সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬, ১২:৪৩ পূর্বাহ্ন
*শহিদ দিবসের ৭৫ বছর পূর্তিতেও স্বীকৃতির প্রতীক্ষায় ভাষাশহিদরা*
*—অধ্যাপক এম এ বার্ণিক*
ইতিহাসেরও কখনো কখনো স্মৃতিভ্রম হয়।
সে সবকিছু মনে রাখে না। কিছু নাম তার বুকে খোদাই হয়ে থাকে, কিছু নাম ধীরে ধীরে কুয়াশার আড়ালে হারিয়ে যায়। কিন্তু সত্যের এক অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য আছে—সে যতই চাপা পড়ুক, একদিন না একদিন মাটি ফুঁড়ে বেরিয়ে আসে।
আজিমপুর কবরস্থানের শতবর্ষী বৃক্ষগুলো নিশ্চয়ই জানে সেই গল্প।
তারা দেখেছে ১৯৫২ সালের সেই রক্তাক্ত ফেব্রুয়ারিকে। তারা দেখেছে ভাষার জন্য বুক পেতে দেওয়া তরুণদের নিথর দেহ। তারা দেখেছে কবর খোঁড়া হয়েছে, মানুষ কেঁদেছে, ফুল পড়েছে। আবার তারা এটাও দেখেছে—সময়ের নিষ্ঠুর ঝাড়ুদার একে একে মুছে দিয়েছে অনেক চিহ্ন।
২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২।
রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে প্রাণ দিয়েছিলেন রফিক, বরকত, জব্বার, সালাম, শফিউর রহমান ও অহি উল্লাহ। তাঁদের সবাইকে সমাহিত করা হয়েছিল আজিমপুর কবরস্থানে।
কিন্তু ইতিহাসের এক বেদনাময় অধ্যায় হলো—পরিবারের উদ্যোগে কেবল বরকত ও শফিউর রহমানের কবর পাকা করা হয়েছিল। বাকি কবরগুলো কবরস্থান কর্তৃপক্ষের প্রচলিত নিয়মে সময়ের ব্যবধানে বিলুপ্ত হয়ে যায়। ফলে শহিদ রফিক, শহিদ সালাম ও শহিদ জাব্বারের কবর নিশ্চিহ্ন হয়ে পড়ে। আর অহি উল্লাহর কবর গণকবরের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় সেটিও পৃথকভাবে চিহ্নিত ছিল না।
প্রতি বছর ২১ ফেব্রুয়ারি মানুষ ফুল নিয়ে আজিমপুরে আসে। শ্রদ্ধা জানায়। কিন্তু দীর্ঘকাল ধরে ভাষাশহিদ হিসেবে দৃশ্যমান ছিল মাত্র দুটি কবর—বরকত ও শফিউরের।
বাকি শহিদরা যেন নীরবে প্রশ্ন করতেন—
“আমরা কি তবে ইতিহাসের ভেতর আছি, কিন্তু ইতিহাসের বাইরে?”
১৯৯৬ সালে আশার একটি প্রদীপ জ্বলে ওঠে।
তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিব এস এ সামাদ তাঁর ব্যক্তিগত উদ্যোগে শহিদ জাব্বারের ছোট ভাই এএইচএম আসাদ (নয়ন)-এর সহযোগিতায় শহিদ জাব্বারের কবর শনাক্ত ও পাকা করে দেন। শহিদ বরকতের কবরের প্রায় ১০ গজ পশ্চিমে জাব্বারের কবর চিহ্নিত হয়।
কিন্তু রফিক ও সালামের কবর তখনও অন্ধকারের ভেতর রয়ে যায়।
এরপর কেটে যায় আরও ২৮ বছর।
ইতিহাস অপেক্ষা করে।
মাটি অপেক্ষা করে।
অবশেষে ২০২৪ সালে সেই অপেক্ষার অবসান ঘটানোর উদ্যোগ নেন রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের গবেষক অধ্যাপক এম এ বার্ণিক।
দীর্ঘ অনুসন্ধান, তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ, প্রত্যক্ষ উত্তরসূরিদের সাক্ষ্য এবং মাঠপর্যায়ের গবেষণার ভিত্তিতে ৭ এপ্রিল ২০২৪ সালে শহিদ সালামের কবর এবং ২৯ এপ্রিল ২০২৪ সালে শহিদ রফিকের কবর শনাক্ত ও প্রমিতকরণ সম্ভব হয়।
