মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:৫১ অপরাহ্ন
১. জনগণের কাছে ড. ইউনূসের দায়বদ্ধতা :
২০২৪ সালের জুলাই মাসে দেশের রাজনীতি ও জনগণের জীবনে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা ঘটে। দীর্ঘ দিনের গণআন্দোলন ও জাতীয় ঐক্যের মধ্য দিয়ে অর্জিত ‘জুলাই ঘোষণাপত্র’—যা থেকে প্রত্যাশা করা হয়েছিল সুশাসন, বিচারিক সংস্কার ও অবাধ নির্বাচন—দেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে গভীর আশা জাগায়। এই ঘোষণার ভিত্তিতে তৈরি হওয়ার কথা ছিল ‘জুলাই সনদ’। এই সনদের মাধ্যমে ড. মুহম্মদ ইউনূস প্রতিশ্রুতি দেন একটি গণপরিষদ গঠন ও নতুন সংবিধান প্রণয়নের, যার উদ্দেশ্য ছিল রাজনীতি থেকে পরিবারতন্ত্র, দুর্নীতি ও অনিয়মের অবসান।
২. ড. মুহম্মদ ইউনূসের দায়িত্ব ও জনআকাঙ্ক্ষা :
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর ড. মুহম্মদ ইউনূসের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়—রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সংস্কারের মাধ্যমে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করা। জনগণ ও রাজনীতিবিদরা প্রত্যাশা করেছিলেন, তিনি সর্বপ্রথম—
(১). রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐক্য ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করবেন,
(২). নির্বাচন কমিশন ও নির্বাচনী ব্যবস্থার কাঠামোগত সংস্কার করবেন,
(৩). আইন ও বিচারব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনবেন,
(৪). পুলিশ, প্রশাসন ও সশস্ত্র বাহিনীতে রূপান্তর ঘটাবেন,
(৫). রাজনীতি থেকে পরিবারতন্ত্র ও স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী দূর করবেন।
তাদের বিশ্বাস ছিল, এসব সংস্কার বাস্তবায়নের পর নির্বাচন হলে জনগণের আস্থা ফিরবে এবং দেশের রাজনীতি নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে।
৩. সংস্কার বনাম নির্বাচনের দ্বন্দ্ব :
কিন্তু সম্প্রতি দেখা যাচ্ছে, ড. ইউনূস প্রয়োজনীয় সংস্কারগুলো পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের ওপর ছেড়ে দিয়ে দ্রুত নির্বাচন আয়োজনের দিকে ঝুঁকছেন। এ নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও জনমতে নানা উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। অনেকে আশঙ্কা করছেন, নির্বাচনের আগে প্রয়োজনীয় সংস্কার না হলে নির্বাচন হবে দায়সারা ও অস্থিতিশীলতার উৎস।
একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক মন্তব্য করেছেন—
> “দ্রুত নির্বাচন দিলে হয়তো ক্ষমতার পরিবর্তন হবে, কিন্তু দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামোর পরিবর্তন হবে না। এতে পুনরায় দুর্নীতি, আত্মসাৎ ও অস্থিরতা বাড়বে।”
৪. অভিযোগ — বিএনপির স্বার্থে লেখা জুলাই ঘোষণাপত্র :
৫ জুলাই ঘোষিত ‘জুলাই ঘোষণাপত্র’কে লেখক ও চিন্তক ফরহাদ মাজহার তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি এটিকে ‘এস আলমের ঘোষণাপত্র’ বলেও উল্লেখ করেন, যা ইঙ্গিত করে এটি বিএনপি নামের একটি গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষার জন্য তৈরি। বিশেষ করে তিনি বলেছেন—
> “এই ঘোষণাপত্র রাজনৈতিকভাবে একটি নির্দিষ্ট দল, অর্থাৎ বিএনপির স্বার্থ রক্ষার জন্য লেখা হয়েছে। এটি জনগণের প্রত্যাশার বিপরীত এবং জাতীয় ঐক্যের পরিবর্তে বিভাজন সৃষ্টি করবে।”
অন্যান্য বিশ্লেষকরাও এই সমালোচনার সাথে একমত, যারা মনে করেন এটি জাতীয় ঐক্যের বদলে ক্ষমতার একতরফা দখলের প্রচেষ্টা।
৫. জনগণের প্রত্যাশা ও রাজনৈতিক বাস্তবতা :
দেশের জনগণ দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক বৈষম্য, দুর্নীতি ও বিচারহীনতার শিকার। জুলাই বিপ্লবের মতো গণআন্দোলনের পেছনে ছিল এক অভিন্ন লক্ষ্য—দীর্ঘ দুঃশাসন থেকে মুক্তি, সাম্যের রাজনীতি ও সত্যিকারের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা। এই জনআকাঙ্ক্ষা আজও অপরিবর্তিত—তাই তারা চাইছেন, দিকনির্দেশক সংস্কার ছাড়া নির্বাচন নয়।
অন্যদিকে, রাজনৈতিক মহলেও বোঝা যাচ্ছে, কেবল নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার বদল হলে পুরনো সমস্যাগুলো আবার নতুন করে মাথাচাড়া দেবে। তাই কিছু মহল দাবি করছে, নির্বাচনের আগে নিম্নলিখিত সংস্কার নিশ্চিত করতে হবে—
(১). নির্বাচন কমিশনকে স্বতন্ত্র ও স্বচ্ছ করতে হবে,
(২). বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনতে হবে,
(৩). প্রশাসন, পুলিশ ও সশস্ত্র বাহিনীতে নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে,
(৪). রাজনীতিতে স্বজনপ্রীতি ও পরিবারতন্ত্র নির্মূল করতে হবে।
৬. সার্বিক বিশ্লেষণ ও ভবিষ্যৎ প্রেক্ষাপট :
বর্তমান পরিস্থিতিতে স্পষ্ট, যদি ড. মুহম্মদ ইউনূস সংস্কার ছাড়া দ্রুত নির্বাচন দিয়ে দায়িত্ব শেষ করার পথ বেছে নেন, তবে তাঁর জন্য সরে যাওয়ার কোনো সুযোগ থাকবে না। রাজনৈতিক অঙ্গন ও জনমত—দুটোই তা প্রত্যাখ্যান করবে। নির্বাচনের আগে কাঙ্ক্ষিত সংস্কার ও রাজনৈতিক ঐক্যের মাধ্যমে সুষ্ঠু পরিবেশ সৃষ্টি না করলে দেশের স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।
একজন রাজনীতিবিদ মন্তব্য করেছেন—
> “সংস্কার ছাড়া নির্বাচন মানে পুরনো রোগে নতুন ব্যথা। যদি এভাবে এগোই, তবে আগামী দিনের রাজনীতি আবারও অস্থিরতায় নিমজ্জিত হবে।”
৭. ড. ইউনূস বিরাট চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি :
ড. মুহম্মদ ইউনূসের সামনে এক মহৎ সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ রয়েছে—দেশের রাজনীতিতে দীর্ঘকালীন সংকট ও আস্থা-সংকটের অবসান ঘটানোর জন্য তাঁর পদক্ষেপ জনগণের হৃদয়ে গভীর সাড়া তুলতে পারে, যদি তিনি প্রকৃত অর্থে জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হন। সেই লক্ষ্যে,
সংস্কার ছাড়া দায়সারা নির্বাচন দিয়ে সরে যাওয়ার সুযোগ নেই ড. ইউনূসের।
——-।।———।।———