শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬, ০১:৪৪ পূর্বাহ্ন
জাতীয় সংসদ কোনো সাধারণ সভাকক্ষ নয়। এটি রাষ্ট্রের বিবেকের মঞ্চ, জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক, গণতন্ত্রের পবিত্র অঙ্গন। এখানে উচ্চারিত প্রতিটি শব্দ যেমন ইতিহাসের পাতায় স্থান পায়, তেমনি এখানে উপস্থিত প্রতিটি ব্যক্তির আচরণ, ভঙ্গিমা ও পোশাকও জনগণের কাছে একটি বার্তা বহন করে। সংসদ সদস্যরা কেবল ব্যক্তি নন; তারা রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্বকারী প্রতীক। ফলে তাদের পোশাকও ব্যক্তিগত পছন্দের সীমা অতিক্রম করে জাতীয় মর্যাদার অংশ হয়ে ওঠে।
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সংসদ সদস্যদের পোশাক নিয়ে নানা ধরনের বিধান রয়েছে। কোথাও লিখিত (Written Dress Code), কোথাও অলিখিত (Unwritten Convention); কোথাও কঠোর (Strict Dress Regulations), কোথাও নমনীয় (Flexible Dress Standards)। কিন্তু একটি বিষয়ে সবাই একমত—সংসদের মর্যাদা রক্ষায় শালীন ও পেশাদার পোশাক (Dignified and Professional Attire) অপরিহার্য।
যুক্তরাজ্যের সংসদে নির্দিষ্ট পোশাকবিধি (Formal Dress Code) না থাকলেও সদস্যদের “ব্যবসায়িক ও পেশাদার পোশাক” (Business-like and Professional Attire) পরিধানের প্রত্যাশা করা হয়। কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ায়ও একই ধরনের নীতি (Professional Dress Standards) অনুসরণ করা হয়। কেনিয়ার সংসদে কোট-টাই, আনুষ্ঠানিক পোশাক এবং নির্দিষ্ট মানদণ্ড (Formal Parliamentary Attire) অনুসরণ বাধ্যতামূলক। নামিবিয়ার সংসদে এমনকি পোশাকের ধরন পর্যন্ত বিধিবদ্ধ (Codified Dress Regulations) করা হয়েছে। অর্থাৎ গণতন্ত্রের পরিপক্ব দেশগুলো উপলব্ধি করেছে যে, সংসদের মর্যাদা রক্ষায় পোশাক একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে বর্তমানে কোনো সুস্পষ্ট ও বিস্তারিত ড্রেস-কোড (Comprehensive Parliamentary Dress Code) নেই। ফলে কখনো দেখা যায়, কোনো নারী সদস্য এমন পোশাকে সংসদে বক্তব্য রাখছেন যা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও জনপরিসরে ব্যাপক সমালোচনা সৃষ্টি হয়। আবার অন্যদিকে এমন উদাহরণও রয়েছে যেখানে কেউ এমনভাবে মুখমণ্ডল আবৃত করে সংসদে উপস্থিত হয়েছেন যে, জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধির পরিচয় ও অভিব্যক্তি (Identity and Facial Expression) স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান থাকে না।
একইভাবে পুরুষ সদস্যদের ক্ষেত্রেও কখনো জার্সি, টি-শার্ট কিংবা অতিরিক্ত অনানুষ্ঠানিক পোশাক (Casual Wear) পরে সংসদে অংশগ্রহণের ঘটনা জনমনে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। সংসদ যদি রাষ্ট্রের মুখ হয়, তবে সেই মুখে কি কখনো খেলাধুলার মাঠের পোশাক (Sportswear) কিংবা অবকাশযাপনের সাজ মানানসই হতে পারে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের সমাজের ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও রাষ্ট্রীয় মূল্যবোধকে একসঙ্গে বিবেচনায় নিতে হয়।
