বৃহস্পতিবার, ০২ জুলাই ২০২৬, ০৪:২৯ পূর্বাহ্ন
-অধ্যাপক এম এ বার্ণিক*
কূটনীতি এমন এক শিল্প, যেখানে শব্দের ওজন অনেক সময় কামানের গোলার চেয়েও ভারী। রাষ্ট্রের পতাকা, রাষ্ট্রদূতের পরিচয় এবং প্রোটোকলের প্রতিটি ধাপ আন্তর্জাতিক সম্পর্কের নীরব ভাষা। সেখানে সামান্য শৈথিল্যও কখনও কখনও একটি রাষ্ট্রের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিতে পারে।
সম্প্রতি ভারত সরকার বাংলাদেশে নিযুক্ত তাদের রাষ্ট্রদূতকে মন্ত্রীর সমমর্যাদা প্রদান করেছে—এমন তথ্য জনপরিসরে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, বাংলাদেশ কি এখন সেই রাষ্ট্রদূতকে একজন মন্ত্রীর মতোই অতিরিক্ত মর্যাদা ও প্রোটোকল দিতে বাধ্য?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে ফিরে যেতে হবে আন্তর্জাতিক কূটনীতির অন্যতম ভিত্তিপ্রস্তর ভিয়েনা কনভেনশন অন ডিপ্লোম্যাটিক রিলেশনস, ১৯৬১-এ।
ভিয়েনা কনভেনশনের Article 29 অনুযায়ী রাষ্ট্রদূতের ব্যক্তি অলঙ্ঘনীয় (Inviolable)। তাঁকে গ্রেপ্তার বা আটক করা যাবে না এবং তাঁর মর্যাদা রক্ষায় স্বাগতিক রাষ্ট্রের বিশেষ দায়িত্ব রয়েছে।
আবার Article 22 অনুযায়ী দূতাবাসের ভবন ও কূটনৈতিক মিশন বিশেষ সুরক্ষা ভোগ করে।
এছাড়া Article 26 রাষ্ট্রদূতের স্বাধীনভাবে চলাচলের অধিকার এবং Article 29–36 পর্যন্ত বিভিন্ন ধারায় রাষ্ট্রদূতের নিরাপত্তা, কর-সুবিধা, বিচারিক দায়মুক্তি এবং কূটনৈতিক বিশেষাধিকার নির্ধারণ করা হয়েছে।
কিন্তু লক্ষণীয় বিষয় হলো—ভিয়েনা কনভেনশনের কোথাও বলা নেই যে, প্রেরণকারী রাষ্ট্র (Sending State) যদি নিজ দেশে রাষ্ট্রদূতকে মন্ত্রীর প্রশাসনিক মর্যাদা দেয়, তাহলে গ্রহণকারী রাষ্ট্র (Receiving State) সেই অতিরিক্ত প্রশাসনিক মর্যাদা বা প্রোটোকল দিতে বাধ্য হবে।
বরং Article 14 রাষ্ট্রদূতের কূটনৈতিক শ্রেণিবিন্যাস নির্ধারণ করেছে, আর Article 47 বলেছে, কোনো রাষ্ট্র চাইলে সৌজন্যবশত অতিরিক্ত সুবিধা দিতে পারে; তবে তা আন্তর্জাতিক আইনের বাধ্যবাধকতা নয় এবং বৈষম্যমূলকও হওয়া যাবে না।
অর্থাৎ, ভারত যদি তাদের রাষ্ট্রদূতকে মন্ত্রীর সমমর্যাদা প্রদান করে, সেটি ভারতের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত। বাংলাদেশ চাইলে পারস্পরিক সৌহার্দ্য, কূটনৈতিক রীতি বা দ্বিপক্ষীয় বিবেচনায় কিছু অতিরিক্ত সৌজন্য প্রদর্শন করতে পারে; কিন্তু ভিয়েনা কনভেনশন অনুযায়ী তা বাধ্যতামূলক নয়।
কূটনীতির রাজপথে মর্যাদা কেবল পদবির অলংকারে নির্ধারিত হয় না; বরং আন্তর্জাতিক আইনের কাঠামোয় নির্ধারিত হয়। রাষ্ট্রদূতের সম্মান যেন সমুদ্রযাত্রার বাতিঘর—তার আলো নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে পথ দেখায়। কিন্তু সেই আলোকে সূর্যের মর্যাদা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা অন্য রাষ্ট্রের নেই।
বাংলাদেশেরও উচিত হবে আন্তর্জাতিক আইন, পারস্পরিক সম্মান এবং রাষ্ট্রের মর্যাদার ভারসাম্য রক্ষা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া। কূটনৈতিক সৌজন্য যেন কখনও আত্মসম্মানের বিনিময়ে না হয়, আবার আত্মমর্যাদার প্রশ্ন যেন অযথা কূটনৈতিক শীতলতায় পরিণত না হয়।
রাষ্ট্রের সম্পর্ক নদীর মতো—অতিরিক্ত বাঁধ দিলে প্রবাহ থেমে যায়, আবার সীমাহীন উন্মুক্ততা ভাঙন ডেকে আনে। তাই ভিয়েনা কনভেনশনের নির্দেশিত সীমানার মধ্যেই মর্যাদা, প্রোটোকল ও পারস্পরিক সম্মান রক্ষা করাই আন্তর্জাতিক কূটনীতির সর্বোত্তম পথ।