মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:১৪ অপরাহ্ন
*১. অদৃশ্য শক্তির খপ্পরে*:
গল্পের মতো, একদিন বাংলাদেশের টেলিভিশন চ্যানেলগুলো যেন এক অদ্ভুত যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ল। একদিকে ছিল রাজনীতি, অন্যদিকে ছিল সংবাদ মাধ্যমের স্বকীয়তা। আর এই দুইয়ের মিশেলে সৃষ্টি হয়েছিল এক অপূর্ব নাটক, যার মধ্যে টিভি চ্যানেলগুলো হয়ে উঠেছিল ক্ষমতার হাতিয়ার। কেউ কেউ বলছিলেন, “এটা কেমন সংবাদ?” কেউ বলছিলেন, “এটা তো দলীয় প্রচারণা!” আর কেউ কেউ আবার বলছিলেন, “এতগুলো চ্যানেল, অথচ একটাই গল্প!”
*২. প্রথম অধ্যায়: রাজনীতির শিয়রে সংবাদ মাধ্যম*:
তারেক রহমানের দেশে ফিরে আসার পর থেকেই বাংলাদেশের টিভি চ্যানেলগুলো যেন এক অদৃশ্য শক্তির খপ্পড়ে পড়ে গেছে। দেশীয় টিভি চ্যানেলগুলো, যারা একসময় গণমাধ্যমের প্রতি দায়িত্বশীলতা আর বিশ্বাসযোগ্যতার কথা বলতো, এখন প্রায় এককেন্দ্রিক হয়ে উঠেছে। বেশ কিছু চ্যানেল
নির্বাচন আচরণবিধি ও নিরপেক্ষ সংবাদ প্রচারের সঙ্কীর্ণ সীমানা ছাপিয়ে দলীয় পক্ষের পক্ষে সরাসরি প্রচারণায় মত্ত।
নির্বাচন কমিশন বা কোনো সরকারি সংস্থা যেন এই ব্যাপারে নিশ্চুপ। সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতার দাবিতে যখন জাতি সারা দেশে নানা প্রতিবাদে উন্মুখ, তখন সেই শব্দগুলো হাওয়ার সঙ্গে মিশে যায়। চ্যানেলগুলোর কর্তৃপক্ষ যেন নিজেদের নিউজ রুমে রাজনীতির অদৃশ্য তামাশা মঞ্চায়ন করছ!
*৩.দ্বিতীয় অধ্যায়: গণমাধ্যমের বিচ্ছিন্নতা*:
গণমাধ্যমে এখনকার খবরগুলো যেন একটি মলিন সিনেমার দৃশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে একটি দলের অবিরাম প্রচারণা, অন্যদিকে আরেকটি দলের সমালোচনা। এমন পরিস্থিতিতে যে কোনো সাধারণ দর্শক সহজেই বুঝে ফেলে, কোন চ্যানেল কোন দলের সাথে কাজ করছে। অনেক সময়, টিভি চালাতে গেলে, অনুভূতি হয় যেন সংবাদ সম্প্রচার করা হচ্ছে না, বরং দলীয় সমর্থকদের উৎসাহিত করার জন্য একটা মঞ্চ তৈরি করা হচ্ছে।
আসল সাংবাদিকতা— যা জনগণের তথ্য পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করে, তা যেন হাওয়ার মতো উড়ে যাচ্ছে। সংবাদ আর তথ্যের মধ্যে ভিন্নতা আর লক্ষ্যবোধ হারিয়ে গেছে। প্রকৃত সংবাদকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য পূরণের যন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
*৪.তৃতীয় অধ্যায়: জনগণের প্রতিক্রিয়া*
আর এই পরিস্থিতি জনগণের কাছে কিছুটা বিরক্তির জন্ম দিয়েছে। বহু মানুষ টিভি খুলে খবরে সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ছেন, “এটা তো এখন আর খবর নয়, এটা তো মঞ্চায়িত নাটক!” সুতরাং, তারা একে একে টিভি বন্ধ করে দিচ্ছেন। সময়ের সঙ্গে টিভি চ্যানেলগুলো আরো বেশি একপেশে হয়ে যাচ্ছে, এবং সাধারণ মানুষ তাদের বিদ্রোহী মনোভাব দিয়ে ভীষণভাবে এর প্রতিবাদ জানাচ্ছে।
জনগণের আরেকটা অবস্থা হলো, তাদের যদি কোনো সত্য সংবাদ দরকার হয়, তবে সেটা তারা সোশ্যাল মিডিয়া বা অনলাইন পোর্টালের মাধ্যমে খুঁজে বেড়ান, যেখানে কিছুটা নিরপেক্ষতা রয়েছে। কিন্তু সেটাও যদি রাজনৈতিক পক্ষগুলোর নজরদারিতে চলে যায়, তাহলে তারা জানেন না কোথায় যাবে।
**৫. চতুর্থ অধ্যায়: প্রণিধিত্বশীল সাংবাদিকতা নেই*
এখন, যদি এই অবস্থার অবসান চাওয়া হয়, তাহলে একমাত্র পথ হলো প্রণিধিত্বশীল সাংবাদিকতা। এমন সাংবাদিকতা যা জনগণের সামনে আনবে সঠিক তথ্য, যা কোনো রাজনৈতিক পক্ষের প্রতি পক্ষপাতিত্ব ছাড়াই নিরপেক্ষ। এমন সাংবাদিকতা যা জানাবে দেশের বাস্তব পরিস্থিতি, তার সীমাবদ্ধতা, তার সম্ভাবনা, এবং জনগণের কথা, বিশেষ করে সাধারণ জনগণের মতামতকে সম্মান করবে।
এমন সাংবাদিকতা, যা সংবাদমাধ্যমকে কেবল সরকারের বা রাজনৈতিক দলের প্রপাগান্ডার হাতিয়ার না করে, জনগণের জন্য গঠনমূলক, সুষ্ঠু এবং সমালোচনামূলক মানদণ্ডের আলোকে দায়িত্ব পালনে সক্ষম করবে।
সমাপ্তি: টিভি চ্যানেলগুলোর ভবিষ্যৎ
এই সময়টাই আমাদের জন্য একটা মাইলফলক। যদি টিভি চ্যানেলগুলো সংবাদ মাধ্যম হিসেবে তাদের আস্থা ও দায়িত্বশীলতা বজায় না রাখে, তবে খুব শিগগিরই জনগণ তাদের কাছে গিয়ে আস্থা হারাবে। আর যদি সংবাদ মাধ্যমগুলো সত্যিকার অর্থে জনগণের দৃষ্টিতে নিরপেক্ষ ও সঠিকভাবে কাজ করতে না পারে, তাহলে তাদের ভবিষ্যত হবে আরো অন্ধকার। জনগণের কাছে সঠিক তথ্য পৌঁছানো, এবং রাজনৈতিক চাপের বাইরে বেরিয়ে আসা—এটাই মূল চ্যালেঞ্জ।
এখন প্রশ্ন হলো—কবে সেই সময় আসবে, যখন সংবাদ মিডিয়া নিজেদের দায়িত্ব ও সত্যবাদিতাকে প্রাধান্য দিয়ে সঠিক পথ অনুসরণ করবে সময় হয়তো এর উত্তর দেবে।