়েম ও হাসনাত আব্দুল্লাহর অংশগ্রহণের গুরুত্ব সামনে আসে।
কারণ, ইতিহাসের বড় পরিবর্তনগুলো কেবল বইয়ের পাতায় লেখা থাকে না; সেগুলো যারা প্রত্যক্ষভাবে দেখেন, নেতৃত্ব দেন কিংবা অংশগ্রহণ করেন, তাদের অভিজ্ঞতার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে ভবিষ্যতের শিক্ষা। অক্সফোর্ডের মঞ্চে তাদের বক্তব্য তাই বাংলাদেশের সাম্প্রতিক বাস্তবতার একটি প্রত্যক্ষ বর্ণনা হিসেবে গুরুত্ব পেয়েছে।
তবে এই গুরুত্বকে ব্যক্তিগত অর্জনের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ রাখলে ভুল হবে।
আসল গুরুত্ব হলো— বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরে বাংলাদেশের তরুণদের কণ্ঠস্বর পৌঁছানো। দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়ন, দারিদ্র্য কিংবা দুর্যোগের প্রেক্ষাপটে আলোচিত বাংলাদেশ আজ রাজনৈতিক সচেতনতা, নাগরিক অংশগ্রহণ এবং তরুণ নেতৃত্বের বিষয়েও আন্তর্জাতিক আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে।
অক্সফোর্ডের সেই আলোচনা যেন একটি উপন্যাসের দৃশ্য। সেখানে একদিকে রয়েছে বিপ্লবের আবেগ, অন্যদিকে রাষ্ট্রগঠনের কঠিন বাস্তবতা। সেখানে স্বপ্ন আছে, আবার সতর্কবার্তাও আছে।
একজন প্রবীণ অধ্যাপক মন্তব্য করেছিলেন, “যে জাতি তার তরুণদের কথা শুনতে শেখে, সেই জাতিই ভবিষ্যৎ নির্মাণে এগিয়ে যায়।”
বাংলাদেশের জন্য এ বক্তব্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ কোনো আন্দোলনের প্রকৃত সফলতা নির্ভর করে আন্দোলনের পর প্রতিষ্ঠিত শাসনব্যবস্থা কতটা জবাবদিহিমূলক, কতটা ন্যায়ভিত্তিক এবং কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক হতে পারে তার ওপর।
ছাদিক কায়েম ও হাসনাত আব্দুল্লাহর উপস্থিতি তাই একটি বড় শিক্ষা সামনে নিয়ে আসে— তরুণদের কণ্ঠস্বর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পৌঁছানো যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি দেশের ভেতরে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, সহনশীলতা ও দায়িত্বশীল নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করাও সমান জরুরি।
বাংলাদেশের সামনে আজ যে সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, তা কাজে লাগাতে হলে কয়েকটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে—
• ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতির পরিবর্তে প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা।
• মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও আইনের শাসন নিশ্চিত করা।
• শিক্ষা, গবেষণা ও প্রযুক্তিতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা।
• দুর্নীতি ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
• রাজনৈতিক মতভেদ সত্ত্বেও জাতীয় স্বার্থে ঐক্যের সংস্কৃতি গড়ে তোলা।
অক্সফোর্ডের সেই প্রাচীন প্রাঙ্গণে আলোচনার শেষে করতালি থেমে গিয়েছিল, কিন্তু প্রশ্নগুলো রয়ে গিয়েছিল। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কেমন হবে, তার উত্তর কোনো বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় দেবে না; সেই উত্তর লিখতে হবে বাংলাদেশের জনগণকেই।
তবে অক্সফোর্ডের আলোচনায় ছাদিক কায়েম ও হাসনাত আব্দুল্লাহর অংশগ্রহণ একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে— বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম আজ আর শুধু দেশের ভেতরে নয়, আন্তর্জাতিক পরিসরেও নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরতে সক্ষম।
আর ইতিহাসের শিক্ষা হলো, যে জাতির তরুণেরা স্বপ্ন দেখতে পারে এবং সেই স্বপ্নকে যুক্তি, জ্ঞান ও দায়িত্ববোধের সঙ্গে প্রকাশ করতে পারে, সেই জাতির ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাময় হয়।
অক্সফোর্ড থেকে ভেসে আসা বার্তাটি তাই একটাই—
“বিপ্লব পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে, কিন্তু সেই পরিবর্তনকে টেকসই উন্নয়ন, সুশাসন ও জাতীয় অগ্রগতিতে রূপান্তরিত করার দায়িত্ব পুরো জাতির।”