শহিদ সালামের ভাতিজা আমির হোসেন মামুন ৬ এপ্রিল ২০২৪ তারিখে গবেষক দলের সদস্য শামসুল আলম বাবুকে কবরের স্থান দেখিয়ে দেন। পরদিন ৭ এপ্রিল কবরটির সত্যায়ন ও প্রমিতকরণের সময় অধ্যাপক এম এ বার্ণিকের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন মীর শামসুল আলম বাবু, ড. মোমতাজ উদ্দিন আহম্মেদ, কবি সৈয়দ নাজমুল আহসান এবং ড. মআআা মুক্তাদীর।
(সূত্র : মাসিক অগ্নবার্তা, ১৩ এপ্রিল ২০২৪)
অন্যদিকে ২৯ এপ্রিল ২০২৪ সালে শহিদ রফিকের ভাতিজা আবদুর রউফের মাধ্যমে শহিদ রফিকের কবর প্রমিতকরণ করা হয়। এই গবেষণা কার্যক্রমে নেতৃত্ব দেন অধ্যাপক এম এ বার্ণিক। তাঁর সঙ্গে ছিলেন ড. শরীফ সাকি, কবি জান্নাতুন নাঈম এবং সাংবাদিক সাজেদা হক।
(সূত্র : দৈনিক আমাদের বাংলা, ১ মে ২০২৪; দৈনিক সাময়িক প্রসঙ্গ, আসাম, ৫ মে ২০২৪)
এ যেন শুধু দুটি কবরের সন্ধান নয়।
এ যেন হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসের দুটি ঠিকানা পুনরুদ্ধার।
এরপর শহিদ রফিক ও শহিদ সালামের কবর দুটি স্থায়ীভাবে সংরক্ষণের জন্য ঢাকা সিটি করপোরেশনের মেয়রের নিকট আবেদন করা হয়।
অধ্যাপক এম এ বার্ণিকের রচিত পত্রটি মেয়র কার্যালয়ে পৌঁছে দেন কবি জান্নাতুন নাঈম, সাংবাদিক সাজেদা হক এবং শহিদ রফিকের ভাতিজা আবদুর রউফ।
(সূত্র : দৈনিক মুক্তির লড়াই ও দৈনিক আমাদের বাংলা, ১ মে ২০২৪)
কিন্তু দীর্ঘ সময় অতিক্রান্ত হলেও দৃশ্যমান কোনো কার্যক্রম গৃহীত হয়নি।
এদিকে ভাষাশহিদদের জাতীয় বীরের মর্যাদা প্রদানের দাবিও এক দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস।
বাংলাদেশ ভাষা-আন্দোলন মিউজিয়ামের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক এম এ বার্ণিক প্রথম এ দাবিটি উত্থাপন করেন।
(সূত্র : দৈনিক ইত্তেফাক, ৬ ফেব্রুয়ারি ২০০৪; দৈনিক আজকের খবর, ৯ ফেব্রুয়ারি ২০০৪; দৈনিক জনকণ্ঠ, ১১ ফেব্রুয়ারি ২০০৪)
দাবিটি দ্রুত জাতীয় আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়।
এর সমর্থনে বিবৃতি দেন ১৯৫২ সালের সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক কাজী গোলাম মাহবুব, ভাষাসৈনিক গাজীউল হক, ভাষাসৈনিক আবদুল মতিন, ভাষাসৈনিক ডা. মির্জা মাজহারুল ইসলাম, ভাষাসৈনিক ড. হালিমা খাতুন, ভাষাসৈনিক বেগম রওশন আরা বাচ্চু, এম এ বার্ণিক, এম আর মাহবুব ও ডা. আবদুল্লাহ।
(সূত্র : দৈনিক ইত্তেফাক, ১ ফেব্রুয়ারি ২০০৬)
এরপর দেশের দুই প্রথিতযশা কবি শামসুর রাহমান ও আল মাহমুদ পৃথক বিবৃতির মাধ্যমে উক্ত দাবির প্রতি সমর্থন জানান।
ড
(সূত্র : দৈনিক নয়া দিগন্ত, ১২ ফেব্রুয়ারি ২০০৬)
২১ ফেব্রুয়ারি ২০০৬ তারিখে শিশুকল্যাণ পরিষদ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ভাষা-আন্দোলন স্মৃতিরক্ষা পরিষদের সভায় গৃহীত ১১ দফা প্রস্তাবের মধ্যেও ভাষাশহিদদের জাতীয় বীরের মর্যাদা প্রদানের দাবি অন্তর্ভুক্ত ছিল।