বাংলাদেশের সংবিধান যেমন ধর্মীয় স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দেয়, তেমনি দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুভূতিকেও অস্বীকার করে না। ইসলামী চিন্তাধারায় শালীনতা (Modesty) একটি মৌলিক মূল্যবোধ। আল-কুরআনের সূরা নূরের ৩১ নম্বর আয়াতের আলোচনায় বহু আলেমের ব্যাখ্যায় দেখা যায় যে, নারীর পোশাক এমন হওয়া উচিত যাতে শরীরের সৌন্দর্য অপ্রয়োজনীয়ভাবে প্রদর্শিত না হয়। একই সঙ্গে বহু ফকিহ ও মুফাসসির ‘জুহারা’—অর্থাৎ মুখমণ্ডল, হাতের কব্জি ও পায়ের টাকনু—ব্যতীত শরীরের অন্যান্য অংশ আবৃত রাখার বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। যদিও এ বিষয়ে মুসলিম বিশ্বে বিভিন্ন মত ও ব্যাখ্যা রয়েছে, তবুও সংসদের মতো একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে এমন একটি ভারসাম্যপূর্ণ নীতি অনুসরণ করা যেতে পারে, যেখানে শালীনতা (Modesty), পরিচয় দৃশ্যমানতা (Identity Visibility) এবং কার্যকর যোগাযোগ (Effective Communication)—তিনটিই সমানভাবে গুরুত্ব পায়।
পোশাক আসলে একটি ভাষা। শব্দ ছাড়াই সে কথা বলে। একটি সুশৃঙ্খল পোশাক বলে দায়িত্বের কথা; একটি শালীন পোশাক বলে ব্যক্তিত্বের কথা; একটি মর্যাদাপূর্ণ পোশাক বলে রাষ্ট্রের প্রতি শ্রদ্ধার কথা।
তাই বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের জন্য একটি ভারসাম্যপূর্ণ ড্রেস-কোড বিবেচনা করা যেতে পারে।
প্রস্তাবিত ড্রেস-কোড
নারী সদস্যদের জন্য
১. শাড়ি, সালোয়ার-কামিজ, লং কোট, আবায়া বা বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও ধর্মীয় মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ অন্য কোনো শালীন পোশাক (Modest National or Cultural Attire)।
২. পোশাক এমন হতে হবে যাতে শরীরের গঠন অশোভনভাবে প্রকাশ না পায় (Non-Revealing Clothing)।
৩. হিজাব (Hijab) পরিধানের পূর্ণ স্বাধীনতা থাকবে।
৪. সংসদীয় কার্যক্রমে পরিচয়, জবাবদিহিতা (Accountability) এবং যোগাযোগের সুবিধার্থে মুখমণ্ডল দৃশ্যমান রাখার বিষয়টি উৎসাহিত করা যেতে পারে।
৫. অতিরিক্ত আঁটসাঁট, স্বচ্ছ বা প্রদর্শনমূলক পোশাক (Provocative or Transparent Attire) পরিহার করতে হবে।
পুরুষ সদস্যদের জন্য
১. স্যুট, কোট-টাই, জাতীয় পোশাক, পাঞ্জাবি-পায়জামা, শেরওয়ানি বা অন্য কোনো মর্যাদাপূর্ণ আনুষ্ঠানিক পোশাক (Formal or National Attire)।
২. জার্সি, টি-শার্ট, শর্টস, ট্র্যাকস্যুট বা খেলাধুলার পোশাক (Sportswear and Casual Wear) সংসদে নিষিদ্ধ করা যেতে পারে।
৩. পোশাকে অশোভন স্লোগান, রাজনৈতিক প্রচারণামূলক বার্তা বা বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন (Political Slogans or Commercial Advertising) থাকা যাবে না।
সবার জন্য
১. পোশাক হবে পরিষ্কার, পরিপাটি ও শালীন (Clean, Neat and Respectful Appearance)।
২. সংসদের মর্যাদার পরিপন্থী কোনো পোশাক (Undignified Attire) গ্রহণযোগ্য হবে না।
৩. স্পিকারকে প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা (Discretionary Authority of the Speaker) প্রদান করা যেতে পারে।
সংসদ একটি নদীর মতো। সেখানে দেশের কোটি মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা এসে মিলিত হয়। নদীর দুই তীর যেমন তাকে শৃঙ্খলিত রাখে, তেমনি স্বাধীনতা ও শালীনতার মধ্যকার ভারসাম্য সংসদের মর্যাদাকে রক্ষা করে। একদিকে অতিরিক্ত প্রদর্শন (Excessive Exposure), অন্যদিকে অতিরিক্ত আড়াল (Excessive Concealment)—উভয় চরমপন্থাই গণতন্ত্রের উন্মুক্ত চেতনার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
বাংলাদেশ যদি বিশ্বের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে একটি যুক্তিসঙ্গত, সংস্কৃতিসম্মত ও মর্যাদাপূর্ণ ড্রেস-কোড (Balanced Parliamentary Dress Code) প্রণয়ন করতে পারে, তবে তা শুধু পোশাকের নিয়ম হবে না; বরং জাতীয় সংসদের মর্যাদা রক্ষার এক নতুন অধ্যায় হয়ে উঠবে।
কারণ সংসদে পোশাক কেবল কাপড় নয়—এটি রাষ্ট্রচিন্তার বহিঃপ্রকাশ, দায়িত্ববোধের প্রতীক এবং জনগণের প্রতি সম্মানের নীরব ভাষা।