রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬, ১১:৪১ অপরাহ্ন
রাতের শেষ প্রহরে যখন হাসপাতালের করিডোরে নিঃশব্দে হেঁটে যায় উদ্বেগ, তখন পৃথিবীর সবচেয়ে অসহায় শব্দটি হয় একটি শিশুর কাঁদা। সেই কান্না শুধু ব্যথার নয়; সেটি মায়ের বুকের ভেতর জমে থাকা ঝড়ের শব্দ, বাবার কাঁধে নেমে আসা পাহাড়ের ভার, আর জীবনের সঙ্গে মৃত্যুর শেষ লড়াইয়ের আর্তনাদ।
সম্প্রতি আদ্বীন হাসপাতালে ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় ছয়টি শিশুর মৃত্যু জাতিকে শোকাহত করেছে। প্রতিটি শিশুর মৃত্যু একটি সম্ভাবনার মৃত্যু, একটি পরিবারের স্বপ্নভঙ্গ, একটি ভবিষ্যতের অকাল সমাপ্তি। কোনো ভাষা, কোনো পরিসংখ্যান, কোনো প্রশাসনিক ব্যাখ্যা সেই শূন্যতা পূরণ করতে পারে না।
কিন্তু শোকের উত্তাপে যখন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তখন আবেগের সঙ্গে বিবেকেরও প্রয়োজন হয়।
প্রশ্ন হলো, যদি একটি দুর্ঘটনার দায়ে একটি হাসপাতাল সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়, তবে সেখানে চিকিৎসাধীন শত শত শিশুর জীবন ও চিকিৎসার দায়িত্ব কে নেবে?
যে শিশুটি ইনকিউবেটরে শুয়ে জীবনের জন্য লড়ছে, যে নবজাতকটি অক্সিজেনের নলের সঙ্গে ভবিষ্যৎকে আঁকড়ে ধরে আছে, যে মা প্রতিদিন হাসপাতালের বিছানার পাশে বসে সন্তানের কপালে হাত রেখে দোয়া করছেন—তাদের ভাগ্যে কী লেখা হবে?
একটি হাসপাতাল কেবল ইট, বালু ও সিমেন্টের স্থাপনা নয়। এটি অনেক সময় মানুষের শেষ আশ্রয়। অসুস্থ শিশুদের কাছে হাসপাতাল মানে দ্বিতীয় জীবন। সেই দরজা হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেলে বহু পরিবার নতুন করে বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে।
সমাজবিজ্ঞানীরা বলেন, একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতার দায় নির্ধারণ করতে হয় ব্যক্তি, ব্যবস্থাপনা ও নীতিগত ত্রুটির ভিত্তিতে। দায়ী ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনা ন্যায়বিচারের শর্ত। কিন্তু একই সঙ্গে নিরীহ রোগীদের জীবনরক্ষাও রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে।
বাংলাদেশের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে গত কয়েক দশকে চিকিৎসা অবহেলা, সংক্রমণ, অগ্নিকাণ্ড, অক্সিজেন সংকট কিংবা অন্যান্য কারণে বহু শিশুর মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। যদি প্রতিটি দুর্ঘটনার পর সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেওয়া হতো, তাহলে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা কতটুকু টিকে থাকত?
একজন দক্ষ সার্জনের অস্ত্রোপচারে ভুল হলে কি পুরো চিকিৎসাবিজ্ঞান নিষিদ্ধ করা হয়?
একটি সেতুতে দুর্ঘটনা ঘটলে কি পুরো সড়কব্যবস্থা বন্ধ করে দেওয়া হয়?
মাথায় ব্যথা হলে কি তার সমাধান মাথা কেটে ফেলা?
মানবসভ্যতার ইতিহাস বলে, ভুলের শাস্তি হতে পারে; কিন্তু জীবনরক্ষাকারী ব্যবস্থার ধ্বংস কখনো সমাধান নয়। সমাধান হলো সংস্কার, জবাবদিহি, নিরাপত্তা বৃদ্ধি এবং দায়ীদের বিচার।
আজ প্রয়োজন দুটি বিষয়কে একসঙ্গে দেখা।
প্রথমত, নিহত ছয় শিশুর পরিবারের প্রতি পূর্ণ ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা।
দ্বিতীয়ত, বর্তমানে চিকিৎসাধীন শত শত শিশুর চিকিৎসা অব্যাহত রাখা।
কারণ একটি শিশুর মৃত্যু যেমন জাতির ক্ষতি, তেমনি চিকিৎসাবঞ্চিত হয়ে আরেকটি শিশুর মৃত্যু ঘটাও সমান মানবিক বিপর্যয়।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু অপরাধীকে খুঁজে বের করা নয়; রাষ্ট্রের দায়িত্ব জীবিতদেরও রক্ষা করা।
আজ শোকাহত মায়েদের চোখের জল আমাদের বিবেককে প্রশ্ন করছে। একই সঙ্গে হাসপাতালের বেডে শুয়ে থাকা অসুস্থ শিশুরাও নীরবে প্রশ্ন করছে—“আমাদের চিকিৎসা কি বন্ধ হয়ে যাবে?”
এই দুই প্রশ্নের উত্তর একই সঙ্গে খুঁজতে হবে।
ন্যায়বিচার চাই, কিন্তু প্রতিশোধের নামে নতুন বিপর্যয় নয়।
দোষীদের শাস্তি চাই, কিন্তু নিরপরাধ শিশুদের চিকিৎসার পথ রুদ্ধ করে নয়।
কারণ মানবতার সবচেয়ে সুন্দর পরিচয় হলো—একটি প্রাণ হারানোর বেদনা অনুভব করার পাশাপাশি আরেকটি প্রাণকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করা।
শিশুর কবরের মাটি যেমন আমাদের কাঁদায়, তেমনি হাসপাতালের শয্যায় শুয়ে থাকা অসুস্থ শিশুর নিশ্বাসও আমাদের দায়িত্বের কথা মনে করিয়ে দেয়।
সুতরাং প্রশ্নটি আজ শুধু একটি হাসপাতালকে ঘিরে নয়; প্রশ্নটি মানবতা, ন্যায়বিচার এবং রাষ্ট্রীয় দায়িত্ববোধকে ঘিরে।
যে জাতি তার মৃত শিশুদের জন্য কাঁদে, সেই জাতিকেই জীবিত শিশুদের জন্যও লড়তে হয়। সেটিই সভ্যতার পথ, সেটিই মানবতার দাবি।