মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ১০:২৮ পূর্বাহ্ন
*১. সারাবিশ্বে একই দিনে রোজা ও ঈদ পালনে তারেক রহমানের প্রস্তাব*:
সাম্প্রতিক সময়ে তারেক রহমান এক ইফতার মাহফিলে আলেম সমাজের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন—বিজ্ঞানের এই যুগে সারা বিশ্বের সঙ্গে সমন্বয় করে একই দিনে রোজা ও ঈদ পালন করা যায় কি না, সে বিষয়ে ভাবার জন্য। তার এই বক্তব্য কেবল একটি রাজনৈতিক মন্তব্য নয়; বরং ১৯৮৬ সালের একটি ঐতিহাসিক ফিকাহি সিদ্ধান্তকে নতুন করে প্রাসঙ্গিক করে তুলেছে।
*২. আম্মানে ওআইসির ফিকাহ অ্যাকাডেমির এজমা*:
১৯৮৬ সালে জর্দানের Amman-এ অনুষ্ঠিত অধিবেশনে International Islamic Fiqh Academy—যা Organisation of Islamic Cooperation (OIC)-এর একটি অঙ্গসংগঠন—চাঁদ দেখা, রমজান শুরু ও ঈদ নির্ধারণ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এটা ছিল মুসলিম বিশ্বের আলেমদের সর্ববৃহৎ এজমা।
ফকিহদের উক্ত এজমার মূল দিকগুলো ছিল—
(১) রু’ইয়াত (চাঁদ দেখা) হলো শরঈ ভিত্তি—রমজান ও ঈদ নির্ধারণে সরাসরি চাঁদ দেখাই মূলনীতি।
(২) বিশ্বস্ত সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য—যাচাইযোগ্য সাক্ষ্য থাকলে তা গ্রহণ করা যেতে পারে।
(৩) আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের সম্ভাবনা—এক অঞ্চলে চাঁদ দেখা প্রমাণিত হলে অন্য অঞ্চলের জন্যও তা গ্রহণযোগ্য হতে পারে, বিশেষত যেখানে দিগন্তগত বাধা নেই।
(৪)জ্যোতির্বিজ্ঞান সহায়ক মাধ্যম—হিসাবকে একমাত্র ভিত্তি না করলেও, সম্ভাবনা যাচাইয়ে তা সহায়ক হিসেবে গ্রহণযোগ্য।
(৫) ঐক্যের আহ্বান—মুসলিম বিশ্বে বিভ্রান্তি কমাতে পারস্পরিক তথ্য বিনিময় ও সমন্বয়ের সুপারিশ।
অর্থাৎ, ১৯৮৬ সালের সিদ্ধান্ত সরাসরি “বিশ্বব্যাপী একদিন” বাধ্যতামূলক করেনি; তবে শরঈ কাঠামোর ভেতরে বৈশ্বিক ঐক্যের দরজা উন্মুক্ত রেখেছে। আলেমদের এজমার অন্যতম বৈশিষ্ট্য এখানে অক্ষুন্ন রাখা হয়েছে।
*৩. তারেক রহমানের প্রস্তাব: পুরনো আলোচনার পুনর্জাগরণ*:
তারেক রহমানের বক্তব্যের মূল সুর ছিল—আলেম সমাজ কি বিজ্ঞানের যুগে বৈশ্বিক সমন্বয়ের পথে এগোতে পারেন?