(সূত্র : দৈনিক ইত্তেফাক, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০০৬)
১৭ ফেব্রুয়ারি ২০০৬ তারিখে দৈনিক সমকালে কামাল লোহানীর নিবন্ধ প্রকাশিত হয় দাবির সমর্থনে।
সাপ্তাহিক সূর্যোদয় (২১ ফেব্রুয়ারি ২০০৬) এবং সাপ্তাহিক এখন ম্যাগাজিন (২৬ ফেব্রুয়ারি ২০০৬) ভাষাশহিদদের জাতীয় বীরের মর্যাদা প্রদানের দাবিতে বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
২৫ ফেব্রুয়ারি ২০০৬ তারিখে দৈনিক ইত্তেফাকের ‘স্থান-কাল-পাত্র’ শীর্ষক উপসম্পাদকীয়তে লুব্ধক লিখেছিলেন যে, ভাষা-আন্দোলন স্মৃতিরক্ষা পরিষদের সহসভাপতি এম এ বার্ণিক ভাষাশহিদদের জাতীয় বীরের মর্যাদা প্রদানের আহ্বান জানিয়েছেন এবং এ বিষয়ে ভাষাসৈনিক ও গবেষকদের বিবৃতি ইতোমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে। দেশের শীর্ষ দুই কবিও এ দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন।
কিন্তু এত আলোচনা, এত সমর্থন, এত আবেগের পরও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির সেই সোনালি দরজাটি এখনো পুরোপুরি খোলেনি।
অধ্যাপক এম এ বার্ণিকের গবেষণা ও পর্যবেক্ষণে আরেকটি বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে—কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারের স্থায়ী রক্ষণাবেক্ষণ।
ভাষাশহিদদের অমর স্মৃতির প্রতীক কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার বছরজুড়ে যথাযথ তদারকির অভাবে নানা সমস্যার মুখোমুখি হয় বলে তিনি উল্লেখ করেন।
এ সমস্যা নিরসনে জ্ঞানভিত্তিক সামাজিক আন্দোলনের সভাপতি হিসেবে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের নিকট একটি স্মারকলিপি প্রেরণ করেন।
৭ মে ২০২৪ তারিখে কবি জান্নাতুন নাঈম, মৌলি আখতার ও জাহিদুল ইসলাম সমন্বয়ে গঠিত প্রতিনিধি দল স্মারকলিপিটি পৌঁছে দেয়।
(সূত্র : দৈনিক মুক্তির লড়াই, ৭ মে ২০২৪)
কিন্তু আজও স্থায়ী কোনো কার্যকর ব্যবস্থা দৃশ্যমান হয়নি।
এভাবেই সময় এগিয়ে চলেছে।
দরজায় কড়া নাড়ছে ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৭।
শহিদ দিবসের ৭৫ বছর পূর্তি।
হীরকজয়ন্তী।
পৃথিবী আজ ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে জানে। জাতিসংঘের স্বীকৃতি এই দিনকে বিশ্বমানবতার সম্পদে পরিণত করেছে।
কিন্তু ভাষাশহিদদের কবর, তাঁদের জাতীয় বীরের মর্যাদা, তাঁদের স্মৃতির স্থায়ী সংরক্ষণ—এসব প্রশ্ন এখনো উত্তর খুঁজছে।
হীরকজয়ন্তীর প্রাক্কালে তাই আজিমপুরের মাটির নিচে ঘুমিয়ে থাকা শহিদরা যেন নীরবে বলেন—
“আমাদের রক্তের স্মৃতি কি বিশ্ব চিনেছে, কিন্তু আমরা এখনো রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির অপেক্ষায়?”
ইতিহাস সেই প্রশ্ন শুনছে।
জাতিও শুনছে।
এখন অপেক্ষা শুধু উত্তরের।