মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৩৯ পূর্বাহ্ন

শিরোনাম
নবীগঞ্জে ছোট বোন হত্যা মামলার প্রধান আসামি শাহীন সিলেট থেকে গ্রেফতার মাগুরায় ছাত্রদলের পরিছন্নতা কর্মসুচির উদ্বোধন Behind Washington’s Escape from Tel Aviv…* *—Professor M. A. Barnik তেল-আবিব থেকে ওয়াশিংটনের পলায়নের অন্তরালে…* *—অধ্যাপক এম এ বার্ণিক মিরপুরে জাঁকজমকপূর্ণ Futsal League 2026 মিনি বার ফুটবল টুর্নামেন্ট CRINK: Why Are China, Russia, Iran and North Korea Forming a Military Security Belt* *—-Professor M. A. Barnik CRINK : চীন রাশিয়া ইরান নর্থ-কোরিয়া মিলে সামরিক নিরাপত্তা বলয় কেন* *—-অধ্যাপক এম এ বার্ণিক উন্নয়নের স্বার্থে দেশ বিরোধী ষড়যন্ত্রকারিদের কোন ছাড় দেয়া হবেনা  —জেলা আইন শৃঙ্খলা সভায় এম পি মনোযার হোসেন খান ডিভাইসের আসক্তি থেকে শিশু-কিশোরদের মাঠে ফেরাতে হবে: আমিনুল হক সামাজিক শান্তি শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় রাসূল( সঃ) এর আর্দশের কোনো বিকল্প নেই – মাগুরার সেমিনারে ড, রফিকুল ইসলাম

তেল-আবিব থেকে ওয়াশিংটনের পলায়নের অন্তরালে…* *—অধ্যাপক এম এ বার্ণিক

সংবাদদাতা / ৬ বার ভিউ
সময়ঃ মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৩৯ পূর্বাহ্ন

১. পলায়ন নয় অপকৌশল*

মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক ভূরাজনীতিতে একটি অদ্ভুত দৃশ্য ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে—যে ওয়াশিংটন একসময় তেল-আবিবের পাশে দাঁড়িয়ে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে নেমেছিল, সেই ওয়াশিংটনই এখন যুদ্ধের দীর্ঘসূত্রতা, অর্থনৈতিক চাপ ও রাজনৈতিক ঝুঁকি থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজছে।

এটি কি সত্যিই তেল-আবিব থেকে ওয়াশিংটনের পলায়ন? নাকি এর অন্তরালে রয়েছে আরও গভীর কোনো কৌশল?

*২. আমেরিকার স্বার্থের হিসাব বদলে গেছে*

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্পর্ক ভেঙে পড়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো এখনই যুক্তিসঙ্গত নয়। বরং বাস্তবতা হলো, মিত্রতা অটুট রেখেই দুই দেশের কৌশলগত স্বার্থের মধ্যে ফাটল তৈরি হয়েছে।

The Washington Post ১১ আগস্ট ২০২৬-এর প্রতিবেদনে লিখেছে, ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু এখন নিজেদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রয়োজনের কারণে বিপরীত দিকে টান অনুভব করছেন এবং দুই দেশের সম্পর্ক “greater stress”-এর মধ্যে রয়েছে। একই প্রতিবেদনে গাজা ও ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে মতবিরোধের কথাও উঠে এসেছে।

অর্থাৎ বন্ধুত্বের মুখোশটি অক্ষত থাকলেও যুদ্ধের লক্ষ্য ও যুদ্ধ শেষ করার পদ্ধতি নিয়ে দুই রাজধানীর হিসাব এক নয়।

*৩. ওয়াশিংটনের স্বার্থ সংরক্ষণ*

ইরানের বিরুদ্ধে অভিযান শুরুর সময় দ্রুত ফল পাওয়ার প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হয়েছে।

