বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই ২০২৬, ০২:৩৭ পূর্বাহ্ন
সরকার যখন কোনো পরিপত্র জারি করে, তখন তা কেবল একটি প্রশাসনিক নির্দেশ নয়; বরং রাষ্ট্র পরিচালনার একটি নীতিগত অবস্থানের প্রতিফলন। সে নির্দেশনা মেনে চলার দায়িত্ব সাধারণ নাগরিক থেকে শুরু করে জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতা, ব্যবসায়ী, গণমাধ্যম—সবার ওপরই সমানভাবে বর্তায়।
দৈনিক ইত্তেফাক-এর ৬ জুলাই ২০২৬ সংখ্যায় প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, সরকার প্রচারপত্র, ব্যানার, ফেস্টুন ও অনুরূপ প্রচারণামূলক উপকরণে প্রধানমন্ত্রীর ছবি ব্যবহার না-করার জন্য একটি পরিপত্র জারি করে। এই সিদ্ধান্তের উদ্দেশ্য ছিল রাষ্ট্রীয় পদকে ব্যক্তিগত বা প্রাতিষ্ঠানিক প্রচারণার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার নিরুৎসাহিত করা এবং সরকারি নির্দেশনার প্রতি সবার সমান আনুগত্য নিশ্চিত করা।
কিন্তু এর অল্প সময়ের মধ্যেই একটি ঘটনা জনমনে প্রশ্নের সৃষ্টি করেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ৮ জুলাই ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত প্রথম আলো পত্রিকায় Shrimp Hatchery Association of Bangladesh-এর একটি বিজ্ঞাপনে সংগঠনের সভাপতি ও বিএনপির সংসদ সদস্য লুৎফর রহমান কাজল হাত উত্তোলিত ভঙ্গিতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ছবি ছেপে দিয়েছেন। বিষয়টি একবাক্যে সরকারি পরিপত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
প্রশ্ন হলো, একজন সংসদ সদস্য কি সরকারি নির্দেশনা সম্পর্কে অবগত ছিলেন না? নাকি নির্দেশনাটি জেনেও তা উপেক্ষা করা হয়েছে? উভয় ক্ষেত্রই উদ্বেগের বিষয়।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে—দেশের অন্যতম প্রভাবশালী জাতীয় দৈনিক বিজ্ঞাপনটি প্রকাশের আগে সরকারি নির্দেশনার সঙ্গে এর সামঞ্জস্য যাচাই করেছিল কি? বিজ্ঞাপন প্রকাশের স্বাধীনতা যেমন রয়েছে, তেমনি আইন ও সরকারি নির্দেশনা অনুসরণ করার দায়িত্বও রয়েছে।
এ ধরনের ঘটনা যদি কোনো সাধারণ ব্যক্তি বা ছোট প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ঘটত, তবে কি একই ধরনের নীরবতা দেখা যেত? নাকি দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হতো? আইনের শাসনের মূলনীতি হলো—আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান। এই নীতির ব্যত্যয় ঘটলে রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
কেন বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ?
(১) সরকারি পরিপত্রের কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
(২) জনপ্রতিনিধিদের আইনের প্রতি আনুগত্য নিয়ে জনমনে সংশয় সৃষ্টি হয়।
(৩) গণমাধ্যমের পেশাগত দায়িত্ব ও বিজ্ঞাপন যাচাই প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
(৪) ভবিষ্যতে অন্য ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানও সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষা করতে উৎসাহিত হতে পারে।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব হলো,
এই অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা হোক। যদি সরকারি পরিপত্র লঙ্ঘনের ঘটনা প্রমাণিত হয়, তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান এবং বিজ্ঞাপন প্রকাশে সম্পৃক্তদের কাছ থেকে ব্যাখ্যা চাওয়া এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।
আইনের শাসন তখনই অর্থবহ হয়, যখন তার প্রয়োগ ব্যক্তি, দল, পদ বা প্রতিষ্ঠানের পরিচয় দেখে নয়; বরং সমভাবে সবার ক্ষেত্রে নিশ্চিত করা হয়।
উপসংহারে বলতেই হয় যে,
সরকারি নির্দেশনা কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি রাষ্ট্র পরিচালনার একটি বাধ্যতামূলক নীতিমালা। একজন সংসদ সদস্য, একটি জাতীয় সংগঠন এবং একটি শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্র—সবার কাছ থেকেই জনগণ অধিকতর দায়িত্বশীল আচরণ প্রত্যাশা করে। তাই এ ধরনের অভিযোগকে উপেক্ষা না করে স্বচ্ছ তদন্ত, প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা এবং আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমেই আইনের শাসনের প্রতি জনগণের আস্থা সুদৃঢ় করা সম্ভব।