রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬, ১১:৪৩ অপরাহ্ন
বাংলাদেশের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ঘোষিত জাতীয় বাজেট দেশের অর্থনীতিকে আরও গতিশীল, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জনকল্যাণমুখী করার লক্ষ্যে প্রণীত হয়েছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণ এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গঠনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ায় বাজেটটি সাধারণ জনগণ, ব্যবসায়ী মহল এবং উন্নয়ন-সংশ্লিষ্টদের কাছে ইতিবাচক বার্তা বহন করছে।
বাজেটের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক হলো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর কর ও শুল্ক কাঠামোয় কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন আনার উদ্যোগ। এর ফলে চাল, ডাল, ভোজ্যতেলসহ প্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারমূল্য স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা মিলতে পারে। ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপে থাকা সাধারণ মানুষের জন্য এটি একটি স্বস্তির বার্তা।
উন্নয়ন ব্যয়ের পরিমাণ বৃদ্ধি করে অবকাঠামো উন্নয়নকে আরও বেগবান করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সড়ক, রেল, যোগাযোগ এবং নগর ব্যবস্থাপনার উন্নয়নের মাধ্যমে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণ ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
মানবসম্পদ উন্নয়নের লক্ষ্যে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও দক্ষতা উন্নয়ন খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে তরুণ জনগোষ্ঠীকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করার উদ্যোগ ভবিষ্যৎ অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সম্প্রসারণও বাজেটের একটি শক্তিশালী দিক। ভাতা ও সহায়তামূলক কর্মসূচির আওতা বাড়ানোর মাধ্যমে সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের জন্য নিরাপত্তা বলয় আরও শক্তিশালী হবে।
দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে ব্যবসা সহজীকরণ এবং বিনিয়োগবান্ধব নীতি গ্রহণের বিষয়টিও বাজেটে গুরুত্ব পেয়েছে। অর্থনীতিতে নতুন বিনিয়োগ প্রবাহ বাড়লে শিল্পায়ন, উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির পথ আরও সুগম হবে।
তরুণদের কর্মসংস্থান এবং দক্ষতা উন্নয়নকে বাজেটের অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি তথ্যপ্রযুক্তি, ডিজিটাল সেবা ও উদ্ভাবনী খাতের বিকাশে উৎসাহ প্রদান দেশের ডিজিটাল অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করবে।
বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব লক্ষ্য বাস্তবায়িত হলে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে এবং অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে।
সব মিলিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট জনকল্যাণ, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামাজিক সুরক্ষার মধ্যে একটি ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছে। বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করা গেলে এই বাজেট দেশের অর্থনীতিকে একটি নতুন গতিপথে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
√২. *ঘোষিত বাজেট মূল্যস্ফীতি ও করের চাপে জর্জরিত*
২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটকে সরকার অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামাজিক সুরক্ষা জোরদারের একটি রূপরেখা হিসেবে উপস্থাপন করেছে। তবে বাজেট ঘোষণার পর অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, পেশাজীবী এবং সাধারণ মানুষের একটি অংশ এর কিছু দুর্বল দিক নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের মতে, বাজেটের লক্ষ্য ও বাস্তবতার মধ্যে এখনও একটি উল্লেখযোগ্য ব্যবধান রয়ে গেছে।
বাজেটের অন্যতম প্রধান সমালোচনা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ প্রসঙ্গে। সরকার মূল্যস্ফীতি কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করলেও তা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় কার্যকর ও সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা দৃশ্যমান নয়। ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কমবে কি না, সে বিষয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে সংশয় রয়ে গেছে।
রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রে পরোক্ষ কর ও ভ্যাটনির্ভর নীতির কারণে সাধারণ ভোক্তাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রত্যক্ষ করের পরিধি বাড়ানোর পরিবর্তে ভোগ্যপণ্যের ওপর কর বৃদ্ধি শেষ পর্যন্ত সাধারণ জনগণের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দিতে পারে।
মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্যও বাজেটে উল্লেখযোগ্য স্বস্তির ব্যবস্থা দেখা যায়নি বলে সমালোচকরা মনে করেন। ক্রমবর্ধমান শিক্ষা, চিকিৎসা ও দৈনন্দিন ব্যয়ের চাপে থাকা মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো আয়কর ও জীবনযাত্রার ব্যয় হ্রাসে আরও কার্যকর পদক্ষেপ প্রত্যাশা করেছিল।
বাজেট ঘাটতির আকারও উদ্বেগের একটি বিষয়। বড় অঙ্কের ঘাটতি পূরণে সরকারকে দেশি-বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভর করতে হতে পারে। এর ফলে ভবিষ্যতে ঋণের সুদ পরিশোধে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়ন নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। অতীতের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, অনেক প্রকল্প নির্ধারিত সময়ে শেষ হয় না, ব্যয় বৃদ্ধি পায় এবং কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায় না। ফলে বরাদ্দ বৃদ্ধি পেলেও তার কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বেসরকারি বিনিয়োগ ও শিল্পায়নের ক্ষেত্রে বাজেটে নতুন ও আকর্ষণীয় প্রণোদনার ঘাটতি রয়েছে বলেও অনেকে মনে করেন। অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতিতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির জন্য বৃহত্তর বিনিয়োগ প্রয়োজন হলেও সে লক্ষ্যে আরও সাহসী পদক্ষেপের প্রত্যাশা ছিল।
কৃষি খাত, যা দেশের খাদ্যনিরাপত্তা ও গ্রামীণ অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি, সেই খাতেও আরও শক্তিশালী সহায়তা প্রয়োজন ছিল বলে মত দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। কৃষকদের উৎপাদন ব্যয় কমানো, সহজ শর্তে ঋণ এবং ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার বিষয়ে আরও স্পষ্ট উদ্যোগ প্রত্যাশিত ছিল।
তরুণদের কর্মসংস্থান নিয়েও বাজেটে সুস্পষ্ট রূপরেখার অভাব লক্ষ্য করা যায়। কর্মসংস্থান বৃদ্ধির কথা বলা হলেও কতসংখ্যক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, কোন খাতে হবে এবং কীভাবে হবে—সেসব বিষয়ে নির্দিষ্ট পরিকল্পনা উপস্থাপিত হয়নি।
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বরাদ্দ বাড়ানো হলেও অপচয়, অনিয়ম ও সুবিধাভোগী নির্বাচনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার বিষয়ে দৃশ্যমান সংস্কার পরিকল্পনার অভাব রয়েছে। ফলে বরাদ্দের সুফল প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে কতটা পৌঁছাবে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
এ ছাড়া উচ্চাভিলাষী রাজস্ব আহরণ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়েও সংশয় রয়েছে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড প্রত্যাশিত মাত্রায় না বাড়লে রাজস্ব ঘাটতি দেখা দিতে পারে, যা উন্নয়ন ব্যয় ও সরকারি সেবার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সব মিলিয়ে, ঘোষিত জাতীয় বাজেট উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধির কিছু ইতিবাচক লক্ষ্য নির্ধারণ করলেও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কর-স্বস্তি, কৃষি সহায়তা এবং বাস্তবায়ন সক্ষমতার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আরও কার্যকর ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। বাজেটের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে ঘোষিত লক্ষ্যমাত্রা কতটা দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার সঙ্গে বাস্তবায়ন করা যায় তার ওপর।