২৮ জুলাইয়ের The Washington Post প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরান যুদ্ধ কয়েক সপ্তাহের মধ্যে শেষ হওয়ার প্রত্যাশা থেকে দীর্ঘ সংঘাতে পরিণত হয়েছে এবং ট্রাম্প যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজছেন। একই সময়ে ইরানের পাল্টা আক্রমণ ও গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথের ওপর চাপ বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারকেও অস্থির করেছে।

এখানেই ওয়াশিংটনের কৌশলগত অস্বস্তি।

ইসরায়েলের নিরাপত্তার জন্য যুদ্ধ করা আর আমেরিকার জাতীয় স্বার্থে যুদ্ধ করা—দুটি এক বিষয় নয়।

*৪. দায়মুক্তির অপচেষ্টা*

এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলটি হলো—ইসরায়েলকে সামরিকভাবে সামনে রেখে যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে ধীরে ধীরে যুদ্ধের সরাসরি দায় থেকে সরিয়ে নিতে পারে।

যুদ্ধ চলবে ইসরায়েলের নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক হুমকির যুক্তিতে; কিন্তু যুদ্ধ থামানোর সময় ওয়াশিংটন বলবে—এখন কূটনীতির সময়।

এটি এক ধরনের strategic distancing—মিত্রকে পরিত্যাগ নয়, বরং প্রয়োজনের মুহূর্তে দূরত্ব তৈরি করে নিজের ঝুঁকি কমানো।

Reuters-এর ২২ জুনের প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্কের ওপর “fissures” বা ফাটলের কথা উল্লেখ করা হয়। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, ট্রাম্প প্রশাসনের ইরান-নীতি ও লেবাননে ইসরায়েলি সামরিক তৎপরতা নিয়ে ইসরায়েলে উদ্বেগ বাড়ছিল।

*৫. নেতানিয়াহুকে নয়, ইসরায়েলকে ধরে রাখা*

ওয়াশিংটনের কাছে প্রশ্নটি এখন হয়তো শুধু “নেতানিয়াহুর সঙ্গে আমরা কতটা একমত?” নয়; বরং “নেতানিয়াহুর পরেও ইসরায়েলের সঙ্গে আমাদের কৌশলগত সম্পর্ক কীভাবে অটুট থাকবে?”

কারণ ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। Reuters-এর ৮ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনের আগে নেতানিয়াহু ডানপন্থী জোটকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য প্রবল চাপের মুখে রয়েছেন এবং তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান আগের তুলনায় দুর্বল হয়েছে।

তাই ওয়াশিংটনের বর্তমান দূরত্বকে একজন নেতার সঙ্গে সম্পর্কের সংকট হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়বে না।

সম্ভবত আমেরিকা নেতানিয়াহু-নির্ভর সম্পর্ক থেকে ইসরায়েল-নির্ভর সম্পর্কের দিকে যেতে চাইছে।

*৬. যুদ্ধের ময়দান থেকে কূটনীতির টেবিলে প্রত্যাবর্তন*

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ওয়াশিংটন সামরিক বিজয়ের পরিবর্তে এখন কূটনৈতিক সমাধানের রাস্তা খুঁজলে তার অর্থ এই নয় যে আমেরিকা পরাজয় স্বীকার করেছে।

বরং এটি হতে পারে যুদ্ধের ফলকে রাজনৈতিক অর্জনে রূপান্তর করার চেষ্টা।

যুদ্ধ দিয়ে ইরানকে দুর্বল করা, তারপর কূটনীতি দিয়ে সেই দুর্বলতার ওপর একটি নতুন আঞ্চলিক সমঝোতা দাঁড় করানো—এমন কৌশল আমেরিকার জন্য সামরিক ব্যয়ের তুলনায় অনেক বেশি সুবিধাজনক।

