বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬, ০৪:২২ অপরাহ্ন
*একটি হাস্যরসাত্মক পারিবারিক গল্প*
*— অধ্যাপক এম এ বার্ণিক*
অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনার এক শান্ত পাড়ায় দিনের শেষে যখন মানুষ কফির কাপ হাতে বিশ্রাম নেয়, ঠিক তখনই একটি ছোট্ট বাঙালি পরিবারে শুরু হয় এক অভিনব যুদ্ধ।
না, এটি রাজনীতি বা অর্থনীতির যুদ্ধ নয়।
এটি বাংলা ভাষা শেখার মহাযুদ্ধ।
এই যুদ্ধের দুই প্রধান যোদ্ধা—সারাহ ও সান্দ্রা।
নাম দুটির মধ্যেই যেন এক অপূর্ব গল্প লুকিয়ে আছে।
সারাহ—অর্থ রাজকুমারী, সম্মানিতা নারী।
সান্দ্রা—অর্থ মানবজাতির রক্ষক, সাহসী সহায়ক।
একজন রাজকুমারী, আরেকজন মানবতার রক্ষক।
শুনলে মনে হয় যেন কোনো রূপকথার দুই নায়িকা।
তাদের বাবা হেলাল উদ্দিন বহু আগেই ভিয়েনায় স্থায়ী হয়েছিলেন। পরে বিয়ের পর পশ্চিমা রীতিতে স্বামীর পদবি গ্রহণ করে মুন্নি ফেরদৌস হয়ে গেলেন মুন্নি উদ্দিন। এরপর ভিয়েনার মাটিতেই জন্ম নিল সারাহ ও সান্দ্রা।
এবার ১ আগস্ট তারা বাংলাদেশে বেড়াতে আসছে।
বিমান টিকিট হয়েছে, লাগেজ গুছানো হয়েছে, উপহারও প্রস্তুত।
শুধু একটা বিষয় এখনও পুরোপুরি প্রস্তুত নয়।
বাংলা ভাষা!
দুই বোনের বাংলা শুনলে মনে হয়—অর্ধেক বাংলা, অর্ধেক ইংরেজি, আর বাকি অংশ তাদের নিজস্ব আবিষ্কার।
সারাহ গম্ভীর মুখে বলে,
“মা… আমি ভাত খাবো… but little little!”
সান্দ্রা সঙ্গে সঙ্গে আপত্তি তোলে,
“না, এভাবে না। বলতে হবে—আমি little ভাত খাবো!”
মুন্নি উদ্দিন দুই হাত তুলে বলেন,
“হে বাংলা ভাষা, তুমি আজ ধৈর্য ধরো!”
এরপর শুরু হয় সন্ধ্যার বাংলা ক্লাস।
ডাইনিং টেবিল মুহূর্তেই শ্রেণিকক্ষে পরিণত হয়।
মুন্নি উদ্দিন শিক্ষক।
সারাহ ও সান্দ্রা ছাত্র।
সুযোগ পেলেই বাবা হেলাল উদ্দিনও এসে বসেন।
কিন্তু তিনি সাহায্য করতে এসে কখনো কখনো এমন উচ্চারণ করেন যে দুই মেয়েই আরও বিভ্রান্ত হয়ে যায়।
মুন্নি হেসে বলেন,
“একজন শিক্ষকই যথেষ্ট ছিল, এখন দেখি তিনজন ছাত্র!”
একদিন পাঠ ছিল—
“আমি বাংলাদেশে বেড়াতে যাচ্ছি।”
সারাহ বলল,
“আমি… বাংলাদেশে… বেরাতা… যাসি…”
সান্দ্রা সঙ্গে সঙ্গে সংশোধন করল,
“না না, যাসি না… যাইছি!”
হেলাল উদ্দিন বললেন,
“আরে না, আমি ছোটবেলায় অন্যভাবে বলতাম!”
মুহূর্তের মধ্যেই একই বাক্যের তিনটি নতুন সংস্করণ তৈরি হয়ে গেল।
কোনটি ঠিক, তা কেউ জানে না।
কিন্তু হাসিতে পুরো ঘর কেঁপে ওঠে।
একদিন সারাহ প্রশ্ন করল,
“মা, বাংলা অক্ষরগুলো এত বাঁকানো কেন?”
উত্তর দেওয়ার আগেই সান্দ্রা ঘোষণা দিল,
“কারণ বাংলা প্রতিদিন যোগব্যায়াম করে!”
সেদিনের ক্লাস আর এগোয়নি।
হাসতে হাসতেই শেষ হয়ে গেল।
প্রতিদিনের মতো শেষে ঘোষণা হয়—
“আগামীকাল থেকে আমরা আরও ভালো বাংলা বলব।”
সেই আগামীকাল আর আজ পর্যন্ত আসেনি।
তবুও কেউ হাল ছাড়েনি।
কারণ তারা জানে, ভাষা শুধু মুখে নয়, হৃদয়েও বাস করে।
১ আগস্ট যখন তারা বাংলাদেশে নামবে, তখন হয়তো তাদের বাংলা শতভাগ শুদ্ধ হবে না।
কিন্তু প্রতিটি শব্দে থাকবে ভালোবাসা, কৌতূহল আর আপনজনকে কাছে পাওয়ার আনন্দ।
সম্ভবত পৃথিবীতে এমন পরিবার খুব কমই আছে, যারা বাংলাদেশে বেড়াতে আসার প্রস্তুতি হিসেবে প্রতিদিন রাতের খাবারের পর বাংলা ভাষা শেখার আসর বসায়, ভুল উচ্চারণে হেসে গড়াগড়ি খায়, আবার নতুন উদ্যমে পরদিনের ক্লাসের অপেক্ষায় থাকে।
এই আনন্দই তাদের প্রকৃত ভ্রমণ।
বাংলাদেশে পৌঁছানোর আগেই তারা হৃদয়ে বাংলা পৌঁছে দিয়েছে।