এখানে লক্ষণীয়—
তিনি সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার কথা বলেননি।
আলেমদের চিন্তা-ভাবনার আহ্বান জানিয়েছেন।
বিষয়টিকে রাজনৈতিক বিতর্কের বাইরে রেখে বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনায় এনেছেন।
এটি মূলত ১৯৮৬ সালের আম্মান ঘোষণার বা বিশ্বসেরা ফিকাহ শাস্ত্রবিদ আলেমদের চেতনাকেই পুনরুজ্জীবিত করে।
*৪. ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ক্যালেন্ডার*: বৈজ্ঞানিক প্রয়াস
বিশ্বের বিভিন্ন ইসলামি গবেষণা প্রতিষ্ঠান “ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ক্যালেন্ডার” ধারণা নিয়ে কাজ করছে। এর ভিত্তি—
চাঁদের জন্ম (Astronomical New Moon) নির্ধারণ
দৃশ্যমানতার বৈজ্ঞানিক মানদণ্ড
আঞ্চলিক দিগন্তভিত্তিক বিশ্লেষণ
আগাম ক্যালেন্ডার প্রণয়ন
তুরস্কসহ কয়েকটি দেশ বহু বছর ধরে পূর্বনির্ধারিত ক্যালেন্ডার অনুসরণ করছে। এতে—
রোজা, ঈদ, হজের সময়সূচি আগে থেকেই জানা যায়
প্রশাসনিক ও আন্তর্জাতিক সমন্বয় সহজ হয়
বিভ্রান্তি কমে
*৫. মতভেদ*
চাঁদ দেখা নিয়ে দুটি প্রধান মত রয়েছে—
*(১) ইখতিলাফুল মাতালি’ (স্থানীয় দিগন্তভিত্তিক পদ্ধতি)*:
প্রতিটি অঞ্চল নিজস্ব চাঁদ দেখার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেবে।
*(২) ইত্তিহাদুল মাতালি’ (বিশ্বব্যাপী একক গ্রহণযোগ্যতা)*:
এক অঞ্চলে চাঁদ দেখা গেলে তা অন্য অঞ্চলের জন্যও গ্রহণযোগ্য হতে পারে।
১৯৮৬ সালের আম্মান সিদ্ধান্ত এই দুই মতের মাঝখানে সমন্বয়ের একটি নীতিগত পথ দেখিয়েছে।
*৬. বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট*:
বাংলাদেশ Organisation of Islamic Cooperation-এর সদস্য রাষ্ট্র। ফলে আন্তর্জাতিক ফিকাহি সিদ্ধান্ত অনুসরণ করার সুযোগ ও কাঠামো রয়েছে।
বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক আল-হেলাল কমিটি কাজ করছে। বিজ্ঞানী ড. শমশের আলী জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক সমন্বয়ের পক্ষে যুক্তি দিয়েছেন। তার মতে—
আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিভ্রান্তি দূর করে বৈশ্বিক ঐক্য প্রতিষ্ঠা সম্ভব।
যদি সরকার, আলেম সমাজ, জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও আন্তর্জাতিক ফিকাহ বিশেষজ্ঞরা একত্রে বসেন, তবে বাংলাদেশ একটি সমন্বিত নীতিমালা প্রণয়ন করতে পারে।
*৭. রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও বাস্তব সম্ভাবনা*:
তারেক রহমানের বক্তব্যের ইতিবাচক দিক হলো—
সংলাপের আহ্বান
আলেম সমাজকে অগ্রাধিকার
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটের প্রতি সচেতনতা
১৯৮৬ সালের আম্মান ঘোষণার আলোকে বলা যায়—এটি অসম্ভব নয়; তবে প্রয়োজন—
(১) শরঈ ব্যাখ্যার ঐকমত্য,
(২) জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক তথ্যের মানসম্মত ব্যবহার,
(৩) রাষ্ট্রীয় নীতিগত সিদ্ধান্ত
(৪) আন্তর্জাতিক সমন্বয়।
*৮. সরকারের কর্তব্য*:
১৯৮৬ সালের আম্মানে সারাবিশ্বের সেরা ফিকাহ শাস্ত্রবিদগণ একত্রিত হয়ে ঘোষণা দেখিয়েছে যে, ঐক্যের পথ শরিয়াহর ভেতরেই খোলা রয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তি সেই পথকে আরও সুগম করেছে।
রোজা ও ঈদ একই দিনে পালনের প্রশ্নটি কেবল ক্যালেন্ডারের প্রশ্ন নয়; এটি উম্মাহর ঐক্য, জ্ঞানভিত্তিক সিদ্ধান্ত এবং আধুনিকতার সঙ্গে শরিয়াহর সমন্বয়ের প্রশ্ন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রস্তাব সেই আলোচনাকে নতুন প্রাণ দিয়েছে। এখন প্রয়োজন আবেগ নয়, প্রজ্ঞা; বিভাজন নয়, ঐক্য; তর্ক নয়, জ্ঞানসমৃদ্ধ সংলাপ।
সম্ভবত ইতিহাস আবার ১৯৮৬ সালের আম্মানের দিকে তাকিয়ে আছে—নতুন বাস্তবতায় পুরনো ঐক্যের আহ্বানকে বাস্তবে রূপ দিতে। সেজন্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করার জন্য ইসলামি ফাউণ্ডেশনের মাধ্যমে সরকারেরই উদ্যোগ নিতে হবে। তা-হলে, আগামী ঈদ থেকেই প্রস্তাবটি বাস্তবায়ন সম্ভব।