*৭. নিজের প্রত্যাবর্তনের পথ তৈরি*

সবচেয়ে সূক্ষ্ম জায়গাটি এখানেই।

যুক্তরাষ্ট্র যদি তেল-আবিবের কিছু সামরিক সিদ্ধান্তের প্রকাশ্য বিরোধিতা করে, তাহলে আন্তর্জাতিক মহলে ওয়াশিংটন নিজেকে ইসরায়েলি সামরিক কর্মকাণ্ড থেকে কিছুটা আলাদা হিসেবে উপস্থাপন করতে পারে।

এতে একদিকে ইসরায়েলের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক থাকবে, অন্যদিকে আরব ও মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক যোগাযোগের দরজাও খোলা থাকবে।

The Washington Post ১৯ জুন জানিয়েছিল, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো আশঙ্কা করছিল যে নেতানিয়াহু ইরানের সঙ্গে ট্রাম্পের শান্তি প্রচেষ্টাকে দুর্বল করতে পারেন এবং লেবাননে সামরিক অভিযান অব্যাহত রাখতে পারেন।

অর্থাৎ ওয়াশিংটনের উদ্বেগ শুধু যুদ্ধের ফল নিয়ে নয়; ইসরায়েল যেন আমেরিকার কূটনৈতিক পরিকল্পনাকে বিপর্যস্ত না করে—সেটিও বড় উদ্বেগ।

*৮. সত্যিই পলায়ন?*

আমার বিশ্লেষণে—এটি সম্পূর্ণ পলায়ন নয়; বরং কৌশলগত পশ্চাদপসরণ।

পলায়ন শব্দটি এখানে রাজনৈতিক রূপক। ওয়াশিংটন তেল-আবিবকে ছেড়ে যাচ্ছে না; বরং তেল-আবিবের সঙ্গে এমন দূরত্ব তৈরি করছে, যাতে যুদ্ধের সম্পূর্ণ দায় তার কাঁধে না পড়ে।

Reuters-এর সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, ইরান যুদ্ধ এখন দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করেছে এবং ট্রাম্পের যুদ্ধবিরোধী রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে বর্তমান যুদ্ধের বাস্তবতা সাংঘর্ষিক হয়ে উঠছে।

অর্থাৎ যে যুদ্ধের দরজা দিয়ে ওয়াশিংটন তেল-আবিবের সঙ্গে প্রবেশ করেছিল, সেই যুদ্ধের দরজা দিয়েই এখন বেরিয়ে আসার পথ খুঁজছে।

*৯. পলায়নের আড়ালে নতুন দাবার চাল*

মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে সবচেয়ে বিপজ্জনক ভুল হলো দৃশ্যমান ঘটনাকে চূড়ান্ত সত্য মনে করা।

তেল-আবিব থেকে ওয়াশিংটনের দূরত্ব যদি সত্যিই বাড়তে থাকে, তাহলে সেটিকে ইসরায়েল-আমেরিকা সম্পর্কের অবসান বলা যাবে না। বরং এটি হতে পারে যুদ্ধের দায় পুনর্বণ্টন, রাজনৈতিক ঝুঁকি কমানো, ইরানকে নতুনভাবে মোকাবিলা করা এবং যুদ্ধ-পরবর্তী মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার কাঠামো নিজের অনুকূলে সাজানোর প্রস্তুতি।

তাই প্রশ্নটি হওয়া উচিত—
ওয়াশিংটন কি তেল-আবিব থেকে পালাচ্ছে, নাকি তেল-আবিবকে সামনে রেখে নিজের পরবর্তী প্রত্যাবর্তনের পথ তৈরি করছে?

সম্ভবত দ্বিতীয় ব্যাখ্যাটিই বেশি বাস্তবসম্মত।

কারণ পরাশক্তির ভূরাজনীতিতে পলায়নও কখনো কখনো কৌশল—আর পশ্চাদপসরণও হতে পারে পরবর্তী আক্রমণের প্রস্তুতি।

*[ অধ্যাপক এম এ বার্ণিক — আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক পর্যবেক্ষক ও উচ্চমার্গের প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ]*


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


[prayer_time pt="on" sc="on"]