মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:৪৮ অপরাহ্ন
আল-কুরআন, সূরা আন-নিসা, আয়াত-১৩৫ এ বলা হয়েছে:
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা ইনসাফে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হও, আল্লাহর জন্য সত্যের সাক্ষী হও, যদিও তা তোমাদের নিজেদের বিরুদ্ধে যায়, অথবা পিতা-মাতা কিংবা আত্মীয়-স্বজনের বিরুদ্ধে যায়, তবুও সুবিচার থেকে বিরত হয়ো না।”
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের লাইব্রেরির প্রবেশমুখে এই আয়াতটি খোদিত। পশ্চিমা বিশ্বে যেখানে নানা দার্শনিক উক্তি, আইনবিদদের বাণী তুলে ধরা হয়, সেখানে কুরআনের এই আয়াতকে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ সত্য ঘোষণা করেছে হার্ভার্ড।
প্রকৃতির সৌন্দর্যে ঘেরা আদর্শ অ্যাকাডেমির উঠোনে দাঁড়িয়ে প্রিন্সিপাল পাবেল হোসেন একদিন তার শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে বললেন—
“হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি বিশ্বনন্দিত প্রতিষ্ঠান যদি আল-কুরআনের এই বাণীকে সবার সামনে তুলে ধরে, তাহলে আমাদের, যারা মুসলিম সমাজে জন্ম নিয়েছি, তাদের কি উচিত নয় নিজেদের জীবনে এটি বাস্তবায়ন করা?”
তার কথাগুলো গভীর নীরবতায় ডুবে গেল। শিক্ষার্থীদের চোখে যেন নতুন এক আলো জ্বলে উঠল। আবিদ, তাওহীদ, সামিয়া, মিম, রাহাদ, আয়েশা, মারজান, আফ্রিদি, ছাব্বির, মাহিয়া, সাদিয়া, লামিয়া, মিনজিু, নূহা, সিহান, রিয়া— সকলে সেদিন অঙ্গীকার করল, “আমরা সত্যকে আঁকড়ে ধরব, তা আমাদের বিরুদ্ধে গেলেও।”
ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র আফ্রিদি। তার বাবা জাহিদ মালয়েশিয়ায় প্রবাসী। বাড়িতে মা আসমা বেগমই সংসার সামলান। একদিন দোকান থেকে চিনি কিনে আনতে গেলো। দোকানদার ভুল করে তাকে অতিরিক্ত দেয়। কিন্তু আফ্রিদির মনে, কুরআনের সেই বাণী স্পর্শ করলো। সে দোকানির টাকা ফেরত দিল। কিভাবে ফেরত দিলো এবার দেখুন। আফ্রিদি ঘরে ফিরে কিছুক্ষণ দ্বিধায় ভুগলো। মায়ের কাছে গিয়ে বলল—
— “আম্মা, আমি বেশি টাকা নিয়ে এসেছি। দোকানদার ভুল করেছে। এখন আমি কি করব?”
আসমা বেগম প্রথমে চুপ করে রইলেন। পরে কাঁপা গলায় বললেন—
— “তুই যদি এই টাকা নিজের কাছে রাখিস, আল্লাহর কাছে সেটা হারাম হবে। ফিরিয়ে দে বাবা।”
আফ্রিদি মনে করল, হার্ভার্ডে খোদিত সেই আয়াতই যেন তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। সে টাকা ফিরিয়ে দিয়ে দোকানদারকে বলল—
— “কাকা, এটা আপনি ভুল করে দিয়েছেন।”
দোকানদারের চোখ ছলছল করে উঠল। চারপাশের লোকজন বলল— “এই ছেলে সত্যিকারের শিক্ষা পেয়েছে।”
অষ্টম শ্রেণির ছাব্বিরের বাবা ফিরোজ একজন জেলে। প্রতিদিন ভোরে নদীতে যান মাছ ধরতে। একদিন গ্রামের একটি ঝগড়ায় কিছু ছেলেরা মিথ্যা অভিযোগ আনলো ছাব্বিরের বিরুদ্ধে। তারা বলল, ছাব্বির তাদের জাল কেটেছে।
গ্রাম্য শালিশ বসল। সবাই ছাব্বিরকে চাপে ফেললো। কিন্তু ছাব্বির মাথা উঁচু করে বলল—
— “আমি মিথ্যা বলব না। আমি জাল কাটিনি। যদি প্রমাণ পান করেছি, শাস্তি দিন।”
তার কণ্ঠে ছিল কুরআনের শিক্ষা— সত্য সাক্ষ্য দাও, যদিও তা নিজের বিরুদ্ধে যায়।
পরে সত্য প্রকাশ পায়। গ্রামের সবাই অবাক হয়ে বলে—
— “এই বয়সে এমন সাহস? এই ছেলেই একদিন গ্রামের গর্ব হবে।”
একাদশ শ্রেণির লামিয়া। বাবা মো. কামাল রাজমিস্ত্রী, সংসার চালাতে কষ্ট হয়। একদিন এক বান্ধবী পরীক্ষায় নকল করতে বলল। বলল— “তুই একটু উত্তর লিখে দে, আমি দেখে নেব।”
লামিয়া দ্বিধায় পড়ল। বন্ধুত্ব হারানোর ভয় ছিল। কিন্তু তার মনে পড়ল প্রিন্সিপাল স্যারের কথা— “ন্যায়ের পথে চলতে হলে আপনজনকেও না বলতে হবে।”
পরীক্ষার হলে সে সোজা উত্তর দিল—
— “দুঃখিত, আমি এটা করতে পারব না।”
বন্ধু প্রথমে রাগ করল, কিন্তু পরে বলল— “তুই ঠিক করেছিস। আসল বন্ধু তুই-ই।”
একাদশ শ্রেণির সাদিয়া। বাবা লিটন একজন টাইলস মিস্ত্রী। সাদিয়া একদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে দেখল, তার এক চাচা প্রতিবেশীর জমি দখল করার চেষ্টা করছে। পরিবারের সবার চাপ— “সাদিয়া, চুপ থাক। এটা আত্মীয়ের ব্যাপার।”
কিন্তু সাদিয়া হার্ভার্ডে খোদিত কুরআনের সেই আয়াত মনে করলো। সাহস সঞ্চয় করে সে সবার সামনে বললো—
— “চাচা, এটা অন্যায়। আত্মীয় হলেও অন্যায়কে অন্যায় বলতে হবে।”
চারপাশে গুঞ্জন উঠল। কেউ বললো বেয়াদবি, কেউ বলল সাহস। কিন্তু সেই সত্য উচ্চারণের মধ্য দিয়েই সাদিয়া নিজের জন্য আল্লাহর সন্তুষ্টি পেল।
সেদিন থেকে আদর্শ অ্যাকাডেমির শিক্ষার্থীরা বুঝলো— সত্যকে আঁকড়ে ধরা মানে কেবল মুখে বলা নয়, জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে তা বাস্তবায়ন করা। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় যে কুরআনের আয়াতকে বিশ্বের সেরা সত্য বলে ঘোষণা করল, সেই সত্যকে বাস্তবে বাঁচিয়ে তুললো ভোলার হাসাননগরের এই কিশোর-কিশোরীরা।
প্রিন্সিপাল পাবেল হোসেন ক্লাস শেষে শুধু বললেন—
“তোমরাই আমাদের ভবিষ্যৎ হার্ভার্ড।”

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের প্রবেশপথে আল-কুরআন, সূরা নিসা, আয়াত ১৩৫ শোভা পাচ্ছে
–